Image description

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধকে ঘিরে সারা বিশ্ব টালমাটাল। এই যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যার পাশাপাশি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। বিশেষ করে বাহরাইন, জর্দান ও ইরাক—এই তিন দেশ থেকে প্রবাসী আয়ে স্পষ্ট নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাহরাইন থেকে রেমিট্যান্স এসেছে পাঁচ কোটি ডলার, যা চলতি অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ে (২০২৫) ছিল ছয় কোটি ডলার। একইভাবে জর্দান থেকে ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১.৫ কোটি ডলার, যা জুলাইয়ে ছিল ১.৬ কোটি ডলার। আর ইরাক থেকে রেমিট্যান্স কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ ডলারে, যেখানে জুলাইয়ে ছিল ৫২ লাখ ডলার। এই তিন দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার পরিমাণ কম হলেও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

কারণ এসব দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাবে যে পতন শুরু হয়েছে, সেটা অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়লে বিপাকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

তিন দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমলেও একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বড় শ্রমবাজারগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। আগের বছরের জুলাইয়ে যা ছিল ৪৩ কোটি ডলার।

 
ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৩৭ কোটি ডলার, যা আগের বছর জুলাইয়ে ছিল ২৮ কোটি ডলার, ওমান থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১৮ কোটি ডলার, যা আগের বছর জুলাইয়ে ছিল ১৪ কোটি ডলার, কুয়েত থেকে ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১৫ কোটি ডলার, যা আগের বছর জুলাইয়ে ছিল ১৩ কোটি ডলার এবং কাতার থেকে ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১২ কোটি ডলার, যা আগের বছর জুলাইয়ে ছিল ১১ কোটি ডলার।

এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, বড় ও স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে কর্মসংস্থান এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও অপেক্ষাকৃত ছোট বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমবাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় থাকায় দ্রুত দেশে অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা স্থায়ী নাও হতে পারে।

 
যদি আঞ্চলিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যার ফলে সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই কয়েকটি দেশের ওপর বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের বড় অংশ নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান জানান, সামপ্রতিক মাসগুলোয় বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ খুবই ভালো। আগের চেয়ে অনেক বেশি। এই বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ ছিল ঈদুল ফিতর। উচ্চ প্রবৃদ্ধি খুব বেশি দিন থাকবে না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশিরা কাজ হারাতে শুরু করলে তার প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এখন আমরা খুব কষ্টে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছি। সব জায়গায় আগের মতো লোক পাঠাতে পারছি না। এমনকি সব এক্সচেঞ্জ হাউজ ঠিকমতো কাজও করতে পারছে না। এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে বাধ্য। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছরই রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দেশে পাঠান। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেশি ছিল গত মার্চে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত অনেক প্রবাসী আগে স্থানীয় ব্যাংকে কিছু সঞ্চয় রাখতেন। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তার কারণে তাঁরা আর সেখানে টাকা জমা রাখছেন না; বরং হাতে থাকা প্রায় পুরো অর্থই দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ফলে আপাতত রেমিট্যান্সপ্রবাহ ব্যাপক হারে বেড়েছে।’

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখন বোমাবাজি হচ্ছে। ফলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশিরা চাকরি হারাতে পারেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দেশগুলোর রেমিট্যান্স হাউজগুলো যদি ঠিকমতো তাদের কার্যক্রম চালাতে না পারে তাহলে কেউ রেমিট্যান্স পাঠাতে চাইলেও পাঠাতে পারবেন না। কিন্তু এটা একটা সাময়িক সমস্যা। যদি যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় তাহলে ভিন্ন কথা। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা বা কমে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে বাইরের বাজারে দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করতে হবে। এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সদ্যসমাপ্ত মার্চ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ মাসে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। বর্তমানে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।