দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি বাড়লেও বাজারে এর সংকট কাটেনি; বরং সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ এলপিজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা অনেক স্টেশন সীমিতভাবে গ্যাস সরবরাহ করছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি বা অটোগ্যাসচালিত যানবাহনের চালকরা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে দেশে দেড় থেকে দুই লাখ এলপিজিচালিত যানবাহন রয়েছে।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০টি এলপিজি অপারেটরের মধ্যে মাত্র ছয় থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ এলপিজি স্টেশন প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না এবং অনেক স্টেশন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে চলমান এলপিজি সংকটের কারণে অধিকাংশ এলপিজি স্টেশন প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘দেশে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ এলপিজিচালিত গাড়ি রয়েছে, যেগুলো গ্যাস না পেয়ে সিএনজি বা অকটেনের দিকে ঝুঁকছে। এতে অন্যান্য জ্বালানির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের পাম্পগুলো থেকে জ্বালানি তেল নিতে গাড়িচালকদের ভোগান্তির কারণে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে অটোগ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ সংকটের কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে স্টেশন মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে গাড়ির মালিকরা জ্বালানি পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচের বোঝা বহন করছেন।’
ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, ‘অকটেন ও সিএনজির তুলনায় এলপিজির দাম অস্বাভাবিক বেশি হওয়ায় বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই ধরনের যানবাহনে একাধিক জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও দামের এই অসামঞ্জস্য ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করছে এবং বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’
সভাপতি বলেন, এলপিজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আমরা বিইআরসি চেয়ারম্যান ও জ্বালানি সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে আমরা উল্লেখ করেছি, আমাদের স্টেশনগুলোতে মাসে ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি লাগে। অপারেটরদের বলে এই গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়। তার পরও কোনো উন্নতি নেই।’
তিনি অভিযোগ করেন, এলপিজি স্টেশনগুলো গ্যাস সরবরাহ না দিয়ে বাড়তি লাভের আশায় রান্নায় সিলিন্ডারে রিফিল করছে। বিইআরসি দরের চেয়ে বেশি দরে সিলিন্ডারে রিফিল করে এলপিজি বিক্রি করছেন অনেক অপারেটর। এতে বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশ এলপিজি স্টেশন লসে চলছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে আমদানি বাড়লেও বাজারে সেই প্রভাব পড়ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলার পর্যায়ে মজুদদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে গতকাল এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে এলপিজি আমদানি বেড়েছে; ফেব্রুয়ারিতে জানুয়ারির তুলনায় বেশি এবং মার্চে তা আরো বেড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কম্পানিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশে এলপিজি আমদানি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি অব্যাহত রয়েছে। মাসিক চাহিদা সাধারণত দেড় লাখ টনের মধ্যে থাকলেও কোনো মাসে এর বেশি আমদানি করা হতে পারে। তবে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ডিলারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ডিলাররা যদি পণ্য মজুদ করে রাখেন, তাহলে খুচরা পর্যায়ে সংকট দেখা দিতে পারে, যা সরাসরি আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’
এলপিজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ বিঘ্নের বিষয়ে লোয়াব সভাপতি বলেন, স্টেশন পরিচালনা বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতে নেই। কোথাও পণ্য সরবরাহ হলো কি না বা কে গ্রহণ করল, এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট বিতরণ পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত। এ কারণে মাঠপর্যায়ে সৃষ্ট সমস্যার জন্য এককভাবে আমদানিকারকদের দায়ী করা সঠিক নয়। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং ডিলারদের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও এলপিজির দাম বেড়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি সৌদি আরামকো চলতি এপ্রিল মাসের জন্য এলপিজির মূল্য প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়াও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা বাড়িয়ে অটোগ্যাসের মূসকসহ দাম প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
এদিকে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা, যা আগের মাসে ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা। তবে বাস্তব চিত্র আরো উদ্বেগজনক। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে গৃহস্থালি খাতেও প্রভাব পড়ছে। রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের পরিবহনব্যবস্থা, ভোক্তা-স্বার্থ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সমাধান না হলে এই সংকট আরো গভীর হতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন বছরে এলপিজির চাহিদা ১৫ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে যানবাহন খাতে মাত্র ১০ শতাংশ এলপিজি অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে না।
চালু হতে যাচ্ছে ‘ফুয়েল পাস’ : জ্বালানি তেলের চাপ কমাতে ফিলিং স্টেশনে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গাসহ কয়েকটি জেলায় স্থানীয় প্রশাসন এই কার্ড বিতরণ করছে। রাজধানীতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ফুয়েল পাস চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহককে সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে গাড়ি ও মালিকের তথ্য দিতে হবে। যাচাই শেষে ফোনে ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) আসবে। যাচাই সম্পন্ন হলে অ্যাকাউন্টের তথ্য প্রদান করতে হবে। প্রয়োজন হতে পারে জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির ব্লু-বুক, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সচল ফোন নম্বর ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি। ফুয়েল পাসের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রাহক কত তেল উত্তোলন করেছেন, তা জানা যাবে।
আগামী মাসে তেলের দাম সমন্বয় হতে পারে : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সংসদ অধিবেশনে বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনে আগামী মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা থাকায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তবে দেশীয় মজুদ পর্যাপ্ত এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার কাজ করছে।
ক্রুড অয়েল উদ্ধার, ৫১ হাজার টন তেল নিয়ে দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে : সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের পাইপলাইনে জমে থাকা পাঁচ হাজার টন ক্রুড অয়েল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) নিয়ে আসা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মজুদ তেল দিয়ে রিফাইনারির উৎপাদন অন্তত দুই দিন সচল রাখা সম্ভব।
এই ক্রুড তেল থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও জেট ফুয়েল উৎপাদন করা হবে। সরকার বিকল্প উৎস ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, এই তেল উদ্ধার ও পরিশোধনের উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
একই দিন মালয়েশিয়া থেকে ৫১ হাজার টন অকটেন ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। এমটি সেন্ট্রাল স্টার ২৬ হাজার টন অকটেন এবং এমটি ইস্টার্ন কুইন্স ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে আসছে।
চট্টগ্রাম বন্দরসচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, নতুন এই চালানের ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো সুসংহত হবে। সরকারের নিয়মিত তদারকি ও আগাম আমদানির ফলে বাজারে জ্বালানি সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।
ঢাকার বাইরে তেলের তীব্র সংকট : দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজগুলো তেলের অভাবে কার্যত অচল। ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। বন্দরে শতাধিক খালি লাইটার জাহাজ পশুর নদী, খুলনা-রূপসাসহ অন্যান্য ঘাট এলাকায় আটকা পড়েছে।
লাইটার জাহাজ মালিকরা জানান, মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে তেলের অভাবের কারণে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বাড়ছে এবং ব্যবসায়ীদের জরিমানা ও ক্ষতি হচ্ছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরের কার্যক্রমে প্রভাব পড়েনি এবং সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
খুলনা ও চুয়াডাঙ্গার খুচরা তেলের বাজারেও সংকট দেখা দিয়েছে। ফুয়েল কার্ডের মাধ্যমে মোটরসাইকেলের চাপ কমলেও কৃষক ও অন্য গ্রাহকদের জন্য ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে। এদিকে অবৈধ জ্বালানি সরবরাহ ও সিন্ডিকেটের কারণে তেলের লাইনে বিশৃঙ্খলা চলছে।
ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৃথক অভিযান চালিয়ে হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়েছে এবং ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীদের জরিমানা করা হয়েছে। যশোরে ইটভাটায় ব্যবহারে ডিজেল অবৈধভাবে সরবরাহ করার অভিযোগে ফিলিং স্টেশন ম্যানেজারকে জরিমানা করা হয়েছে। জামালপুরে মোটরসাইকেলের ট্যাংক থেকে বোতলে তেল ভরে রাখার অভিযোগে দুজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ফরিদপুরে কৃষকদের জন্য ডিজেল বিতরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতির কারণে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা]