অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে রূপ নিচ্ছে না। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে শুক্রবারের (১০ এপ্রিল) পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনার অধ্যাদেশ অন্যতম। এসব অধ্যাদেশের মূল কথা হলো-গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নিশ্চিত করা। মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠান দেশে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকবে না। সংসদে বিরোধী দল এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলবে, নিয়োগ কীভাবে হবে, তা আগের মতো সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ফলে আইনে রূপ না দিয়ে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা হচ্ছে। অপরদিকে সরকার বলছে, এই অধ্যাদেশগুলোতে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে বাতিল নয়, আরও শক্তিশালী করে বিল আকারে পাশ করা হবে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আমরা হুবহু পাশ করছি। কিছু অধ্যাদেশ সংশোধনীসহ পাশ করা হবে। আরও কিছু অধ্যাদেশ রহিতকরণ কিংবা হেফাজতকরণসহ পাশ করা হচ্ছে। এই হেফাজতকরণ কিংবা রহিতকরণের বিষয়গুলো ডিফেক্টিভ আইন।’ অর্থাৎ এগুলো বর্তমানে যে ফর্মে আছে, ওই ফর্মে পাশ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। উদাহরণ দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, গুম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে কথা এসেছে। কিন্তু গুম কমিশন অধ্যাদেশে যা আছে, তা হুবহু পাশ করলে যারা গুম হয়েছে, তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি বলেন ‘আমি নিজে গুমের শিকার। তাই আমি গুমের আইন শক্তিশালী করতে চাই।’ এ কারণে আমরা এখন গুমের বিচার আইসিটি (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) আইনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই আইনে গুমের অপরাধের শাস্তি ২০ বছর কারাদণ্ড। মামলার পর দ্রুত তদন্ত হয়। কারণ এখানে তদন্তের জন্য ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি আছে। কিন্তু গুম কমিশনে এসব নেই। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুম কমিশন অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধের তদন্ত করবে মানবাধিকার কমিশন। তদন্ত শেষে এক থেকে দেড় বছর পর রিপোর্ট দেবে। তারপর মামলা হবে নিম্ন আদালতে। কিন্তু আইসিটি বর্তমানে হাইকোর্ট ডিভিশনের মর্যাদা পাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এখন বলেন কোনটা ভালো?’ অন্যান্য অধ্যাদেশগুলো এভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাকিটা আইনমন্ত্রী বিস্তারিত বলবেন। তবে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন ‘নো কমেন্টস’।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ ও জনকল্যাণকর বেশকিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করছে না সরকার। এই আচরণ কাম্য নয়। কারণ এর মাধ্যমে সংস্কারের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক কিনা সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। তিনি বলেন, গণভোট বাস্তবায়ন নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। এর মানে হলো দুটি-একদিকে জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে না; অপরদিকে জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়ে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কাম্য নয়। কারণ জনরায়কে অগ্রাহ্য করলে জনগণ এটিকে কীভাবে নেবে, তা দেখার বিষয়।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংসদ কার্যকর হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে হয়। সেই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। রাষ্ট্র সংস্কারে গত দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব অধ্যাদেশ ১০ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে বিল আকারে পাশ না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তবে যেহেতু নির্ধারিত শেষ সময় ১০ এপ্রিল সরকারি ছুটির দিন শুক্রবার, সেহেতু ওইদিনও স্পিকার চাইলে সংসদ অধিবেশন বসতে পারে। এখন পর্যন্ত সূত্র বলছে, ওইদিন সংসদ বসবে। সেক্ষেত্রে আরও কিছু বিল শুক্রবার সংশোধিত আকারে উত্থাপন হতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ মূল্যায়নে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৩ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির ১০ জনই বিএনপির এবং বাকি তিনজন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ-সদস্য। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। কমিটি ১ এপ্রিল সুপারিশ জমা দিয়েছে। এতে ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করতে বলা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া যে ১৫টি অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে। তবে যেসব অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন করা হচ্ছে, তার সবগুলোতেই নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতের তিন সদস্য।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হচ্ছে, সেগুলো জনগুরুত্বপূর্ণ। সরকার এগুলো শক্তিশালীকরণের কথা বলছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এসব প্রতিষ্ঠান স্বাধীন থাকলে শক্তিশালী থাকবে, নাকি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে গেলে শক্তিশালী হবে। তার মতে, মানুষকে বোকা বানানোর জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে। জামায়াতের এই নেতা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশগুলো জারি করার কারণ হলো-ওই সব বিষয়ে বিদ্যমান যে আইন রয়েছে, তা ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে আজ্ঞাবহ আইন পরিবর্তনের অংশ হিসাবে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কিন্তু সেগুলো বর্তমান সরকার আইনে রূপ না দিয়ে বাতিল করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে বিএনপি সংস্কার এড়িয়ে যাচ্ছে।
এই অধ্যাদেশগুলো নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এতে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেই পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশে কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন এবং গুম প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করতে তারা আগ্রহী নয়। গুরুত্বপূর্ণ এসব অধ্যাদেশ নিয়ে ‘খেলা’ করা হচ্ছে। অধ্যাদেশ বাতিলের চাপ রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই আসছে। এটি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, অতীতে নিজেদের অনাচারের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে বিএনপির। দীর্ঘদিনের ত্যাগকে স্মরণে রেখে নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী অগ্রসর হবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধ্যাদেশ আইন হিসাবে কার্যকর না হওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে। একটি আমলাতন্ত্র ও আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাব। তিনি বলেন, বর্তমানে অধ্যাদেশ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ফল, যার উৎস রাজনৈতিক অঙ্গন। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের ওপরও নির্ভরতা রয়েছে। অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, তার অনেকটাই আমলাতন্ত্র থেকেই এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, এখনো দেশের নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যেসব অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে এর মধ্যে রয়েছে-গণভোট অধ্যাদেশ, সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। সুপ্রিমকোর্ট আদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল। বাদ দেওয়া হচ্ছে দুদক অধ্যাদেশ। এর মূল কথা ছিল, দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এছাড়াও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাদ দেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, বিএনপি মৌলিক সংস্কারে আর রাজি হবে না। অর্থাৎ তারা সংস্কার করবে না। তিনি বলেন, সংস্কারের বিষয়ে আমরা ‘স্কয়ার জিরোতে’ চলে গেলাম। জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, ১৮ মাস ধরে যে প্রস্তুতি নেওয়া হলো, তা আর বাস্তবায়ন হলো না। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটা রেজিম (ক্ষমতা) পরিবর্তন হলো মাত্র। এটুকুই অর্জন। জনগণের প্রত্যাশা অনুসারে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং আইনকানুনের সংস্কার খুব একটা হলো না।