জ্বালানি তেল সংকটে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলোতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তেলের অভাবে এসব জাহাজ বন্দরে আসা বাণিজ্যিক (মাদার ভেসেল) জাহাজ থেকে পণ্য নামাতে ও পরিবহন করতে পারছে না। এতে পণ্য খালাস ও পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
যদিও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, জ্বালানি সংকটের কোনো প্রভাব বন্দরের কার্যক্রমে পড়েনি এবং সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে গত কয়েক দিন ধরে শত শত খালি লাইটার জাহাজ আটকা রয়েছে। একই অবস্থা খুলনা-রূপসাসহ চার ও পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায়ও দেখা গেছে। তেলের অভাবে এসব জাহাজ চলাচল করতে পারছে না।
লাইটার জাহাজের চালক ও মালিকদের দাবি, বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সেগুলো নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন ঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অধিকাংশ লাইটার জাহাজ অলস পড়ে থাকায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য নামানোর ক্ষেত্রে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
চালক-মালিকরা বলেন, জাহাজের নির্ধারিত সময়ের (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করতে হচ্ছে। এ কারণে আমদানিকারকদের বাড়তি জরিমানা গুণতে হচ্ছে। এতে খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল খালাস ও পরিবহনে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
জাহাজ মালিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ডিপো থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা থেকে সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
এমভি আর রশিদ-১ লাইটার জাহাজের মাস্টার রেজাউল ইসলাম বলেন, জ্বালানি না পাওয়ায় বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না এবং গত এক সপ্তাহ ধরে সেগুলো পশুর নদীতে আটকা রয়েছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলা অঞ্চলের মেরিন ডিলার ও এজেন্ট মেসার্স নুরু অ্যান্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলাল বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে লাইটার জাহাজের জ্বালানির চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছেন না।
খুলনা রূপসা এলাকায় অবস্থিত সেভেন সার্কেল সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, কাঁচামালবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৭ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হচ্ছে এবং কারখানায় কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদিত সিমেন্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী প্রবীর হীরা বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানির প্রাপ্যতা কমে গেছে। তাই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিসরে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদের হারবার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসে বন্দরে ৬৭৯টি বিদেশি জাহাজ এসেছে। এসব জাহাজ থেকে প্রায় এক কোটি পাঁচ লাখ মেট্রিক টন পণ্য নামানো হয়েছে। একই সময় আট হাজার ৭১৬টি বিদেশি গাড়ি আমদানি হয়েছে এবং ২৪ হাজার ৩৪২টি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মো. মাকরুজ্জামান বলেন, জ্বালানি সংকটে লাইটার জাহাজে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।