দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিফলিত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা সমালোচিত হয়েছিল। অভ্যুত্থানের মুখে ভারতপন্থী বলে পরিচিত সাবেক প্রধামনমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা সরকারের এবং সার্বিকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে ভারতীয় মিডিয়ার বিরুদ্ধে। দুই দেশের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলো ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশ বিষয়ে একশো বারের বেশি ভুয়া খবর ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে মিডিয়া মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে দ্য ডিসেন্ট এই ‘মিডিয়া ওয়াচ’ প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার পতনের আগের এবং পরের তিনটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের শীর্ষ পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের সংবাদ কভারেজ বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেছে। বুঝার চেষ্টা করেছে, শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সর্বশেষ দুটি জাতীয় নির্বাচন এবং শেখ হাসিনার পতনের পর অনুষ্ঠিত একমাত্র নির্বাচনে ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা কেমন ছিল? আদৌ কোন দৃশ্যমান পার্থক্য ছিল কিনা?
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় নির্বাচন— ২০১৮, ২০২৪ এবং সদ্য অনুষ্ঠিত ২০২৬-কে ঘিরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজ তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কাভারেজের ব্যাপ্তি, ভাষা, ফ্রেমিং ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, সময়ের ব্যবধানে একই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করেছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ
এই সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ সামনে আসে।
প্রথমত, কাভারেজের ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে কাভারেজ অস্বাভাবিকভাবে বহুগুণ বৃদ্ধি পায় যেখানে মনোযোগ নির্বাচন প্রক্রিয়ার চেয়ে মূলত সংঘাত, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কার দিকেই বেশি ছিল।
দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালের নির্বাচনী কাভারেজে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের নির্বাচনকে একটি অংশগ্রহণমূলক, উৎসবমুখর ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। ২০২৪ সালেও তারা একে প্রধানত একটি অংশগ্রহণমূলক ও বৈধ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখিয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের কাভারেজে এই ফ্রেমিং সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে একই নির্বাচনকে সংঘাত, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও চরম অরাজকতার ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তৃতীয়ত, বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও শিরোনামের ফ্রেমিংয়ে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড ছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের অংশগ্রহণ থাকলেও দলগুলোর ধারাবাহিক কারচুপির অভিযোগকে সামগ্রিক বৈধতার সংকট হিসেবে দেখানো হয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন পুরোপুরি বর্জন করলেও ‘অন্তর্ভুক্তি’র প্রশ্ন তোলা হয়নি এবং এটিকে ‘বৈধতার সংকট' হিসেবে না দেখিয়ে শেখ হাসিনার 'নিশ্চিত বিজয়' ও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ফ্রেম করা হয়। এর বিপরীতে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘অন্তর্ভুক্তি’র প্রশ্ন তুলে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে সরাসরি 'নির্বাচনের বৈধতার সংকট' হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং শিরোনামে নির্বাচনকে 'প্রহসন', 'ভাঁওতা' ও 'অবৈধ' হিসেবে ফ্রেম করা হয়।
চতুর্থত, 'অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন' বা ইনক্লুসিভ ইলেকশন ধারণার প্রয়োগটি ছিল উদ্দেশ্যমূলক। ২০২৪ সালে প্রধান বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও এই ধারণাটি কার্যত অনুপস্থিত ছিল এবং বৈধতার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। অথচ ২০২৬ সালে হঠাৎ করেই এই ধারণাটি নির্বাচনের বৈধতা প্রমাণের প্রধান শর্তে পরিণত হয় এবং নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পঞ্চমত, নির্বাচনকালীন সরকার বা কর্তৃপক্ষের চিত্রায়নেও আমূল বদল দেখা যায়। ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে 'লৌহমানবী' ও 'গণতন্ত্রের আইকন' হিসেবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালেও তাঁকে অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক, 'অবিসংবাদিত রানী' ও 'স্বপ্নের ফেরিওয়ালা' ফ্রেমে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ২০২৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে 'ফ্যাসিস্ট', 'খুনি' এবং ক্ষমতাহীন 'পুতুল সরকার' হিসেবে নেতিবাচক ফ্রেমে উপস্থাপন করা হয়।
ষষ্ঠত, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ফ্রেমিংয়েও বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে-বিদেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তা প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও এই ধরনের শঙ্কা ও প্রতিবেদনগুলোকে তারা কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালে হিন্দু বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গটি হঠাৎ করেই 'জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রধান কারণ' বা সংকট হিসেবে দেখানো হয়।
সপ্তমত, কাভারেজে কাদের বক্তব্য প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানেও বড় ধরনের স্থানান্তর ঘটেছে। ২০১৮ সালের কাভারেজে মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার এবং ভারত-পন্থী বয়ানই প্রাধান্য পেয়েছিল। ২০২৪ সালেও সংবাদমাধ্যমের প্রায় একক উৎস ছিল শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার, যেখানে সাধারণ ভোটার বা স্বাধীন সিভিল সোসাইটির কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত ছিল। আর ২০২৬ সালে সাধারণ মানুষের কণ্ঠের বদলে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, পশ্চিমা বিশ্লেষক এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কতামূলক বক্তব্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
অষ্টমত, নির্বাচনের চূড়ান্ত তিন দিনের (আগের দিন, ভোটের দিন ও পরের দিন) বর্ণনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালে নির্বাচনকে 'গণতন্ত্রের উৎসব' ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালেও উৎসবমুখর পরিবেশ এবং শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক ও নিশ্চিত জয়ের একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবেই বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে এই চূড়ান্ত তিন দিনের বর্ণনায় নির্বাচনকে 'প্রহসন', বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, সংখ্যালঘু ইস্যু ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হওয়া একটি চরম সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্লেষণ পদ্ধতি
এই ‘মিডিয়া ওয়াচ’ প্রতিবেদনে ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বাংলাদেশর নির্বাচনভিত্তিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে ২০২৪ সালে প্রকাশিত Reuters Institute Digital News Report (India) এর Weekly Reach (Offline) ডেটার ভিত্তিতে। উক্ত রিপোর্টে রয়টার্স ভারতীয় পাঠকদের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি তালিকা করেছে। এই রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে দেশটির জনপ্রিয় ৫টি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটকে দ্য ডিসেন্ট এর মিডিয়া ওয়াচ প্রতিবেদনের নমুনা হিসাবে নির্বাচন করা হয়েছে।
রয়টার্সের ওই রিপোর্ট অনুযায়ী অনলাইনে ভারতে সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসি, রিপাবলিক টিভি ও হিন্দুস্তান টাইমস।
এক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে থাকা বিবিসি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হওয়ায় সেটিকে বাদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ স্থানে থাকা রিপাবলিক টিভির ওয়েবসাইটে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে বাংলাদশের নির্বাচন নিয়ে কোন সংবাদ প্রতিবেদন না পাওয়ায় সেটিও বাদ দেয়া হয়েছে।
এই দুটি সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তে রয়টার্স এর তালিকায় ৬ষ্ঠ নং অবস্থানে থাকা ইন্ডিয়া টুডে’র ওয়েবসাইট এবং ভারতে বাংলাভাষী শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক আনন্দবাজারের ওয়েবসাইটকে নির্বাচন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, রয়টার্সের তালিকা এবং তার সাথে বাংলাভাষী শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলো হলো:
এনডি টিভি (NDTV)
দা টাইমস অফ ইন্ডিয়া (The Times of India)
হিন্দুস্থান টাইমস (Hindustan Times)
ইন্ডিয়া টুডে (India Today)
আনন্দবাজার (Anandabazar Patrika)
তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য তিনটি জাতীয় নির্বাচনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন আয়োজনের পরের দুই সপ্তাহ সময়ে উপরিউক্ত ৫টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশের নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২০১৮ নির্বাচন: ৮ নভেম্বর ২০১৮ থেকে ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ (৬৭ দিন)
২০২৪ নির্বাচন: ১৫ নভেম্বর ২০২৩ থেকে ২১ জানুয়ারি ২০২৪ (৬৮ দিন)
২০২৬ নির্বাচন: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (৭৭ দিন)
প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে “Bangladesh election” ইংরেজি কীওয়ার্ড ব্যবহার করে নির্ধারিত এই সময়সীমার মধ্যে পাওয়া সব কনটেন্ট প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সংগৃহীত তালিকা থেকে শুধুমাত্র খেলাধুলা সংক্রান্ত কনটেন্টগুলো মূল বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে।
তিনটি নির্বাচনী পর্বে (২০১৮, ২০২৪ এবং ২০২৬) ভারতের শীর্ষ পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড সার্চ করে মোট ৮১৪টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ‘সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক’ প্রতিবেদন ৬০৫টি এবং ‘পরোক্ষভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক’ এমন প্রতিবেদন ২০৯টি। (‘সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক’ এবং ‘পরোক্ষভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক’ এর ব্যাখ্যা প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে দেয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ কাঠামো
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের তিনটি জাতীয় নির্বাচনকে কীভাবে কভার করেছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য এই ‘মিডিয়া ওয়াচ’ প্রতিবেদনে নিচের ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন বা মাপকাঠি ব্যবহার করা হয়েছে:
১) পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর (২০১৮ ও ২০২৪) তুলনায় ২০২৬ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনের সংখ্যা কি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, নাকি কমেছে?
২) নির্বাচনকে কি একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নাকি সংঘাত, সহিংসতা, অস্থিরতা ও সংকটের ঘটনা হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে?
৩) ২০২৪-এ বিএনপি ও ২০২৬-এ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণহীন নির্বাচনে সংবাদমাধ্যম কি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে সমানভাবে ‘নির্বাচনের বৈধতার সংকট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে? আর শিরোনামে নির্বাচনকে কীভাবে ফ্রেম করা হয়েছে?
৪) নির্বাচনী বয়ানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ (Inclusive Election) ধারণাটি কি নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে?
৫) নির্বাচনকালীন সরকার বা কর্তৃপক্ষকে সংবাদমাধ্যমে কীভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে— ‘গণতান্ত্রিক নেতা’ বা ‘শক্তিশালী শাসক’ হিসেবে, নাকি ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ ফ্রেমে?
৬) নির্বাচনী কাভারেজে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা হিন্দুদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত প্রসঙ্গ কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এবং সেগুলোকে কীভাবে ফ্রেম করা হয়েছে?
৭) কাভারেজে কাদের বক্তব্য বা কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে— বাংলাদেশের সাধারণ ভোটার, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির, নাকি বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের?
৮) বর্ণনামূলক বিশ্লেষণে ফ্রেমিং (নির্বাচনের আগের দিন, ভোটের দিন এবং পরের দিন): নির্বাচনের এই চূড়ান্ত তিন দিনের প্রতিবেদনের বর্ণনায় ভারতীয় মিডিয়া নির্বাচনকে কীভাবে উপস্থাপন করেছে— একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে, নাকি বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, সংখ্যালঘু ইস্যু ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হওয়া একটি সংকট হিসেবে?
বিশ্লেষণ
১) পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর (২০১৮ ও ২০২৪) তুলনায় ২০২৬ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনের সংখ্যা কি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, নাকি কমেছে?
২০১৮ সালের নির্বাচনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে কাভারেজ ছিল একেবারেই নগণ্য। ২০২৪ সালেও তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালে কাভারেজের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পাঁচটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে মোট ৪৭টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ০.৭টি প্রতিবেদন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কাভারেজ কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭টিতে, সময়কাল ৬৮ দিন। অর্থাৎ দৈনিক গড় প্রায় ১.২৮টি প্রতিবেদন।
কিন্তু ২০২৬ সালের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ৬৮০টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এর অর্থ দাঁড়ায়, দৈনিক গড়ে প্রায় ৮.৮৩টি প্রতিবেদন যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১২.৬ গুণ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬.৯ গুণ বেশি।
কাভারেজের পরিমাণ ও ধরণ
তিনটি নির্বাচনী পর্বে (২০১৮, ২০২৪ এবং ২০২৬) ভারতের শীর্ষ পাঁচটি সংবাদমাধ্যমে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড সার্চ করে মোট ৮১৪টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ‘সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক’ প্রতিবেদন ৬০৫টি এবং ‘পরোক্ষভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক’ এমন প্রতিবেদন ২০৯টি।
এখানে ‘সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক’ বলতে এমন সব প্রতিবেদনকে বুঝানো হয়েছে যেসব প্রতিবেদনের মূল উপজীব্য সংশ্লিষ্ট বছরের নির্বাচন। যেমন: নির্বাচন সংক্রান্ত আপডেট, নির্বাচনী সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন, নির্বাচনকে ঘিরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি যেসব প্রতিবেদনের মূল উপজীব্য ছিল।
আর ‘পরোক্ষভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক’ বলতে এমন সব প্রতিবেদনকে বুঝানো হয়েছে যেগুলোর মূল উপজীব্য সংশ্লিষ্ট বছরের নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। তবে এসব প্রতিবেদনে নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠি, দল বা চলতি নানান ঘটনাপ্রবাহকেন্দ্রিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু, তারেক জিয়ার দেশে ফেরা, ওসমান হাদি হত্যা ইত্যাদি।

নির্বাচনভিত্তিক সরাসরি কাভারেজের তুলনামূলক চিত্র
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ৫টি সংবাদমাধ্যমে ২০১৮ সালের নির্বাচনকালীন ৬৭ দিনে সরাসরি নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ৪১টি, যা ২০২৪ সালের নির্বাচনকালীন ৬৮ দিনে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৩টিতে; তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৭ দিনে এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় মোট ৪৯১টিতে।

মিডিয়া ভিত্তিক প্রতিবেদন বেড়েছে
সংবাদমাধ্যমভিত্তিক মোট কাভারেজের চিত্র এক নজরে নিম্নরূপঃ
ইন্ডিয়া টুডে: ২৩৭টি
এনডিটিভি: ২০৯টি
আনন্দবাজার পত্রিকা: ১৩৫টি
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া: ১২৫টি
হিন্দুস্তান টাইমস: ১০৮টি
মিডিয়াভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনী পর্বে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেই প্রতিবেদনের সংখ্যা আগের দুই নির্বাচনের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
ইন্ডিয়া টুডেতে ২০২৬ সালে মোট ২১১টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, যা একই সময়সীমায় ২০১৮ সালে ছিল ৬টি এবং ২০২৪ সালে ছিল ২০টি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৩৫.১৭ গুণ বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১০.৫৫ গুণ বেশি।
এনডিটিভির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালে মোট প্রতিবেদন ছিল ১৭৭টি যা একই সময়সীমায় ২০১৮ সালে ১৫টি এবং ২০২৪ সালে ১৭টি। অর্থাৎ ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১১.৮০ গুণ বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১০.৪১ গুণ বেশি।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় ২০২৬ সালে মোট ১০৭টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যেখানে একই সময়সীমায় ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৮টি এবং ১০টি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১৩.৩৮ গুণ বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১০.৭০ গুণ বেশি।
হিন্দুস্থান টাইমসে ২০২৬ সালে মোট ৯৪টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আগের দুই নির্বাচনে একই সময়সীমায় যা ছিল যথাক্রমে ৫টি এবং ৯টি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১৮.৮০ গুণ বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১০.৪৪ গুণ বেশি।
আনন্দবাজার পত্রিকায় ২০২৬ সালে পাওয়া গেছে ৯১টি প্রতিবেদন। একই সময়সীমায় ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৩টি এবং ৩১টি। ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৭.০০ গুণ বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ২.৯৪ গুণ বেশি।
২) নির্বাচনকে কি একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নাকি সংঘাত, সহিংসতা, অস্থিরতা ও সংকটের ঘটনা হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে?
২০১৮ সালের নির্বাচনী কাভারেজে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের নির্বাচনকে প্রধানত একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, যেখানে সংঘাত বা সহিংসতার উল্লেখ ছিল একেবারেই নগণ্য। এরপর ২০২৪ সালে প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও, সেটিকে কোনো সংকট হিসেবে না দেখে বরং তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের 'নিশ্চিত বিজয়ের' একটি বৈধ ও উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখানো হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সংবাদমাধ্যমের ফ্রেমিংয়ে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এবার নির্বাচনকে আর কোনো স্বাভাবিক বা বৈধ প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখিয়ে বরং সরাসরি সংঘাত, সহিংসতা, দেশব্যাপী অরাজকতা এবং 'প্রহসন' (Farce) ও 'ভাঁওতা' (Sham) আখ্যা দিয়ে একটি চরম রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে ফ্রেম করা হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচন
৪৭টি প্রতিবেদনের বড় অংশই সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক এবং অংশগ্রহণমূলক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পাঁচটি সংবাদমাধ্যমেই নির্বাচনকে ভোট, ফলাফল, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মাত্র ৪টিতে শিরোনামে সহিংসতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এনডিটিভি : ২০১৮ সালে ১৫টি প্রতিবেদনের মাত্র ১টি প্রতিবেদনে “Voting For Bangladesh Elections Ends, 12 Killed In Violence” শিরোনামে নির্বাচনের সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে “Landslide Win For Sheikh Hasina In Bangladesh, Opposition Seeks New Vote, “Sheikh Hasina: Bangladesh's Democracy Icon-Turned-Iron Lady” এই শিরোনামগুলোতে 'Landslide Win' (বড় জয়) এবং 'Democracy Icon' (গণতন্ত্রের প্রতীক) এর মতো শব্দ ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে দল এবং সরকার হিসেবে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
হিন্দুস্থান টাইমস : ৫টির মধ্যে ১টি প্রতিবেদনে “Voting ends in Bangladesh election; 13 killed in poll related violence” শিরোনামে সহিংসতার উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে একইসময়ের একাধিক প্রতিবেদনে সে সময়ে নির্বাচনে শেখ হাসিনার জয়কে ““Bangladesh’s Hasina wins election by landslide as opposition demands new vote” শিরোনামগুলোতে ‘landside win’ এবং ‘electoral victory’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়া টুডে : ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে টাইমস অফ ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশ করা কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া "Hasina's victory makes her the longest-serving PM of Bangladesh" শিরোনামের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিজয় ও স্থিতিশীলতাকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়া টুডে "PM Modi congratulates Sheikh Hasina on landslide victory in Bangladesh elections" এবং "Bangladesh: Sheikh Hasina takes oath as the prime minister for the fourth time" শিরোনামগুলো ব্যবহার করে এই নির্বাচনকে 'বিপুল জয়' এবং একটি উৎসবমুখর ও সফল গণতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা: এই সংবাদমাধ্যমটিতে ২টি প্রতিবেদনে “নির্বাচনের আগে উত্তেজনা ঢাকায়, পুলিশ পেটাল বিএনপি কর্মীরা”, “নির্বাচনের মুখে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে উত্তপ্ত বাংলাদেশ, ভোট বানচাল করার অভিযোগ বিএনপি র বিরুদ্ধে” শিরোনামে মূলত বিএনপিকে জড়িয়ে নির্বাচনে বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনকে তারা উৎসবমুখর রূপেই ফ্রেম করেছে। “বিধিভঙ্গ-সিনেমা-বইয়ে জমে উঠেছে ভোট-রঙ্গ” এবং “আওয়ামি প্লাবনে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল বিএনপি-জামাত জোট, বাংলাদেশে ইতিহাস” এই ধরনের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে আনন্দবাজার পত্রিকা নির্বাচনটিকে মূলত একটি উৎসব ('ভোট-রঙ্গ') এবং ক্ষমতাসীন দলের ঐতিহাসিক ও নিরঙ্কুশ বিজয়ের আখ্যান হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচন
২০২৪ সালের নির্বাচনে সংগৃহীত মোট ৮৭টি প্রতিবেদনের মধ্যে ৭৩টিই ছিল সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচন বর্জন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও, শিরোনামে সহিংসতা বা সংকটের উল্লেখ ছিল মাত্র ৫টিতে। বাকি প্রায় সব কাভারেজেই নির্বাচনকে একটি স্বাভাবিক, বৈধ এবং শেখ হাসিনার 'নিশ্চিত বিজয়ের' আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমভিত্তিক চিত্রটি ছিল নিম্নরূপ:
এনডিটিভি:
তাদের কাভারেজে কেবল একটি প্রতিবেদনে "Troops Deployed Across Bangladesh Amid Fears Of Violence Ahead Of Elections" শিরোনামে সহিংসতার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে তাদের মূল ফোকাস ছিল ক্ষমতাসীন দলের নিশ্চিত বিজয়ের দিকে। "Bangladesh To Vote In Election Guaranteed To Give Sheikh Hasina Her 5th Term", “"People Are Enjoying": Bangladesh Home Minister To NDTV Amid Opposition Polls Boycott”, এবং “Bangladesh PM Sheikh Hasina Wins 5th Term Amid Opposition Boycott”,এই শিরোনামগুলোর মাধ্যমে বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচনকে মূলত একটি উৎসবমুখর ও বৈধ গণতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই ফ্রেম করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
এই সংবাদমাধ্যমে সংঘাত বা সহিংসতার চেয়ে নির্বাচন বর্জনকে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক জয় হিসেবেই বেশি ফোকাস করা হয়েছে। যদিও "Bangladesh's main Opposition BNP rejects Sunday's 'dummy polls”,“Bangladesh's main Opposition BNP rejects Sunday's 'dummy polls', demands fresh elections" এর মতো শিরোনামে বিরোধী দলের বর্জন ও নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে এসেছে, তবে তাদের মূল বয়ান ছিল নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক। "Sheikh Hasina secures historic Fifth Term as Prime Minister", "After Sheikh Hasina, who? The heirs to Bangladesh's 'iron grip' PM" এবং "Bangladesh elections 2024 top developments: Country goes to poll amid boycott by opposition শিরোনামগুলোর মাধ্যমে তারা একতরফা নির্বাচনটিকে একটি ঐতিহাসিক ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই বৈধতা দিয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস
এই সংবাদমাধ্যমটিও সরাসরি সহিংসতার বদলে বিরোধীহীন একতরফা নির্বাচনকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ফ্রেম করেছে। "Bangladesh turnout low in election. In 2018, it was more than 80%" শিরোনামে ভোটার উপস্থিতির ঘাটতি বা অস্থিরতার প্রসঙ্গ এলেও, তাদের সার্বিক কাভারেজ ছিল শেখ হাসিনার নিশ্চিত বিজয়কে কেন্দ্র করে। "Bangladesh election today: With no Opposition, Sheikh Hasina set to win again. Top points", "Sheikh Hasina's party clasps majority in Bangladesh election, set for a 5th term" এবং "Sheikh Hasina wins for the fifth time"-এর মতো শিরোনাম ব্যবহার করে তারা বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকেও অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে
এই মাধ্যমটিতে কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও মূল ফোকাস ছিল ক্ষমতাসীনদের বিপুল বিজয়ের দিকে। "US says Bangladesh elections 'not free and fair', UN raises concerns too" এবং "Sheikh Hasina threatens Bangladesh’s democracy she once fought for, allege critics" শিরোনামের মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সমালোচনার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি "How Sheikh Hasina outsmarted rivals, became undisputed queen of Bangladesh", "Prime Minister Sheikh Hasina wins record 4th straight term in landslide victory" এবং "PM Modi congratulates Sheikh Hasina after poll win: ‘Committed to further strengthen Bangladesh partnership" এর মতো শিরোনাম ব্যবহার করে একতরফা নির্বাচনকে একটি শক্তিশালী ও সফল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই ফ্রেম করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
বাংলা এই সংবাদমাধ্যমটি তাদের কয়েকটি প্রতিবেদনের শিরোনামে সংঘাত ও অস্থিরতার কথা উল্লেখ করেছে। যেমন "ভোট বয়কটের প্রচার ঘিরে ঢাকায় অশান্তি", "ভোটের আগেই বুথে আগুন বাংলাদেশে, কেন বিতর্ক রবিবারের ‘উৎসব’কে ঘিরে" এবং "অশান্তির আবহে নির্বাচন চলছে বাংলাদেশে, ভোট দিয়ে বেরিয়ে কী বললেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা?"। তবে সার্বিকভাবে তাদের কাভারেজের মূল সুর ছিল উৎসবমুখর এবং ক্ষমতাসীন দলের নিশ্চিত বিজয়ের পক্ষে। "টানা চার দফা, হাসিনা যেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা", "বেজে চলেছে প্রচার-সঙ্গীত ‘নৌকা, নৌকা’, চার দিকে উড়ছে সবুজ আবির, কুর্শিতে ফিরছেন হাসিনা" এবং "মসনদে মুজিব-কন্যাই, ‘বিরোধী’ও আওয়ামী লীগ!" এই ধরনের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে বিরোধীহীন একতরফা নির্বাচনকেও একটি বিপুল উৎসব এবং শেখ হাসিনার নিরঙ্কুশ সাফল্য হিসেবেই জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন
২০২৬ সালে এসে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ফ্রেমিংয়ের ধরনে আমূল পরিবর্তন ঘটে। মোট ৬৮০টি প্রতিবেদনের মধ্যে ৪৯১টি ছিল সরাসরি নির্বাচন সংক্রান্ত। এর মধ্যে অন্তত ৬২টি প্রতিবেদনের শিরোনামে নির্বাচনকে সরাসরি সংঘাত, সহিংসতা, প্রহসন এবং চরম সংকটের ঘটনা হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।
ফলে বিশ্লেষণে স্পষ্ট, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের বর্জনকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নির্বাচনের বৈধতার ক্ষেত্রে কোনো 'সংকট' হিসেবে দেখেনি। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই তারা 'সহিংসতা', 'ভাঁওতা' (Sham), 'প্রহসন' (Farce) ও 'রাষ্ট্রীয় অরাজকতার' চূড়ান্ত নজির হিসেবে ফ্রেম করেছে।
সংবাদমাধ্যমভিত্তিক চিত্রটি ছিল নিম্নরূপ:
এনডিটিভি (NDTV)
এই মাধ্যমে নির্বাচনকে মূলত সংঘাত, সহিংসতা, অরাজকতা এবং প্রহসন হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে। তাদের শিরোনামগুলোতে "US Embassy In Dhaka Warns Of Violence Ahead Of Bangladesh Elections", "Rule Of Law Must Come First Before Elections': Canadian MP On Bangladesh Violence" এবং "Clashes Outside Muhammad Yunus' House In Dhaka Ahead Of Bangladesh Polls"-এর মতো বাক্য ব্যবহার করে দেশব্যাপী সংঘাত ও অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকে অবৈধ ও প্রহসন প্রমাণ করতে "'Voterless, Illegal': Sheikh Hasina Wants Bangladesh Election Cancelled" এবং "‘Fanatics Now Rule B'desh, Yunus A Façade’: Ex-FM Mahmud Warns Of Sham Polls" এর মতো নেতিবাচক শিরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
এই সংবাদমাধ্যমটিতেও নির্বাচনকে চরম সংকট, প্রহসন ও অস্থিতিশীলতার ফ্রেম থেকে দেখানো হয়েছে। "First Post-Hasina Polls See BNP-Jamaat Clash, Violence..." এবং "Bangladesh Election Turmoil Deepens, Hasina's Awami League Rejects Poll Timeline Under Yunus Regime" শিরোনামের মাধ্যমে তারা নির্বাচনী সংঘাতকে চরম অশান্তি (Turmoil) হিসেবে তুলে ধরেছে। পাশাপাশি "Awami League Escalates Bangladesh Crisis With ‘No Boat No Vote’ Boycott Call Against Yunus Polls" এবং "Talibanisation of Bangladesh': Awami League student wing chief flags Yunus govt's role in minority persecution; fanning anti-India rhetoric"-এর মতো শিরোনাম দিয়ে তারা নির্বাচনকে চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় সংকটের সমার্থক করে তুলেছে। নির্বাচনকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও প্রতারণাপূর্ণ প্রমাণ করতে তারা "Deception and farce': Sheikh Hasina rejects Bangladesh poll results" শিরোনাম ব্যবহার করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে
এই মাধ্যমে নির্বাচনকে সরাসরি 'প্রহসন', 'বিশৃঙ্খলা' ও 'ফ্যাসিস্ট' ফ্রেম থেকে দেখানো হয়েছে। তাদের "Special Report: Bangladesh Spirals Into Chaos Ahead of 2026 Polls; Awami League Banned" এবং "Bangladesh looks at volatile turn as Sheikh Hasina's Awami League rejects ‘biased’ election under Muhammad Yunus" শিরোনামে নির্বাচনকে একটি বিশৃঙ্খলা (Chaos) ও অস্থিরতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে "Bangladesh's election farce: same cycle, different victims", "Elections in Bangladesh a sham, says Sheikh Hasina's son" এবং "Sham election staged by killer fascist Yunus: Sheikh Hasina demands cancellation of Bangladesh polls"-এর মতো শিরোনাম দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সরাসরি 'ফ্যাসিস্ট' এবং নির্বাচনকে নিছক 'ভাঁওতা' ও প্রহসন হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।
হিন্দুস্থান টাইমস
এই সংবাদমাধ্যমে নির্বাচনকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাপক সহিংসতা এবং বৈধতার সংকট হিসেবে ফোকাস করা হয়েছে। "Bangladesh unrest highlights...", "Media offices torched, cities on edge..." এবং "Bangladesh unrest: Protestors set fire..." শিরোনামগুলোতে মূলত 'Unrest', 'Torched', 'On edge'-এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে দেশজুড়ে অগ্নিসংযোগ ও চরম অস্থিরতার বয়ান তৈরি করা হয়েছে। একইসাথে "Fair polls impossible in Bangladesh under Yunus govt: Awami League" এবং "Bangladesh polls 'well-planned farce', low turnout shows rejection: Sheikh Hasina" শিরোনাম দিয়ে এই নির্বাচনকে একটি অসম্ভব ও পূর্বপরিকল্পিত প্রহসন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
বাংলা এই সংবাদমাধ্যমে নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ব্যাপক সংঘাত ও আশঙ্কার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। "‘অবৈধ সরকারের অবৈধ নির্বাচন কমিশন’, বলল ‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগ, আর কী বার্তা হাসিনার দলের?" এবং "নির্বাচন বাতিলের দাবিতে এ বার রাজপথে হাসিনার আওয়ামী লীগ! ঢাকাগামী সড়ক আটকে মশাল মিছিল" শিরোনামের মাধ্যমে তারা পুরো প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়া সংঘাত ও অস্থিরতা বোঝাতে "কোথাও বোমা, কোথাও গুলি, কোথাও কোপানো হচ্ছে দলীয় কর্মীকে!", "ফেব্রুয়ারিতে আদৌ ভোট হবে বাংলাদেশে? নতুন করে তাণ্ডব..." এবং "অশুভ সঙ্কেত, আশঙ্কা দিল্লির"-এর মতো শিরোনামে 'তাণ্ডব', 'বোমা-গুলি' ও 'অশুভ সঙ্কেত'-এর মতো নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে নির্বাচনকে ঘিরে একটি ভয়ংকর ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় সংকট প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে।
৩) ২০২৪-এ বিএনপি ও ২০২৬-এ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণহীন নির্বাচনে সংবাদমাধ্যম কি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে সমানভাবে ‘নির্বাচনের বৈধতার সংকট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে? আর শিরোনামে নির্বাচনকে কীভাবে ফ্রেম করা হয়েছে?
২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ভোট বর্জন করলেও, সেই অনুপস্থিতিকে তারা কোনোভাবেই 'গণতান্ত্রিক সংকট' বা অবৈধতা হিসেবে দেখায়নি; বরং বিরোধীদলবিহীন সেই নির্বাচনকে শেখ হাসিনার “undisputed queen” বা নিশ্চিত বিজয়ের ফ্রেমে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবেই তুলে ধরেছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তাদের ফ্রেমিং মৌলিকভাবে বদলে যায়। এবার একটি বৃহৎ দলের অনুপস্থিতিকেই তারা নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে দাঁড় করায় এবং “sham polls”, “Voterless, Illegal” ও “election farce”-এর মতো চরম নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিত্রায়িত করে।
যেমন, এনডিটিভি বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচনকে "Guaranteed" আখ্যা দিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্ধৃতিতে "People Are Enjoying" শিরোনাম প্রকাশ করে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া বিরোধী দলের বর্জনের খবর প্রচার করলেও সেটিকে শেখ হাসিনার "Historic Fifth Term"-এর পটভূমি হিসেবেই তুলে ধরে।
একইভাবে, হিন্দুস্থান টাইমস বিরোধীহীন অবস্থাকে নিশ্চিত জয় হিসেবে ফ্রেম করে লেখে, "With no Opposition, Sheikh Hasina set to win again" এবং "Clasps majority"।
ইন্ডিয়া টুডে একতরফা নির্বাচনকে "Landslide victory" আখ্যা দিয়ে শেখ হাসিনাকে "Undisputed queen" হিসেবে তুলে ধরে।
বাংলা সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা নির্বাচনকে উৎসবমুখর ও স্বাভাবিক হিসেবে দেখাতে "স্বপ্নের ফেরিওয়ালা" এবং "মসনদে মুজিব-কন্যাই"-এর মতো শব্দবন্ধ ব্যবহার করে।
এই পর্যায়ে ‘inclusive election’ ধারণাটি কার্যত অনুপস্থিত ছিল এবং নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নে তা কোনো কার্যকর মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।
কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনী কাভারেজে এই ফ্রেমিং মৌলিকভাবে বদলে যায়। একই ধরনের বাস্তবতা অর্থাৎ একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষের অনুপস্থিতি এবার নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
এনডিটিভি এবার বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে সরাসরি অবৈধ আখ্যা দিয়ে "Sham Polls", "Voterless, Illegal" এবং "Not Free Or Fair"-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া আগের ঐতিহাসিক বিজয়ের বয়ান পাল্টে এবার একই ঘটনাকে চরম সংকট ও প্রতারণা আখ্যা দিয়ে "Deception and farce", "Election Turmoil" এবং "Crisis"-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে।
হিন্দুস্থান টাইমস হঠাৎ করে নির্বাচনকে "inclusive" করার দাবি তুলে "Fair polls impossible" এবং "well-planned farce" বলে নির্বাচনকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইন্ডিয়া টুডে নির্বাচনকে "election farce" এবং "Sham election" আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি "blood-soaked landscape" ও "democracy in exile"-এর মতোনেতিবাচক ভাষায় বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। এ
কইভাবে আনন্দবাজার পত্রিকা সরাসরি নির্বাচন কমিশনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে "অবৈধ নির্বাচন কমিশন", এবং "অশুভ সঙ্কেত"-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা ও রাষ্ট্রীয় সংকটের বয়ান তুলে ধরে।
৪) নির্বাচনী বয়ানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ (Inclusive Election) ধারণাটি কি নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে?
২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সম্পূর্ণভাবে ভোট বর্জন করলেও, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সেই অনুপস্থিতিকে গণতান্ত্রিক সংকট হিসেবে না দেখে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছিল। উল্টো তারা একতরফা ওই নির্বাচনকে “landslide win” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, শেখ হাসিনাকে “undisputed queen” এবং “outsmarted rivals”-এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে প্রশংসায় ভাসিয়েছিল।
কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এসে তাদের বয়ান আমূল বদলে যায়। এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তারা হঠাৎ করেই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’-এর অভাবকে বৈধতার প্রধান শর্ত হিসেবে দাঁড় করায় এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে “farce election”, “sham polls” ও “crisis of legitimacy”-এর মতো নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে পুরো প্রক্রিয়াটিকে সরাসরি অবৈধ ও একটি বৃহৎ ভূরাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিত্রায়িত করে।
২০২৪ সালের নির্বাচন
২০২৪ সালের নির্বাচনী কাভারেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সম্পূর্ণ বর্জন সত্ত্বেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ ধারণাটি প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
এনডিটিভি
তাদের কাভারেজে বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও নির্বাচনকে উৎসবমুখর ও নিশ্চিত জয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্বাচনটি যে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনবে তা বোঝাতে "Guaranteed" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধীদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ উৎসব করছে বোঝাতে "People Are Enjoying" এবং "Amid Opposition Boycott" শব্দগুলো পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এছাড়া "Wins 5th Term" -এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে একতরফা নির্বাচনকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও বৈধ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে তুলে ধরেছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
বিএনপির নির্বাচন বর্জনকে গণতান্ত্রিক সংকট হিসেবে না দেখে বরং "historic Fifth Term" ফ্রেজ দিয়ে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। "boycott by opposition" বা বিরোধীদের দাবি করা "dummy polls"-এর কথা উল্লেখ থাকলেও, সার্বিকভাবে শেখ হাসিনার শাসনকে শক্তিশালী বোঝাতে "iron grip" এবং ভারতের সাথে ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে "Highlights New Delhi's role"-এর মতো অর্থবোধক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে এই একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে
শেখ হাসিনার এই একতরফা জয়কে তারা "landslide victory" বা বিপুল জয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিরোধীদের অনুপস্থিতি বোঝাতে "with no opposition" ব্যবহার করলেও, একে কোনো দুর্বলতা নয় বরং প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে "outsmarted rivals" ফ্রেজটি ব্যবহার করেছে। এছাড়া তাঁকে "undisputed queen" এবং তাঁর এই শাসনকালকে "record 4th straight term"-এর মতো অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছে।
হিন্দুস্থান টাইমস
বিরোধী দলের অনুপস্থিতি বোঝাতে তারা "With no Opposition" ফ্রেজটি ব্যবহার করলেও, এটিকে একটি নিশ্চিত ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে তুলে করতে "set to win again" শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছে। এছাড়া নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বোঝাতে "clasps majority", এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বোঝাতে "set for a 5th term" ও "wins for the fifth time"-এর মতো ইতিবাচক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে বিরোধীহীন নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
বাংলা এই সংবাদমাধ্যমটি শেখ হাসিনাকে "স্বপ্নের ফেরিওয়ালা" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে তারা কোনো সংকট না বলে বরং "মসনদে মুজিব-কন্যাই" ফ্রেজ দিয়ে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বুঝিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ শাসনকালকে "টানা চার দফা" এবং নির্বাচনী উৎসব বোঝাতে "নৌকা, নৌকা" ও "উড়ছে সবুজ আবির"-এর মতো বর্ণনামূলক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে নির্বাচনটিকে বৈধ হিসেবে ফ্রেম করেছে।

২০২৬ সালের নির্বাচন
এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় ২০২৬ সালের নির্বাচনী কাভারেজে। এই পর্বে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ (Inclusive Election) ধারণাটি হঠাৎ করেই নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণের একটি প্রধান শর্তে পরিণত হয়।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনের বাইরে থাকা বা নিষিদ্ধ হওয়া, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির প্রসঙ্গে এই ধারণাটি বারবার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনকে আগেই ‘অসম্ভব’, ‘অবৈধ’ বা ‘প্রহসন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন:
হিন্দুস্থান টাইমস (Hindustan Times): তাদের “India calls for ‘free, fair, inclusive’ polls in Bangladesh amid unrest” শিরোনামে ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থান থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দাবি তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে “Fair polls impossible in Bangladesh under Yunus govt: Awami League” এবং “One big party, Oppn disbanded: How Bangladesh poll resembles striking similarity with Pakistan” শিরোনামে বলা হয়, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। “Sheikh Hasina's Awami League banned...” এবং “Sheikh Hasina's 'boat' symbol absent from Bangladesh polls” শিরোনামে দলটির নিষেধাজ্ঞাকেই নির্বাচনের বড় নেতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে (India Today): ২০২৬ সালে তারা নির্বাচনকে সরাসরি ‘farce’ বা প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত করে। “Bangladesh's election farce: same cycle, different victims”, “Bangladesh a blood soaked landscape, democracy in exile”, এবং “Special Report: Bangladesh Spirals Into Chaos Ahead of 2026 Polls; Awami League Banned” এই শিরোনামগুলোতে একটি দলের নিষেধাজ্ঞা, সহিংসতা ও প্রশাসনিক বৈধতার প্রশ্নকে একত্রে জুড়ে নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া (TOI): এই সংবাদমাধ্যমটি ২০২৬ সালে ‘inclusive election’ ধারণাটিকে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে। “Official: EU observers will pay 'special attention' to minority issues in Bangladesh” শিরোনামে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণকে নির্বাচনের বৈধতার আন্তর্জাতিক শর্ত হিসেবে দেখানো হয়। একই সঙ্গে “Awami League Escalates Bangladesh Crisis With ‘No Boat No Vote’ Boycott Call”, “Cycle of retaliation: US lawmakers write to Yunus, express concern over banning Sheikh Hasina's Awami League”, “Deception and farce: Sheikh Hasina rejects Bangladesh poll results...” এবং “Bangladesh Election Turmoil Deepens...” শিরোনামগুলোর মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
এনডিটিভি (NDTV): এনডিটিভির কাভারেজেও নির্বাচনকে সরাসরি “sham polls” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। । “Jamaat Alleges Unfair Election Conditions in Bangladesh”, “Voting Begins In Bangladesh As Major Parties Face Bans And Restrictions”, “24 Hours Before Bangladesh Votes, US Lawmakers' 'Not Free Or Fair' Warning”, এবং শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে “'Voterless, Illegal': Sheikh Hasina Wants Bangladesh Election Cancelled” এর মতো শিরোনামে গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা: বাংলা এই সংবাদমাধ্যমটিও ২০২৬ সালে তাদের অবস্থান পুরোপুরি বদলে ফেলে। “অবৈধ সরকারের অবৈধ নির্বাচন কমিশন’, “নির্বাচন বাতিলের দাবিতে এ বার রাজপথে হাসিনার আওয়ামী লীগ”, “সংখ্যালঘু হত্যা নিয়ে কড়া বার্তা ঢাকাকে, দাবি সুষ্ঠু নির্বাচনেরও”, এবং “ব্যালটে নেই নৌকা, দেশছাড়া নেতৃত্ব, ভোটে কাকে বেছে নেবেন আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা” এই শিরোনামগুলোর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনকে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বৈধতার পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করানো হয় ।
একই সঙ্গে ২০২৬ সালের কাভারেজে নির্বাচনকে আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়নি। ইন্ডিয়া টুডে-র “Bangladesh-Pakistan defence deal…”, “Anti-India sentiment…”, “Assam will be part of Bangladesh…”; দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার “reshape India’s Northeast access”; এনডিটিভির “Pak-friendly BNP”, “Islamist party gaining ground”; এবং আনন্দবাজারের “অশুভ সংকেত, আশঙ্কা দিল্লির” এই ধরনের শিরোনামে নির্বাচনকে সরাসরি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং চীন-পাকিস্তান প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ফলে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যে নির্বাচনকে মূলত একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই নির্বাচনকেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সার্বিকভাবে এই তুলনা দেখায়, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজে শব্দচয়ন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ ধারণার ব্যবহার এবং বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এসব কোনো স্থির গণতান্ত্রিক মানদণ্ড অনুসরণ করেনি; বরং রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নির্বাচনের অর্থ ও বৈধতা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
৫) নির্বাচনকালীন সরকার বা কর্তৃপক্ষকে সংবাদমাধ্যমে কীভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে— ‘গণতান্ত্রিক নেতা’ বা ‘শক্তিশালী শাসক’ হিসেবে, নাকি ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ ফ্রেমে?
২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে ‘democracy icon’, ‘Iron Lady’ এবং ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ হিসেবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করে তাঁর ‘landslide victory’-কে দেশের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিল।
এরপর ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনেও এই প্রশংসাসূচক ফ্রেমিং অব্যাহত থাকে, যেখানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে তাঁকে ‘undisputed queen’ এবং ঐতিহাসিক বিজয়ী হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়; শাসনব্যবস্থার স্বৈরাচারী রূপ বা অবৈধতার কোনো প্রশ্ন সেখানে তোলা হয়নি।
কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিত্রায়িত করার ক্ষেত্রে তাদের বয়ান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এবার তারা নতুন সরকারকে অবৈধ ও চরমপন্থী-সমর্থক হিসেবে ফ্রেম করে এবং ‘murderous fascist’, ‘puppet regime’, ‘façade’ ও “Talibanisation of Bangladesh”-এর মতো চরম নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে বর্তমান নেতৃত্বকে একটি ক্ষমতাহীন মুখোশ ও অস্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে।

২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন
ইন্ডিয়া টুডে (India Today): এর শিরোনামগুলোতে শেখ হাসিনা ছিলেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রতীক। "How Sheikh Hasina outsmarted rivals, became undisputed queen of Bangladesh" শিরোনামে বিরোধীদের অনুপস্থিতি বা দুর্বলতাকে গণতান্ত্রিক ঘাটতি হিসেবে নয়; বরং তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একইভাবে "Sheikh Hasina wins record 4th straight term in landslide victory"-এর মতো শব্দচয়নে তাঁর শাসনকে জনপ্রিয় ও গণভিত্তিসম্পন্ন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছ।
এনডিটিভি (NDTV): এদের কাভারেজে শেখ হাসিনাকে প্রায় দ্বৈত রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। "Sheikh Hasina: Bangladesh's Democracy Icon Turned Iron Lady" কিংবা "From Champion of Democracy to Iron Lady" শিরোনামে তিনি একদিকে গণতন্ত্রের রক্ষক, অন্যদিকে কঠোর ও দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক। "Bangladesh To Vote In Election Guaranteed To Give Sheikh Hasina Her 5th Term"-এর মতো শিরোনামে তাঁর পুনর্নির্বাচনকে প্রায় অনিবার্য ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখানো হয়।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া (TOI): এই মাধ্যমটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ফ্রেম করেছে। "Hasina's victory makes her the longest serving PM" এবং "Sheikh Hasina secures historic Fifth Term"-এর মতো শিরোনামে দীর্ঘ শাসনকালকে স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা: বাংলা এই সংবাদমাধ্যমটিতেও এই ইতিবাচক ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। "টানা চার দফা, হাসিনা যেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা" শিরোনামে তিনি উন্নয়ন ও আশার প্রতীক, আর "মসনদে মুজিব কন্যাই, ‘বিরোধী’ও আওয়ামী লীগ!" শিরোনামে শক্তিশালী ও আধিপত্যশীল নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ভারতীয় মিডিয়ার বয়ানে শেখ হাসিনা ছিলেন ‘Democracy Icon’, ‘Iron Lady’, ‘Undisputed Queen’ এবং ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’। এই সময় নেতৃত্বের চিত্রায়নে স্বৈরাচার বা অবৈধতার ভাষা প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
২০২৬ সালের নির্বাচন : এর বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী কাভারেজে নেতৃত্বের ফ্রেমিংয়ে একটি মৌলিক ও নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়। এই পর্যায়ে সংবাদমাধ্যমগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক ও অবৈধতার ভাষায় উপস্থাপন করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে (India Today): তাদের "Sheikh Hasina Breaks Silence… Brands Yunus Administration A ‘Murderous Fascist’ Regime" শিরোনামে সরাসরি ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। "Bangladesh a blood soaked landscape, democracy in exile" শিরোনামে বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ব্যর্থ ও গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া (TOI): এই সংবাদমাধ্যমটি নতুন সরকারকে ‘পুতুল সরকার’ ও চরমপন্থার সহায়ক হিসেবে তুলে ধরেছে। “‘Murderous, fascist Yunus’: Hasina calls for overthrow of ‘puppet regime’” এবং "Talibanisation of Bangladesh… fanning anti India rhetoric"-এর মতো শিরোনামে তারা নেতৃত্বের সঙ্গে মৌলবাদ, অস্থিতিশীলতা ও ভারত-বিরোধিতার বয়ান জুড়ে দিয়েছে।
এনডিটিভি (NDTV): এদের কাভারেজে "Fanatics Now Rule B'desh, Yunus A Façade" শিরোনামে ড. ইউনূসকে ক্ষমতাহীন ও কেবল একটি প্রতীকী বা মুখোশধারী (‘façade’) শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
আনন্দবাজার পত্রিকা: বাংলা এই দৈনিকেও ২০২৬ সালে শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। “‘অবৈধ সরকারের অবৈধ নির্বাচন কমিশন’” কিংবা “‘ফ্যাসিস্ট ইউনূসের’ নৌকা প্রতীক নিষিদ্ধ”-এর মতো শিরোনামে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ প্রয়োগ করে সরকারকে অবৈধ ও দমনমূলক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
হিন্দুস্থান টাইমস (Hindustan Times): তাদের "Fair polls impossible in Bangladesh under Yunus govt" শিরোনামের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা সরাসরি নাকচ করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নেতৃত্বের চরিত্রায়ন কোনো স্থায়ী গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে করেনি। বরং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে একই দেশের সরকারকে এক সময় 'বৈধ ও শক্তিশালী শাসক', আবার অন্য সময়ে 'অবৈধ ও ফ্যাসিস্ট' হিসেবে ফ্রেম করেছে—যা নির্বাচনী বয়ান নির্মাণে মিডিয়ার রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
৬) নির্বাচনী কাভারেজে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা হিন্দুদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত প্রসঙ্গ কতটা গুরুত্ব পেয়েছে এবং সেগুলোকে কীভাবে ফ্রেম করা হয়েছে?
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে-বিদেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে নানা শঙ্কা ও উদ্বেগ থাকলেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তা প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল; সেসময় এটিকে নির্বাচনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বা সংকট হিসেবে তুলে ধরাই হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই ধারা অব্যাহত থাকে, যেখানে সংখ্যালঘু নির্যাতন বা হিন্দুদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নির্বাচনী কাভারেজে কার্যত সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী কাভারেজে চিত্রটি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। এবার হিন্দু বা সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গটি হঠাৎ করেই নিয়মিত, আবেগঘন ও ভয়াবহ ভাষায় উপস্থাপিত হয়ে নির্বাচনের 'প্রধান ইস্যু' ও জাতীয় সংকটে পরিণত হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো “lynching”, “mob rule”, “hate crimes”, “Talibanisation of Bangladesh” এবং “hacked to death”-এর মতো নেতিবাচক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ সহিংস ও সংখ্যালঘু-অসুরক্ষিত রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রেম করে
২০১৮ সাল:
এনডিটিভি (NDTV), দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া (TOI), হিন্দুস্থান টাইমস (HT) এবং আনন্দবাজার পত্রিকা: এই চারটি শীর্ষস্থানীয় মিডিয়ায় ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকালীন সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবেদন পাওয়াই যায়নি।
ইন্ডিয়া টুডে (India Today): এটি ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম, যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে দুটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় (যেমন— “1,792 persecutions on minorities... claims Hindu alliance”)। তবে এগুলো ছিল মূলত পরিসংখ্যানভিত্তিক; এগুলোকে নির্বাচনকালীন সহিংসতা বা সরাসরি নির্বাচনী ঝুঁকি বা সংকট হিসেবে দেখানো হয়নি।
এর বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী কাভারেজে চিত্রটি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। প্রায় সব শীর্ষ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং হিন্দুদের ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ হঠাৎ করে নিয়মিত, আবেগঘন ও ভয়াবহ ভাষায় উপস্থাপিত 'প্রধান ইস্যুতে' পরিণত হয়
সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজের ধরন বিশ্লেষণ করলে এই পরিবর্তনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ইন্ডিয়া টুডে (India Today): ২০২৬ সালের নির্বাচনকালীন সময়ে এই মাধ্যমে সংখ্যালঘু/হিন্দু কিওয়ার্ড আছে এমন ৪৬টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩৪টিই ছিল হিন্দু নির্যাতন সংক্রান্ত শিরোনাম। শিরোনামগুলোতে ধারাবাহিকভাবে “lynching”, “mob rule”, “mad murderers”, “hate crimes”, “unremitting hostility”, “set ablaze”, “set on fire”, “shot dead”, “stabbed”, “beaten to death”, “hacked to death”, “limbs tied, deep wounds”, “custody death”, “total lawlessness”, “6th in 18 days” এবং “12th killing in 42 days”-এর মতো নেতিবাচক ও শিউরে ওঠার মতো শব্দচয়ন ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি সহিংস ঘটনাকে আলাদা শিরোনামে তুলে ধরে বাংলাদেশকে একটি সহিংস ও সংখ্যালঘু-অসুরক্ষিত রাষ্ট্র হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।
এনডিটিভি (NDTV): এই মাধ্যমে সংখ্যালঘু/হিন্দু কিওয়ার্ড আছে এমন ১২টি সংবাদ পাওয়া যায়। তারা গ্রাউন্ড রিপোর্ট ও বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রশ্ন তোলে— “What's it like to be a Hindu in Bangladesh?”
এছাড়া ব্রিটিশ এমপিকে উদ্ধৃত করে “Hindus Being Killed: British MP Bob Blackman Flags Disastrous Situation In Bangladesh” শিরোনাম প্রকাশ করে। এসব প্রতিবেদনে “disastrous situation”, “Hindus being killed”, “lynching”, “mob attacks”, “beaten to death”, “hacked to death”, “hands and legs were tied”, “house set ablaze” এবং “dies in police custody”-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে একটি ভয়াবহ সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া (TOI): তাদের কাভারেজে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে শুধু সাধারণ সহিংসতা নয়, বরং চরমপন্থা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। “Talibanisation of Bangladesh”, “Hindus will not be allowed to stay”, এবং “Hindu businessman beaten to death”-এর মতো শিরোনামে বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক বিপর্যয়ের চূড়ান্ত প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা হয়।
পাশাপাশি হিন্দুদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, মনোনয়ন বাতিল বা সংখ্যালঘু দল গঠনের খবরও ২০২৬ সালে ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়, যা আগের দুই নির্বাচনে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল।
হিন্দুস্থান টাইমস (Hindustan Times):
২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এই সংবাদমাধ্যমটিতে সংখ্যালঘু নির্যাতন একটি নিয়মিত ও প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়। 'হিন্দু' কীওয়ার্ড থাকা ১৭টি সংবাদের মধ্যে অন্তত ১১টি ছিল সরাসরি হিন্দু বা সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ক। সংবাদগুলোতে “community in panic” এবং “Hindus being murdered”-এর শব্দগুচ্ছ ছাড়াও সহিংসতার বীভৎসতা ফুটিয়ে তুলতে “temples being burnt”,“stabbed, robbed, then set on fire” -এর মতো নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চরম অসহায়ত্ব বোঝাতে “chasing mob” এর মতো শব্দগুচ্ছ প্রয়োগ করে তীব্র নিরাপত্তাহীনতার বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি “Hindu lives matter” এবং “atrocities against minorities” পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে এই বিষয়টিকে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংকটের ফ্রেমে বন্দি করে ২০২৬ সালের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা: বাংলা এই সংবাদমাধ্যমটিতেও ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু নির্যাতন একটি দৃশ্যমান নির্বাচন-সংলগ্ন ইস্যু হয়ে ওঠে। তবে এখানে হিন্দুদের কণ্ঠ বা অধিকার কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে নয়, বরং মূলত ‘দিল্লির উদ্বেগ’ বা আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিফলন হিসেবেই বেশি উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন— “বাংলাদেশে হিন্দুদের উপরে হামলা নিয়ে ফের সরব দিল্লি” বা “সংখ্যালঘু হত্যা নিয়ে কড়া বার্তা ঢাকাকে...”-এর মতো শিরোনামগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দেয়।

সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দ্বিমুখী আচরণ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে নিয়মিত কাভারেজ দিলেও, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ম ওই দুই নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত অসংখ্য দেশীয় প্রতিবেদন, গুরুতর সতর্কতা এবং জাতিসংঘের মতো সংস্থার আন্তর্জাতিক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ভারতীয় মিডিয়ায় কার্যত কোনো গুরুত্বই পায়নি।
২০১৮ সালের নির্বাচন
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে দেশীয় গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি বারবার শঙ্কা প্রকাশ করেছিল:
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ একটি মহাসমাবেশ আয়োজন করে, যেখানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় ।
১২ নভেম্বর ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে “আসছে নির্বাচন, বাড়ছে সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে জাতিসংঘ (UN) এক প্রেস রিলিজে (“Bangladesh: UN human rights experts alarmed by violence ahead of election”) নির্বাচনের আগে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানায়। ওই রিপোর্টে বলা হয়, “In the run-up to the vote, religious minorities, especially Hindus, fear renewed targeting,” said the experts. “Unfortunately, these fears have a strong basis,” they said, adding that reports indicate that around 380 members of minority groups have been attacked in the first half of 2018.”
২২ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে প্রথম আলো “সংখ্যালঘুদের জন্য ৬১টি আসন ঝুঁকিপূর্ণ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে উল্লেখ করা হয়, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ৯৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৬১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং নাগরিক সমাজ নির্বাচন কমিশনের জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
তবু এই সময়ের ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্বাচনী কাভারেজে সংখ্যালঘু নির্যাতন বা এসব সতর্কবার্তা অনুপস্থিত ছিল।
১৮ সালের নির্বাচনের পর ৪ জানুয়ারি ২০১৯ সালে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকে 'মোটামুটি শান্তিপূর্ণ' বললেও ফেনীর সোনাগাজী, ঠাকুরগাঁও সদর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা এবং পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিসহ বিভিন্ন এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ করে। পরবর্তীতে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম আলো-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল ৮০৬টি।
এছাড়া ৬ জানুয়ারি ২০২০ সালে Hillvoice সংবাদ প্রকাশ করে , হিন্দু মহাজোটের দাবি অনুযায়ী ২০১৯ সালে ১০৮ জন হিন্দু নিহত হয়েছেন, ৯ হাজার ৫০৭ একর জমি দখল হয়েছে এবং ২৪৬টি প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে ।
এই ধরনের পরিসংখ্যান থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে কোনো ধারাবাহিক নিরাপত্তা সংকট বা সংখ্যালঘুকেন্দ্রিক নির্বাচনী বয়ান তৈরি হয়নি।
২০২৪ সালের নির্বাচন
২০২৪ সালের নির্বাচন ঘিরেও সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত একাধিক দেশীয় প্রতিবেদন পাওয়া যায়:
২১ জানুয়ারি ২০২৪ সালে ইত্তেফাক “সহিংসতায় বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন সংখ্যালঘুরা” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে।
৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে প্রথম আলো “সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় এড়াতে পারে না আ.লীগ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে জানায় যে, ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে ১০ দিনে অন্তত ১৩টি নির্বাচনকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে (১ জন নিহত, ৩৭ জন আহত)।
৮ জুলাই ২০২৪ সালে সময় টিভি ও প্রথম আলো হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বরাতে জানায়, এক বছরে (জুলাই ২০২৩-জুন ২০২৪) ১,০৪৫টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ৪৫ জন নিহত হয়েছেন।
এই তথ্যগুলো থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের নির্বাচনী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এসব ঘটনাকে বড় পরিসরে কোনো কাভারেজ দেয়নি।
এই পরিসংখ্যানভিত্তিক তুলনা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তা প্রায় অদৃশ্য ছিল । অথচ ২০২৬ সালে একই বিষয় হঠাৎ করে নির্বাচন কাভারেজের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। এই পরিবর্তন জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে যে, ভারতীয় মিডিয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ধারাবাহিক কোনো 'সামাজিক বাস্তবতা' হিসেবে কভার করেনি; বরং ২০২৬ সালের নির্বাচনী বয়ানে এটিকে একটি সংকট তৈরি, নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং নির্বাচনের বৈধতা নাকচ করার একটি সুপরিকল্পিত 'রাজনৈতিক ফ্রেম' হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে নিয়মিত ও ব্যাপকভাবে কাভারেজ দিলেও, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ছিল। ওই দুই নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত দেশীয় সংবাদ, সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ভারতীয় মিডিয়ায় কার্যত কোনো গুরুত্বই পায়নি।
৭) কাভারেজে কাদের বক্তব্য বা কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে— বাংলাদেশের সাধারণ ভোটার, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির, নাকি বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের?
২০১৮ সালের নির্বাচনী কাভারেজে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারে বয়ানই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রায় উপেক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও সংবাদমাধ্যমের প্রায় একক উৎস ছিলেন শেখ হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রীরা; সেসময় দেশের সাধারণ ভোটার, স্বাধীন সাংবাদিক বা সিভিল সোসাইটির মতামত সংবাদে প্রায় কোনো স্বতন্ত্র জায়গাই পায়নি।
কিন্তু পূর্ববর্তী দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে ২০২৬ সালের কাভারেজে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বরে বড় ধরনের স্থানান্তর ঘটে; তবে এবারও সাধারণ মানুষের কণ্ঠ উপেক্ষিত থাকলেও সেই শূন্যস্থানটি দখল করে নেয় বিদেশি সরকার (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা), আন্তর্জাতিক সংস্থা, পশ্চিমা বিশ্লেষক এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কতামূলক বক্তব্য।
২০১৮ সালের নির্বাচন: কণ্ঠস্বর— তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার ও শেখ হাসিনা
এই নির্বাচনে সাধারণ ভোটার বা সিভিল সোসাইটির মতামত উপেক্ষিত ছিল। সংবাদমাধ্যমের বয়ান তৈরি হয়েছিল মূলত শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে।
এনডিটিভি
মূলত শেখ হাসিনা ও মোদীর বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে "I Will Be 'Premier Of All'", "PM Modi Calls Bangladesh's Sheikh Hasina", "Bangladesh PM Says 'Conscience Is Clear'" সংবাদ প্রকাশ করেছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
এখানেও শেখ হাসিনাই ছিলেন প্রধান কণ্ঠস্বর। তারা "We have done some good work", "I will be everyone's premier", "Bangladesh delegation" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
হিন্দুস্থান টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডে
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বক্তব্যই ছিল সংবাদের ভিত্তি। তারা "PM Narendra Modi calls Sheikh Hasina...", "Hasina wins election...", "PM Modi congratulates Sheikh Hasina..." এবং "takes oath as the prime minister" শিরেনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
আনন্দবাজার
২০১৮ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের নির্বাচন: কণ্ঠস্বর— শেখ হাসিনা, তাঁর মন্ত্রী ও ভারত সরকার
এই নির্বাচনেও দেশের সাধারণ ভোটার বা স্বাধীন সাংবাদিকদের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। সংবাদমাধ্যমের প্রায় একক উৎস ছিলেন শেখ হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রীরা।
এনডিটিভি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকেই পুরো দেশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারা "People Are Enjoying: Bangladesh Home Minister", "India Our Trusted Friend" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে
সাধারণ মানুষ বা স্বাধীন সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর এই মাধ্যমে অনুপস্থিত ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন ও হাসিনার বক্তব্যকেই নির্বাচনের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। "Sheikh Hasina says India a trusted friend", "PM Modi congratulates Sheikh Hasina after poll win" শিরেনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
এই সংবাদমাধ্যমেও সাধারণ ভোটার বা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কোনো কণ্ঠস্বর পাওয়া যায়নি। মূলত প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ও স্তুতিমূলক বয়ানকে প্রাধান্য দিয়ে "ভোট দিয়ে বেরিয়ে কী বললেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা?" শব্দ প্রকাশ করেছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্থান টাইমস
এই দুটি গণমাধ্যমে ভোটার, সিভিল সোসাইটি বা বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতামতের সরাসরি কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।
২০২৬ সালের নির্বাচন: কণ্ঠস্বর— বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা বিশ্লেষক
পূর্ববর্তী দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে এই নির্বাচনে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বরে বড় ধরনের স্থানান্তর ঘটে। এবার সাধারণ মানুষের কণ্ঠের শূন্যস্থান দখল করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা।
এনডিটিভি
পশ্চিমা রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বাস্তবতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। "Canadian MP On Bangladesh Violence", "UK MP On Killings", "Global Body Flags Rise In Violence" এবং "US Embassy In Dhaka Warns"-এর মতো বিদেশি কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
আন্তর্জাতিক নজরদারি ও পশ্চিমা চাপকে গুরুত্ব দিয়ে "US lawmakers write to Yunus", "Official: EU observers will pay 'special attention'", "UN notes concerns" সংবাদ প্রকাশ করেছে।
হিন্দুস্থান টাইমস
ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের কাভারেজে "India calls for free, fair, inclusive polls", "UK MP flags Bangladesh violence", "UN rights chief urges impartial probe" এবং "US warns of extremist attacks"-এর মতো বিদেশি কণ্ঠস্বরগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তারা "India urges free and fair polls", "US lawmakers warn Yunus government" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
বিদেশি সরকারের সতর্কবার্তা ও দিল্লির শঙ্কাকে মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তারা "কড়া বার্তা ঢাকাকে", "নির্বাচনে অশান্তির আশঙ্কা! বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করল ট্রাম্প প্রশাসন, জারি সাত দফা নির্দেশিকা", "জামাত প্রধানের সঙ্গে বৈঠক সারলেন ঢাকার ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত! বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে জল মাপছে ব্রিটেনও" এবং "অশুভ সঙ্কেত, আশঙ্কা দিল্লির" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে কাভারেজের উৎস হিসেবে সম্পূর্ণভাবে বিদেশি ও ভূ-রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের ওপর নির্ভর করেছে।
সিভিল সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ: ২০১৮ সালের নির্বাচন
২০১৮ সালের নির্বাচনকে ভারতীয় মিডিয়া একটি 'স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক উৎসব' ও 'বিপুল বিজয়' হিসেবে চিত্রায়িত করলেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি এর স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে মূলত এই গুরুতর অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণগুলো অনুপস্থিত ছিল
২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর "Bangladesh: UN human rights experts alarmed by violence ahead of election" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ (OHCHR)। রিপোর্টে বিশেষজ্ঞরা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের বিষয়ে সর্তক করেন। তারা সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে জানান যে, ২০১৮ সালের প্রথমার্ধেই প্রায় ৩৮০ জন সংখ্যালঘু হামলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া খোদ একজন নির্বাচন কমিশনারের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা জানায় , নির্বাচনে মোটেও 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সবার জন্য সমান সুযোগ নেই।
২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি "Bangladesh Election" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (US Department of State)। যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের আগে বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণা ও সভা-সমাবেশে বাধা এবং হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। ভোটের দিন সাধারণ ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার মতো অনিয়মগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে বলে তারা উল্লেখ করে।
২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি "Minister for Asia statement on Bangladesh elections" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে যুক্তরাজ্য সরকার। ব্রিটিশ এশিয়া বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বিরোধী নেতাকর্মীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার এবং প্রচারণায় বাধা দেওয়ার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের কথা জানান। তিনি ভোটের দিন নজিরবিহীন প্রাণহানির ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেন এবং সব অভিযোগের একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের আহ্বান জানান।
২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি "Bangladesh: Election Abuses Need Independent Probe" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)। সংস্থাটি জানায় , নির্বাচনের আগে বিরোধী জোটের ৮,২০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং ১২,৩০০ জনকে আহত করা হয়েছে। তারা নোয়াখালীতে বিরোধী ভোটারকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং সাংবাদিকদের ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে এর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে।
২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি "একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘অংশগ্রহণমূলক’ হলেও ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ হয় নি" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি উল্লেখ করে, ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই 'নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা' হয়েছে। এছাড়া ৪১টি আসনে জাল ভোট এবং ৪২টি আসনে প্রশাসন ও পুলিশের নির্লিপ্ত বা পক্ষপাতমূলক ভূমিকার তথ্য তারা প্রমাণসহ উপস্থাপন করে। সংস্থাটি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে 'লজ্জাজনক' আখ্যা দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানায়।
সিভিল সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ: ২০২৪ সালের বাংলাদেশের নির্বাচন
২০২৪ সালের নির্বাচনকে ভারতীয় মিডিয়া শেখ হাসিনার 'ঐতিহাসিক বিজয়' এবং একটি 'স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা' হিসেবে চিত্রায়িত করলেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে মূলত আন্তর্জাতিক মহলের এই নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগগুলো স্থান পায়নি।
২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি "Parliamentary Elections in Bangladesh" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (US Department of State)। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানায় , অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের মতো তারাও মনে করে এই নির্বাচন 'অবাধ বা সুষ্ঠু' (not free or fair) হয়নি। তারা হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং নির্বাচনের দিন অনিয়মের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সব দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তারা নির্বাচনের আগে ও পরে হওয়া সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবি করে।
২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি "Bangladesh January 2024 election: FCDO statement" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর (FCDO)। যুক্তরাজ্য জানায়, এই নির্বাচনে বিশ্বস্ত, উন্মুক্ত এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার (credible, open, and fair competition) মতো গণতান্ত্রিক মানদণ্ডগুলো ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা হয়নি। তারা নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং প্রচারণাকালে সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সব দল অংশ না নেওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প (fullest range of voting options) পায়নি বলে তারা উল্লেখ করে।
২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি "Türk urges Bangladesh to change course, create conditions for truly inclusive democracy" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার (OHCHR)। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্ক উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে, নির্বাচনের পরিবেশ সহিংসতা এবং বিরোধী প্রার্থীদের দমনের মাধ্যমে কলঙ্কিত হয়েছে। তিনি ২৮ অক্টোবর থেকে প্রায় ২৫,০০০ বিরোধী সমর্থককে গ্রেপ্তার এবং অন্তত ১০ জনের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানান। গণগ্রেপ্তার, গুম ও নজরদারির মতো পদ্ধতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র যেন কেবল 'প্রসাধন' (cosmetic) না হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি "Bangladesh: Statement by the High Representative on behalf of the European Union on the parliamentary elections" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব প্রধান দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে এবং নজিরবিহীনভাবে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ জানায়। তারা সব অনিয়মের দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির ওপর থেকে সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার তাগিদ দেয়।
২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি "Bangladesh: Repression, Security Force Abuses Discredit Elections" শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)।
সংস্থাটি জানায় , ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং বিরোধী দলগুলোর ওপর সহিংসতার মাধ্যমে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশকে নষ্ট করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রায় ৮,০০০ বিরোধী নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং অনেককে 'গুম' (disappeared) করে বেআইনিভাবে আটকে রাখার তথ্য দেওয়া হয়। HRW একে 'প্রতিযোগিতাহীন' এবং 'বিশ্বাসযোগ্যতাহীন' নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করে।
বিগত তিনটি নির্বাচনের কাভারেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে সংবাদের 'উৎস' বা কাদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, তা নির্ধারিত হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে। এই পরিসংখ্যানভিত্তিক তুলনা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের সাধারণ ভোটার, নিরপেক্ষ সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির (যেমন: টিআইবি, এইচআরডব্লিউ) মতামত এবং আন্তর্জাতিক মহলের গুরুতর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তা প্রায় অদৃশ্য ছিল। অথচ ২০২৬ সালে একই ধরনের বিদেশি কণ্ঠস্বর ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা হঠাৎ করেই নির্বাচন কাভারেজের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
৮) নির্বাচনের আগের দিন, ভোটের দিন এবং পরের দিন: নির্বাচনের এই চূড়ান্ত তিন দিনের প্রতিবেদনের বর্ণনায় ভারতীয় মিডিয়া নির্বাচনকে কীভাবে উপস্থাপন করেছে— একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে, নাকি বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, সংখ্যালঘু ইস্যু ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হওয়া একটি সংকট হিসেবে?
২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়া নির্বাচনকে একটি 'স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া' এবং 'গণতন্ত্রের উৎসব' হিসেবে ফ্রেম করেছিল, যেখানে তৎকালীন সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই বর্ণনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সম্পূর্ণভাবে ভোট বর্জন করলেও, সেই একতরফা নির্বাচনকে কোনোভাবেই 'গণতান্ত্রিক সংকট' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং উৎসবমুখর পরিবেশে একে একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং আওয়ামী লীগের 'ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি' বা নিশ্চিত জয় হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছিল।
কিন্তু পূর্ববর্তী এই দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এসে তাদের বর্ণনামূলক ফ্রেমিং মৌলিকভাবে বদলে যায়। এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তারা এই নির্বাচনকে সরাসরি 'প্রহসন' ও 'অবৈধ' আখ্যা দেয় এবং একে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদের উত্থান ও 'ভারতের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি'-র ফ্রেমে বন্দি করে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে একটি ঘনীভূত সংকট হিসেবে উপস্থাপন করে।
২০১৮ সাল
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও ভারতীয় মিডিয়া সেগুলোকে কোনো সংকট হিসেবে দেখায়নি; বরং শিরোনাম ও বর্ণনার ভেতরেই তারা এই নির্বাচনকে একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও 'ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি' হিসেবে ফ্রেম করেছিল।
এনডিটিভি
এনডিটিভি "Sheikh Hasina: Bangladesh's Democracy Icon-Turned-Iron Lady" শিরোনামের সংবাদে শেখ হাসিনাকে একদিকে 'গণতন্ত্রের আইকন' এবং অন্যদিকে 'লৌহমানবী' হিসেবে তুলে ধরেছে। নির্বাচনের ফলাফল ও বিরোধীদের দাবি নিয়ে লেখা "Landslide Win For Sheikh Hasina In Bangladesh, Opposition Seeks New Vote" এবং "Bangladesh PM Says 'Conscience Is Clear' As Opposition Claims Poll Rigged" শিরোনামের প্রতিবেদনগুলোতে বিরোধীদের কারচুপির অভিযোগের কথা উল্লেখ থাকলেও, সেখানে শেখ হাসিনার গত এক দশকের "অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি" এবং তাঁর আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারচুপির অভিযোগগুলোকে রাষ্ট্রীয় সংকট হিসেবে না দেখিয়ে একে অর্থনৈতিক সাফল্যের সুফল হিসেবেই ফ্রেম করা হয়েছে।
হিন্দুস্থান টাইমস
এই সংবাদমাধ্যমটি "PM Narendra Modi calls Sheikh Hasina after her landslide win in Bangladesh" শিরোনামের সংবাদে নির্বাচনের অভ্যন্তরীণ ফলের চেয়ে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক লাভকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে লিখেছে , এই সরকারের ভারতের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গিদের দমন করতে সাহায্য করেছে।
ভোটের দিনের সহিংসতা নিয়ে "Voting ends in Bangladesh election; 13 killed in poll-related violence" শিরোনামে সংঘাতের কথা থাকলেও, সেখানে মূলত শেখ হাসিনার বিপুল বিজয় এবং তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ("I trust my people") ফোকাস করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া "Hasina's victory makes her the longest-serving PM of Bangladesh" শিরোনামের বর্ণনায় গণতান্ত্রিক কোনো সংকটের কথা উল্লেখ না করে সরাসরি ভারতের স্বস্তির জায়গাটি তুলে ধরে লিখেছে , ভারতীয় কূটনীতিকরা এই নির্বাচনের ফলাফলে অত্যন্ত খুশি কারণ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হাসিনার অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাস দমনে সাহায্য করেছে।
এছাড়া নির্বাচনকে আধুনিক দেখাতে তারা "Bangladesh uses EVMs for first time in general election" শিরোনামের সংবাদ প্রচার করেছে।
ইন্ডিয়া টুডে
ইন্ডিয়া টুডে "Sheikh Hasina declared winner in Bangladesh general elections, Opposition alleges foul play" শিরোনামে বিরোধীদের অভিযোগের কথা বললেও, তারা শেখ হাসিনার "উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি" (ambitious economic agenda)কে সবচেয়ে বড় করে দেখিয়েছে।
পাশাপাশি "PM Modi congratulates Sheikh Hasina on landslide victory in Bangladesh elections" শিরোনামের বর্ণনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তাকে ফোকাস করে তারা এই নির্বাচনকে ভারতের আঞ্চলিক পলিসির একটি বড় সাফল্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০২৪ সাল
২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সম্পূর্ণভাবে ভোট বর্জন করলেও, সেই একতরফা নির্বাচনকে কোনোভাবেই 'গণতান্ত্রিক সংকট' বা অবৈধতা হিসেবে ফ্রেম করা হয়নি। বরং একে নিশ্চিত বিজয়ের একটি স্বাভাবিক ও বৈধ রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
এনডিটিভি
বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও এনডিটিভি তাদের "Bangladesh To Vote In Election Guaranteed To Give Sheikh Hasina Her 5th Term" শিরোনামের বর্ণনায় একে একটি নিশ্চিত জয়ের স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ফ্রেম করেছে। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করে এই বিরোধীহীন নির্বাচনকে প্রকারান্তরে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক আবহের দৃষ্টান্ত হিসেবে "Anowara Islam Rani Is Bangladesh's 1st Transgender To Contest An Election" শিরোনামের খবর প্রচার করে নির্বাচনের একটি ইতিবাচক চিত্র আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
এই সংবাদমাধ্যমটি "Bangladesh elections 2024 top developments: Country goes to poll amid boycott by opposition; PM Hasina casts vote, highlights India's role in Liberation War" শিরোনামের বর্ণনায় বিরোধী দলের বর্জনের চেয়ে শেখ হাসিনার মুখে ভারতের প্রশংসার বয়ানটিকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। একতরফা নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবেই মেনে নেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে
ইন্ডিয়া টুডে "Bangladesh votes in election boycotted by opposition, Sheikh Hasina set for 5th term" শিরোনামের বর্ণনায় নির্বাচনকে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লির জন্য একজন 'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র' (crucial ally) হিসেবে বর্ণনা করেছে। এছাড়া "Bangladesh: PM Hasina likely to secure 4th term as opposition boycott takes sting out of polls" শিরোনামের মাধ্যমে বিরোধীদের বর্জনকে পাশ কাটিয়ে একে একটি নিশ্চিত বিজয় হিসেবেই ফ্রেম করেছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
বাংলা এই গণমাধ্যমটি "ভোটের আগেই বুথে আগুন বাংলাদেশে, কেন বিতর্ক রবিবারের ‘উৎসব’কে ঘিরে" শিরোনামে বিতর্কের কথা বললেও নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব’ হিসেবেই আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া "বিত্তশালী প্রার্থীর ছড়াছড়ি বাংলাদেশে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে কোটিপতি ক’জন?" শিরোনামে নির্বাচনকে স্বাভাবিক ও উৎসবমুখর হিসেবে প্রচার করেছে।
২০২৬ সাল
পূর্ববর্তী দুই নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিপরীতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এসে তাদের ফ্রেমিং মৌলিকভাবে বদলে যায়। এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে তারা পুরো নির্বাচনকে সরাসরি 'প্রহসন', 'অবৈধ', সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ভারতের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকির ফ্রেমে তুলে ধরে।
এনডিটিভি
এনডিটিভি নির্বাচনকে অবৈধ ও প্রহসন হিসেবে তুলে ধরতে শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে "'Voterless, Illegal': Sheikh Hasina Wants Bangladesh Election Cancelled" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদের বর্ণনায় তারা শেখ হাসিনার দাবি তুলে ধরে লেখে, ভোটকেন্দ্রগুলো "সম্পূর্ণ ভোটারশূন্য" ছিল এবং দিনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে মাত্র ১৪.৯৬% ভোটের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে জনগণ এই নির্বাচন বর্জন করেছে, যেখানে দেদারসে টাকার ছড়াছড়ি ও ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে "Jihadis Are In Power: Taslima Nasrin Slams Yunus Regime Ahead Of Bangladesh Polls" এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে "24 Hours Before Bangladesh Votes, US Lawmakers' "Not Free Or Fair" Warning" সংবাদের বর্ণনায় বলা হয়, বাংলাদেশে "ইসলামিক কট্টরপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে" এবং তারা শরিয়া আইন কায়েম করলে নারী ও সংখ্যালঘুরা তাদের সব অধিকার হারাবে, যা একটি বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। পাশাপাশি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্ধৃত করে বর্ণনায় বলা হয়, বর্তমান ইউনূস সরকারের অধীনে হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর "পরিকল্পিত নিপীড়ন" চলছে, যা মূলত ১৯৭১ সালের গণহত্যার আদর্শেরই পুনরাবৃত্তি।
দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
টাইমস অফ ইন্ডিয়া এই নির্বাচনকে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসের কেন্দ্র হিসেবে ফ্রেম করে "Hub of terrorism’: Congressional briefing alleges 'coordinated violence' against Hindus in Bangladesh ahead of Feb 12 election" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদের বর্ণনায় তারা মার্কিন ব্রিফিংয়ের সূত্র ধরে এই নির্বাচনকে "পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের একটি ভাঁওতা বা প্রহসনের নির্বাচন (sham election with predetermined results)" আখ্যা দেয় এবং একে জাতিগত নিধনের ঘটনা হিসেবে চিত্রায়িত করে।
"'Deception and farce': Sheikh Hasina rejects Bangladesh poll results, calls it 'disgraceful chapter" বর্ণনায় শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে দেখায়, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটের হিসাব "অবাস্তব ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ" এবং এটি একটি সম্পূর্ণ সাজানো জালিয়াতি।
হিন্দুস্থান টাইমস
এই সংবাদমাধ্যমটি "Hours ahead of Bangladesh voting, tea worker found dead with hands, feet tied" এবং "Jamaat, before losing Bangladesh elections, offered 15,000 takas to each voter: Report" শিরোনামের বর্ণনায় ভোটের আগে সংখ্যালঘু খুন ও ঘুষের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এছাড়া ভারতের অস্বস্তি তুলে ধরে "‘Send her back’: BNP reaffirms demand for Sheikh Hasina’s extradition from India after poll win" শিরোনামের সংবাদ প্রকাশ করেছে। বর্ণনায় উল্লেখ করে, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে বিএনপি ভারত সরকারকে চাপ দেবে, যা ভারতের জন্য একটি সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক অস্বস্তি হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা
ভোটের আগের রাতেই ব্যাপক তাণ্ডব বোঝাতে তারা "কোথাও বোমা, কোথাও গুলি, কোথাও কোপানো হচ্ছে দলীয় কর্মীকে! ভোটের আগের রাতেই অশান্তি শুরু বাংলাদেশে" এবং "ভোটের আগে বাংলাদেশে ফের এক যুবককে খুনের অভিযোগ! উদ্ধার হাত-পা বাঁধা লাশ..." সংবাদের বর্ণনায় পুরো নির্বাচনকে একটি ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় সংকট ও বিশৃঙ্খলা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এছাড়া "বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি ভোটকেন্দ্র ‘স্পর্শকাতর’! মোতায়েন হচ্ছে ৯ লক্ষের বেশি নিরাপত্তাকর্মী..." শিরোনাম প্রকাশ করে। এর বর্ণনায় তারা বিস্তারিত তুলে ধরে, দেশের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৪ হাজার কেন্দ্রকেই পুলিশ অত্যন্ত বা মাঝারি মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার ফলে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে একটি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতিকর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
এই মিডিয়া ওয়াচটি তথ্যভিত্তিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্বাচনী কাভারেজ বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছে। তবে এই প্রতিবেদনের কিছু সীমাবদ্ধতা ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে, যা পাঠকের বিবেচনায় রাখা জরুরি।
প্রথমত, এই বিশ্লেষণটি সম্পূর্ণভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, এখানে যেসব প্রতিবেদন বা শিরোনাম বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণ প্রতিফলন নাও হতে পারে। গণমাধ্যম কী প্রকাশ করেছে এবং বিষয়গুলোকে কীভাবে ফ্রেমিং করেছে—সেটিই এখানে বিশ্লেষণের মূল বিষয়; বাস্তবে কী ঘটেছে, তা যাচাই করা এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য নয়।
দ্বিতীয়ত, এই গবেষণায় কেবল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচার, টকশো, ইউটিউব কনটেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা সম্পাদকীয় এই বিশ্লেষণের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
তৃতীয়ত, নমুনা নির্বাচন করা হয়েছে ভারতের পাঁচটি শীর্ষ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। যদিও এগুলো অত্যন্ত প্রভাবশালী, তবু আঞ্চলিক ভাষার অন্যান্য সংবাদমাধ্যম, বিকল্প ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সুনির্দিষ্ট আদর্শিক অবস্থানধারী মিডিয়া এই বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি। ফলে ভারতীয় মিডিয়া বয়ানের পূর্ণাঙ্গ বৈচিত্র্য এখানে ধরা নাও পড়তে পারে।
চতুর্থত, ভাষা ও ফ্রেমিং বিশ্লেষণে গুণগত পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে। শিরোনাম, শব্দচয়ন ও বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের সাধারণ প্রবণতা শনাক্ত করা হলেও, ফ্রেমিং পরিমাপে কোনো স্বয়ংক্রিয় টেক্সট অ্যানালাইসিস বা কোডিং সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়নি।
পঞ্চমত, সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শুধুমাত্র “Bangladesh election” কীওয়ার্ড প্রয়োগ করা হয়েছে। অন্য কোনো বিকল্প কীওয়ার্ড (যেমন— রাজনৈতিক দলের নাম, নির্দিষ্ট প্রার্থী বা ঘটনা) আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয়নি। এই একটি কীওয়ার্ড দিয়ে প্রাপ্ত সংবাদগুলো থেকে অপ্রাসঙ্গিক কনটেন্ট বাদ দিয়ে কেবল নির্বাচন, সংখ্যালঘু ইস্যু ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ক সংবাদগুলোই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গুগল সার্চ অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু প্রাসঙ্গিক সংবাদ হয়তো এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাও হয়ে থাকতে পারে।
দ্যা ডিসেন্ট