স্বাস্থ্যখাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ ও নৈতিক অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অগ্রগতি নির্ভর করছে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ প্রশাসন, চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এই তিন গোষ্ঠীর সমন্বিত ও নৈতিক কার্যক্রমের ওপর।
তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সফলতা কতটুকু আসবে তা নিয়ে তিনি নিজেও সংশয়ে রয়েছেন। তার মতে, এই তিনটি খাত যদি একটি ‘সরল রেখায়’ এসে সৎ মানসিকতা ও মেডিকেল এথিক্স অনুসরণ করে কাজ না করে, তাহলে বিশ্বমানের প্রযুক্তি বা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় তাদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এই সম্মানিত গোষ্ঠী জাতিকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এখনও তারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তবে ওষুধ শিল্প নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কিছু ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যে নির্ধারিত উপাদানের তুলনায় অনেক কম উপাদান পাওয়া যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম। তা সত্ত্বেও এসব ওষুধ বাজারজাতের অনুমতি পাচ্ছে। অন্যদিকে, ভালো মানের ওষুধ উৎপাদনকারী কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যখাতে ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া অনেক সময় এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়। টিকা কেনার ক্ষেত্রেও বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়, যা সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, আমরা নিজেরাই স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতিকে প্রমোট করছি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, এই বাস্তবতাগুলো স্বাস্থ্য দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে খোলাখুলি আলোচনা করা প্রয়োজন।
পরিবেশগত ঝুঁকির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে অবৈধভাবে ব্যাটারি পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কার্যক্রম থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগের কারণ হচ্ছে। তিনি জানান, নিজ এলাকায় এমন একটি কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগও নিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অন্যথায় একদিকে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো হলেও অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ ও অনিয়ম চলতে থাকলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার উচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখা জরুরি। তা না হলে যত অর্থই ব্যয় করা হোক, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
সবশেষ তিনি বলেন, দেশের গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চিকিৎসক ও নার্সরা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে দুর্নীতি বন্ধ না করলে এই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনবে না। তাই স্বাস্থ্যখাতের সব স্তরে দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।