আজ ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির দিনে দেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বাস্তব চিত্র যেন ভিন্ন এক গল্প বলছে। এখানে চরম চিকিৎসক সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো মানুষ।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৩২৬ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২৫ জন। শূন্য রয়েছে ২০১টি পদ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট আরও প্রকট, ৮৪টি কনসালটেন্ট পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে সেবার মান সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। ৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন চিকিৎসক; শূন্য ২৯টি পদ। কনসালটেন্ট ১৪ জনের জায়গায় রয়েছেন মাত্র ৭ জন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন দীর্ঘ সারি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক রোগীকেই সেবা না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি, অর্থোপেডিক্স ও চক্ষুসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসককেই একাধিক বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। জরুরি বিভাগ চালু থাকলেও তা সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি আছেন প্রায় ৩০০ রোগী। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জন। কিন্তু প্যাথলজি সেবা সীমিত, গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধও মিলছে না নিয়মিত।
এক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা গরিব মানুষ, সরকারি হাসপাতালে আসি কম খরচে চিকিৎসার জন্য। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে যেতে হলে এখানে এসে লাভ কী? চিকিৎসাসেবা না পেয়ে অনেক রোগীকেই বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দালাল চক্র।
উপকূলীয় এই জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই চিত্র দেখা গেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ৩৪ পদের বিপরীতে ১৩ জন কর্মরত, শূন্য ২১, দেবহাটায় ৩৯ পদের বিপরীতে ১৭ জন, শূন্য ২২, কালীগঞ্জে ৪৬ পদের বিপরীতে ১৩ জন, শূন্য ৩৩, কলারোয়ায় ৪৬ পদের বিপরীতে ১৫ জন, শূন্য ৩১, শ্যামনগরে ৪৬ পদের বিপরীতে ২০ জন, শূন্য ২৬, তালায় ৪৬ পদের বিপরীতে ২০ জন, শূন্য ২৬। এসব প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট পদের অধিকাংশই শূন্য, ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেশি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো নয়, জনবল নিয়োগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে চিকিৎসক সংকট দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তবেও প্রতিফলিত হয়।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে যে সংকট রয়েছে, কিছুসংখ্যক মেডিকেল অফিসার পেলেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।