নিজেদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে এক বছর আগে সরকারের কাছে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরে পুলিশ বাহিনী। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উপলক্ষে উত্থাপিত এসব দাবির একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এতে দেশের প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কাঠামোগত সমস্যা থাকায় বাহিনীর কার্যকারিতা ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে ওই প্রস্তাব পাঠায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। এতে বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, অভ্যন্তরীণ তদন্ত ব্যবস্থা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলোতে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পুলিশ পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার স্বাক্ষরিত প্রস্তাবনায় বলা হয়, পুলিশ এমন একটি বাহিনী যা ছাড়া কয়েক মুহূর্তও পার হওয়া কঠিন। দেশের বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে যখন অন্য সংস্থার কর্মীরা অনুপস্থিত থাকতেন, তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর পোশাকবিহীন অবস্থায় বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের পাশে ছিল। এ কারণে বাহিনীর সদস্যদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন বা বিকল্পভাবে ওভারটাইম ভাতা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবার জন্য ঝুঁকি ভাতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে কেবল কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত সীমিত পরিসরে ভাতা দেওয়া হয়।
পদোন্নতি ব্যবস্থায় বৈষম্যের বিষয়টিও প্রস্তাবে গুরুত্ব পায়। এতে বলা হয়, সরকারের অন্যান্য দপ্তরের মতো পুলিশের ইন্সপেক্টর পদে ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ থাকা উচিত। এছাড়া এসআই ও এডিশনাল এসপি পদে বিভাগীয় পদোন্নতির হার বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে এসআই পদে ৫০ শতাংশ এবং এএসপি পদে এক তৃতীয়াংশ বিভাগীয় পদোন্নতি দেওয়া হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক নন-ক্যাডার সদস্য দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার রাখতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠনের সুপারিশও স্মারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, কমিশন গঠিত হলে পুলিশ কেবল নিজেদের পেশাগত কার্যক্রমের জন্য জবাবদিহি করবে এবং বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমবে। ভেটিংসহ যাবতীয় তদন্ত প্রক্রিয়া পুলিশের নিজস্ব শাখার মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যাতে কর্মকর্তা অন্য সংস্থার তদন্তের কারণে পদোন্নতি বা পদায়নে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জন্য উপপরিদর্শক (এসআই) ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কনস্টেবল ও এসআইদের প্রশিক্ষণকালীন বেতন-ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে সার্জেন্ট ও এএসপি পদে প্রশিক্ষণকালীন বেতন দেওয়া হয়।
পদোন্নতির পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতার বিষয়টিও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কনস্টেবল থেকে নায়েক/এএসআই (নিরস্ত্র)/এটিএসআই, নায়েক থেকে এএসআই (সশস্ত্র), এএসআই (সশস্ত্র) থেকে এসআই (সশস্ত্র), এটিএসআই থেকে টিএসআই এবং এএসআই (নিরস্ত্র) থেকে এসআই (নিরস্ত্র) পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পুনরায় পরীক্ষার নিয়ম বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়াও এটিএসআই থেকে টিএসআই পদে পদোন্নতির জন্য চাকরির মেয়াদ ছয় বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার এবং ক্যাম্প প্রশিক্ষণ বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অযৌক্তিক কারণে চাকরিচ্যুত বা পদোন্নতিবঞ্চিতদের বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে যাচাই-বাছাই শেষে পুনর্বহাল ও প্রাপ্য সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় মামলার তদন্ত তিন মাসের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। এছাড়া পুলিশের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫-এ অংশ নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে সিরাজগঞ্জে কর্মরত এই কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, বাস্তবতার কারণে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই নিয়মিত আট ঘণ্টার কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব, ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে সে অনুযায়ী কোনো ওভারটাইম ভাতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন সরকার এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনিক ও নীতিগত কারণে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ধাপে ধাপে হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া অপরিহার্য।