Image description

আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়া। জনসংখ্যা, অর্থনীতির ধরন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের আকারের দিক থেকে দেশটির সঙ্গে অনেক সামঞ্জস্য রয়েছে বাংলাদেশের।

তবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকারে দুই দেশের চিত্রটা ভিন্ন। প্রায় ২৪ কোটি মানুষের নাইজেরিয়ার জিডিপি বর্তমানে ২৮৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের যেখানে জিডিপি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার বলে দাবি করা হচ্ছে।

একইভাবে জনসংখ্যা ও অর্থনীতির কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় আরেক দেশ পাকিস্তান। প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি মানুষের এ দেশটির জিডিপি ৩৪০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। অথচ দুই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের (আমদানি ও রফতানি) আকার কাছাকাছি। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারেও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তান।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের জিডিপিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে ভুয়া বা অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরতে গিয়েই মূলত ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে জিডিপির আকার। বিপরীতে প্রকৃত অবস্থা থেকে কম দেখানো হয়েছে মূল্যস্ফীতির হার। জিডিপির অতিরঞ্জিত এ আকার কেবল সরকারের জন্য বাড়তি ঋণ সুবিধাই সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের জিডিপির আকার ছিল ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকার ঋণ নেয় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা হিসাবে সরকারের নেয়া এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭৬ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে বাংলাদেশের ডেট টু জিডিপি রেশিও বা ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে সরকারের এ ঋণের হিসাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেয়া ঋণের তথ্য যোগ করা হয়নি। সেটি যোগ করলে এর স্থিতি সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য এবং অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার সমপর্যায়ের। সেক্ষেত্রে দেশের জিডিপির আকার হতে পারে ৩০০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। কিন্তু গত দেড় দশকে এটিকে টেনে প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করেছিল, তাদের প্রতিবেদনেও বিবিএসের ভুয়া তথ্যের বিষয়টি উঠে আসে। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস বহুবার অতিরঞ্জিত জিডিপির বিষয়টি বিশ্বমহলে তুলেও ধরেছিলেন। একই সঙ্গে জিডিপির ভুয়া তথ্য সংশোধনের কথাও বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে আর কোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়নি। এখন জিডিপির হিসাব সংশোধন করলে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের ঋণ নেয়ার সক্ষমতা অনেক কমে যাবে। আর বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারকে আর খুব বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী হবে না।

জিডিপির অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান তৈরিসহ গত দেড় দশকে অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর ভুয়া তথ্য ও জরিপ তৈরি করেছে বিবিএস। সরকারি এ সংস্থার কাঠামোগত সংস্কারে একটি স্বাধীন টাস্কফোর্সও গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে বিবিএসের নাম পরিবর্তনসহ বেশকিছু সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই কমিটির সদস্য ছিলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

জিডিপির ভুয়া পরিসংখ্যানসহ বিবিএস সংস্কারের সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধির হিসাবের অতিরঞ্জিত তথ্য নিয়ে বহু বছর ধরেই আমরা প্রতিবাদ করে আসছি। বিবিএসের দেয়া মূল্যস্ফীতির তথ্যেও গোঁজামিল আছে। সংস্থাটির তথ্যের উৎস ও জরিপের পদ্ধতিতে কী ধরনের দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশ দিয়েছি।’

টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে বিবিএসে কোনো পরিবর্তন দেখেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিবিএস মার্চের মূল্যস্ফীতির যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেটি বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। ইরানসহ মধ্যপ্রচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। সেবা নিতেও মানুষের হয়রানি ও ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বিবিএস মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য দিয়েছে। তাহলে মানুষ কীভাবে সংস্থাটির তথ্য বিশ্বাস করবে?’

বিগত সময়ে জিডিপির তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর বিষয়টি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও তুলে ধরেছেন। গত ২৯ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘অতীতের সরকারগুলো যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বা মোট জিডিপির পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে, সেটার সংস্কার আমরা এরই মধ্যে শুরু করেছি। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির মাধ্যমে আপনারা জেনেছেন যে অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরে কীভাবে তথ্যের কারচুপি হয়েছে। তাই জিডিপির প্রকৃত আকার যখন আমরা পাব, তখন করের সঙ্গে এর আনুপাতিক হারটিও বাস্তবসম্মত হবে।’

‘কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম: চেঞ্জ অব ফ্যাব্রিক’ শিরোনামে ২০২২ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এতে ১৩০টি দেশের তিন দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে ওই দশকে গড় প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ওই সময় বেশ চাপে পড়ে গিয়েছিল বহুজাতীয় সংস্থাটি। ওই প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের তৎকালীন মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গড়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপিতে বাড়তি এ প্রবৃদ্ধি বাদ দিলে মূলত আকার দাঁড়ায় ৩২২ বিলিয়ন ডলারে। আসলে আমরা সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ছিলাম না।’

ড. জাহিদ হোসেন আরো বলেন, ‘আমার দেখা অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উন্নয়নের বয়ান তৈরির উদ্দেশ্যেই ওই সময় জিডিপির হিসাব ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল। উন্নয়নের কারণে মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে—এ ধরনের একটি তত্ত্ব সরকারের তরফ থেকে প্রচার করা হতো। ওই সময় জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখালেও মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এ কারণে প্রকৃত জিডিপির হিসাব বের করা এখন বেশ কঠিন।’

বণিক বার্তায় ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ‘জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জিত হতে পারে’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জিডিপির প্রকৃত পরিমাণ বের হলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোয়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ যদি ৩৫০ বিলিয়ন ডলার হয়, তাহলে দেশের জিডিপির বিপরীতে বিদেশী ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়াবে ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশে, যা বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর মোট ঋণের ক্ষেত্রে এ অনুপাত ৩৬ দশমিক ৩০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ দশমিক ৫৭ শতাংশে (২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে সরকারের দেশী-বিদেশী মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলার)। মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ আবার সরকারের হিসাব করা ২ হাজার ৬৭৫ ডলার থেকে কমে নেমে আসবে প্রায় ২ হাজার ৪০ ডলারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সমসাময়িক প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বিনিয়োগ, রফতানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশসহ বিভিন্ন সূচকেই পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতি যেভাবে প্রসারিত হওয়ার দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক হলে এসব সূচকে এতটা পিছিয়ে থাকার কথা না। এমনকি স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে আলোকছটা বিশ্লেষণেও দেশের অর্থনীতির আকার প্রসারিত হওয়ার আলামত পাওয়া যায়নি।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে অর্থনৈতিক উৎপাদনের তুলনা করে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপির আকার নিয়ে নতুন হিসাব প্রকাশ করে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস। ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক আউটলুক ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি ছিল ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকাশিত বাংলাদেশের জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাবে বাংলাদেশ কীভাবে ভারত, পাকিস্তান বা চীনের তুলনায় ৫০-৬০ শতাংশ বেশি উৎপাদন দেখাতে পারে? এ ধরনের অসামঞ্জস্য ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের জিডিপির হিসাব নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সরকারি হিসাবে ৩৬ শতাংশের কিছু বেশি দেখানো হয়। তবে জিডিপির আকার নতুন করে হিসাব হলে তা ৫৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে (৩০০ বিলিয়ন ধরলে)।

জিডিপির আকারের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও এফডিআই স্টক, কর-জিডিপি অনুপাত এবং বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাতে নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশ পিছিয়ে। বাংলাদেশের এফডিআই স্টক বর্তমানে ১৯ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং নাইজেরিয়ার ৭৫ বিলিয়ন ডলার। কর-জিডিপির অনুপাত বাংলাদেশে সবচেয়ে কম, ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। নাইজেরিয়ার কর-জিডিপির অনুপাত ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ, যেখানে নাইজেরিয়ায় তা ৩৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। কোনো দেশের জিডিপির আকার বাড়লে এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব সূচকেও উন্নতি হওয়ার কথা।

গত দেড় দশকে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধির অতিরঞ্জিত তথ্যের সুফল পেয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশী উৎস থেকে নেয়া হয়েছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ২০ কোটি টাকার ঋণ। বাকি ১ লাখ ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা নেয়া হয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য খাত থেকে এ ঋণ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার সে ঋণই এখন প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

দেশী-বিদেশী উৎস থেকে গত ডিসেম্বর শেষে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ছিল প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা ছিল ব্যাংকসহ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণ। বাকি ঋণ বিদেশী উৎস থেকে নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত ডিসেম্বর শেষে সরকারের বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।

সরকারের ঋণ নেয়া অব্যাহত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেও। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে বাকি ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে এরই মধ্যে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার। এর মধ্যে কেবল ব্যাংক খাত থেকেই ৫৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে, যেখানে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়েছিল মাত্র ৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। আর ব্যাংকসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নেয় ৩১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার ঋণ। সে হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে তা ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় ঠেকে। সে হিসাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ স্থিতি ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বেড়েছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যেখানে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র ৬ শতাংশ।

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনীতির যে ‘উন্নয়ন তকমা’ গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়েছে, তার ভিত্তি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের জানুয়ারির সর্বশেষ ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাতীয় আয় (ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস) বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুসারে, বাংলাদেশের জিডিপি গণনায় এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি। বিশেষ করে ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিল’ নিয়মিত হালনাগাদ না করায় উৎপাদনের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। জাতীয় আয়ের তথ্যে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষ করে তথ্যের সময়োপযোগিতা এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিলম্বের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার জিডিপি ২০২৫ সালে ছিল ৪৭০ বিলিয়ন ডলার। দেশটির জনসংখ্যা ৩ কোটি ৪২ লাখ। জিডিপির আকারে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ব্যবধান খুব বেশি না হলেও দুই দেশের বাস্তব চিত্র অনেক ভিন্ন। জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়ে মালয়েশিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও দেশটির অর্থনীতি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, পাম অয়েল এবং পেট্রোলিয়াম তাদের প্রধান রফতানি খাত। দেশটি বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের একটি বৈশ্বিক হাব হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া মালয়েশিয়ার মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ৪৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হিসেবে মালয়েশিয়ার অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক যে চিত্র দেখা যায় তার সঙ্গে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশের চিত্র বেশ বেমানান।