রাজধানীর নিউ ইস্কাটনস্থ বিয়াম (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) ফাউন্ডেশন ভবনে বিস্ফোরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার এক বছর পার হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে আটকে আছে তদন্ত। অথচ গত বছর প্রাথমিক তদন্ত শেষ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছিল, ওই বিস্ফোরণ ছিল পরিকল্পিত ঘটনার জের। অনুসন্ধানের পর পিবিআই গত বছরের ২৮ জুলাই এ তথ্য জানায়। পিবিআই’র উদঘাটিত তথ্যে বলা হয়, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ। মূল উদ্দেশ্য ছিল বিসিএস প্রশাসন কল্যাণ সমবায় সমিতির গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়া। ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। তাদের জবানবন্ধীতে ঘটনা যে পরিকল্পিত এর বিবরণ বেরিয়ে আসে। কিন্তু এরপরে তদন্ত আর এগোয়নি মোটেই, প্রাথমিক প্রতিবেদনের পর ইতিমধ্যে আট মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ধামাচাপা পড়ে আছে পুরো বিষয়টি। এদিকে ঘটনার শুরুতে বিসিএস প্রশাসন কল্যাণ সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা এর জন্য সরাসরি বসুন্ধরা গ্রুপকে দায়ী করলেও পরে তারা বোল পাল্টে ফেলেন। বলছেন, বসুন্ধরা গ্রুপ এটা করেনি। তবে কে করেছে, এর জবাবও তারা দিচ্ছেন না। শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অন্য কথা তুলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন সমিতির নেতারা।
বিয়ামে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ আছে। এর প্রমাণও পাওয়া গেছে প্রাথমিক তদন্তে। জড়িত ছিলেন বিয়াম ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তাসহ কয়েকজন। তারা আগুন ধরিয়ে বসুন্ধরার সঙ্গে করা কয়েকশ’ কোটি টাকার চুক্তির কাগজপত্র ও দলিল নিশ্চিহ্ন করে দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ‘পরিকল্পিত’ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে বিসিএস প্রশাসন কল্যাণ সমবায় সমিতির নেতাদের গোপন সমঝোতা হয়। সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে বসুন্ধরা গ্রুপকে ছাড় দিচ্ছেন সমিতির নেতারা। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বসন্ধুরাকে দায়ী করলেও এখন আর তারা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি নন।
উল্লেখ্য, বসুন্ধরা গ্রুপের একের পর এক চুক্তিভঙ্গের কারণে সমিতির সদস্য, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অনেক আগে অর্থ পরিশোধের পরও প্লট পাননি। দীর্ঘকাল ধরে প্লটের জন্য ঘুরেছেন তারা। এখন পর্যন্ত একটি প্লটও সরেজমিনে বুঝিয়ে দিতে পারেনি কল্যাণ সমিতি। জমি ক্রয় এবং মাটি ভরাট বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে পর পর ৫টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রত্যেকটি চুক্তিই লঙ্ঘন করে এই প্রভাবশালী আওয়ামী ব্যবসায়ী গ্রুপটি। ৫ আগস্ট, ২০২৪ আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বসুন্ধরা গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরা বেকায়দায় পড়ে যান। সমিতির কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন, কিন্তু সমিতির জমি ও প্লট বুঝিয়ে দেননি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চুক্তি বাস্তবায়নের চাপে পড়েন তারা। তখনো সমিতির জমি বুঝিয়ে দেয়া বাকি ছিল ৫৬ বিঘা। এছাড়া সমিতির সঙ্গে সম্পদিত চুক্তি ও কার্যক্রমে নানা রকমের অসঙ্গতি রয়ে গিয়েছিল। আর সেই কারণেই বসুন্ধরা গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় শুরুতে এবক্তব্য ছিল সমিতির নেতাদের। বিসিএস প্রশাসন কল্যাণ সমিতির নেতাদের আগের বক্তব্য এবং লিখিত এজহারেও এ তথ্য উঠে এসেছে। কিন্তু সমিতির নেতারা সেই অবস্থান থেকে পরে সরে এসেছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর ইস্কাটনের বিয়াম ভবনে বড় আকারের এক বিস্ফোরণ হয়। এতে ভবনের দুজন নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে এটিকে এসির বিস্ফোরণ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি পুরো ঘটনাটাই চাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। গণমাধ্যমে যাতে খবরটা ফলাও করে প্রচার করা না হয় এ ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছিল প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে। ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় থানা-পুলিশকেও ম্যানেজ করা হয়েছিল।
২৭ ফেব্রুয়ারি রাত প্রায় আড়াইটায় হঠাৎ করেই ভবনটির পঞ্চম তলায় বিস্ফোরণ হয় এবং এ থেকে অগ্নিকাণ্ডও হয়। ভবনের ৫ম তলার ওই ফ্লোরটিতে ছিল বিসিএস প্রশাসন কল্যাণ সমিতির অফিস। বিস্ফোরণ এবং আগুনের লেলিহানে ফ্লোরটির প্রায় সবগুলো কক্ষই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরমধ্যে কয়েকটি কক্ষ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। কল্যাণ সমিতি অফিসের কাগজপত্রসহ, দলিলপত্র, ব্যাংকের কাগজপত্র, চুক্তিপত্র, আসবাবপত্র সবই পুড়ে যায়। ভবনের ওই ফ্লোরে থাকা দু’জন কর্মচারীর একজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা যান। অন্য একজন দগ্ধ অবস্থায় পরবর্তীতে হাসাপাতালে মারা যান। রহস্যজনকভাবে শুরু থেকেই ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ এত বড় ঘটনাকে ‘এসির বিস্ফোরণ’ এবং একটি সাধারণ ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। যদিও এতে নাশকতার যথেষ্ট আলামত এমনকি প্রমাণাদিও ছিল। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজেই এর বড় প্রমাণ রয়ে গিয়েছিল। তারপরও এটিকে ‘সাধারণ দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে এ ব্যাপারে অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৭ মার্চ, ২০২৫। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “বিয়াম ভবনে বিস্ফোরণ পরিকল্পিত নাশকতা, অভিযোগের তীর বসুন্ধরা গ্রুপের দিকে! মাস্ক-গ্লাভস পরা যুবক এখনো গ্রেফতার হয়নি”।
পরে ২৮ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুর রহমান যে তথ্য তুলে ধরেন তাতে বলা হয়, “ঘটনার পেছনে ছিলেন বিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসএম জাহিদুল ইসলাম। তিনি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভবনের একটি কক্ষে আগুন ধরিয়ে নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। এ কাজে তিনি ভাড়া করেন তার পূর্ব পরিচিত আশরাফুল ইসলামকে। দুজনের মধ্যে নথিপত্র ধ্বংসে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আশরাফুল সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেন এবং অফিস সহায়ক আব্দুল মালেক ও গাড়িচালক ফারুক ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন লাগার পরপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনাস্থলেই মারা যান অফিস সহায়ক মালেক। আহত গাড়িচালক ফারুককে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই তিনি মারা যান।”
এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সমিতির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জাহিদুল ইসলামের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বিয়াম এবং সমিতি আলাদা প্রতিষ্ঠান। তাহলে কেন তিনি ১০-১২ লাখ টাকা ব্যয় করে নথি পোড়ানোর পরিকল্পনা করলেন, এ প্রশ্নের জবাব এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পিবিআই কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। অদৃশ্য ইশারায় তাদের তদন্তও আর এগোয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, জাহিদুল ইসলামকে ভাড়া করে অন্য কেউ। এ ব্যাপারে একমাত্র নাম আসছে বসুন্ধরা গ্রুপের। সমবায় সমিতির নেতাদের বক্তব্যেও তা উঠে আসে। এ ঘটনায় ২৮ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল থানায় জিডি এন্ট্রি করেন বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক, সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মসিউর রহমান। এরপরে ৪ মার্চ তিনি থানায় এজহারও দায়ের করেন। পরিকল্পিত নাশকতার কথা উল্লেখ করে তিনি এজহারে। পরিকল্পিত নাশকতার জন্য তিনি নাম উল্লেখ না করে বসুন্ধরা গ্রুপকেই সরাসরি দায়ী করেন। দায়েরকৃত এজহারে তিনি ‘একটি ডেভেলপার কোম্পানির’ সঙ্গে তাদের সম্পাদিত চুক্তিসমূহ বাস্তবায়ন না হওয়াসহ বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করেছেন। সমিতির সভাপতি, সাবেক সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারও এ বিষয়ে দেয়া এক লিখিত বিবৃতিতে একই অভিযোগ করেছেন। কিন্তু পরে সমিতির নেতারা আর সেই অবস্থানে থাকেননি। এর পেছনে কী রহস্য সেটা বের হওয়া প্রয়োজন।
শীর্ষনিউজ