Image description

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হয় শহীদ জিয়া শিশুপার্কের সংস্কার কাজ। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। তবে ৭৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা হলেও গত ৮ বছরেও শেষ হয়নি সংস্কার কাজ। নির্মাণসামগ্রী ও খুঁড়ে রাখা মাটি-বালুতে বছরের পর বছর ধরে বন্ধ রাজধানীর একমাত্র সরকারি 
এই শিশু পার্কটি এখন জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। পার্কের ভেতরে দেদারছে চলছে মাদকসেবীদের জমজমাট আড্ডা। সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে রাজধানীর শাহবাগের ১৫ একর জমির ওপর নির্মিত হয় ঢাকা শিশু পার্ক। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছে এই পার্ক হস্তান্তর করা হয়। এরপর সাদেক হোসেন খোকা যখন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হন, তখন পার্কটির নামকরণ করেন ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। তবে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হওয়ার পর পার্কটির নাম বদলে ফেলেন। দুই বছরের মেয়াদকাল নিয়ে ’১৮ সালে শুরু হয় এর সংস্কার কাজ।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় গণপূর্ত অধিদপ্তর। তারা আবার দক্ষিণ সিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। প্রথমে পার্ক সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ-তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ৭৮ কোটি টাকা দিতে চায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে তারা শর্ত জুড়ে দেয়- পার্কের নিচে স্বাধীনতাস্তম্ভে আসা দর্শনার্থীদের জন্য শিশু পার্কের নিচ দিয়ে ভূগর্ভস্থ যানবাহন পার্কিং করতে হবে। কিন্তু এত ‘অল্প টাকায়’ আধুনিকায়নের কাজটি করা যাবে না উল্লেখ করে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এরপর প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ২৬৫ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পটি সংশোধন করে ৩৯৭ কোটি টাকা করা হয়। সঙ্গে মেয়াদও বাড়ানো হয়। ২০২০ সালের মে মাসে শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়রের দায়িত্ব নেন। কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওই প্রস্তাবের বিষয়টি তার নজরে এলে তিনি ঠিক করেন, শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজটি সিটি করপোরেশন নিজেরাই করবে। পরে তার উদ্যোগে শিশু পার্কের ব্যয় বেড়ে এক ধাক্কায় ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রকল্পটি ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনও করিয়ে নেন তাপস। প্রকল্প পাসের সময় ঠিক হয়, ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার মধ্যে ৪৮৩ কোটি টাকা দেবে সরকার।

সরকারের দেয়া টাকার অর্ধেক হবে অনুদান, বাকিটা ঋণ হিসেবে দেয়া হবে। আর দক্ষিণ সিটির নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হবে ১২০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বেশির ভাগ ব্যয় ৪৪১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল শিশু পার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনের জন্য। একসঙ্গে ৩০ জন চড়তে পারে এমন ‘মাইন কোস্টার’ কেনা ও স্থাপন করার জন্য ধরা হয় ৯৭ কোটি টাকা। যদিও বিভিন্ন কোম্পানি বলছে- এই মাইন ট্রেনের দাম সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকার বেশি না। অন্যদিকে ৩৬ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘১২ডি থিয়েটার’ এর দাম ধরা হয় ৮১ কোটি টাকা। অন্য রাইডগুলোর মধ্যে ‘ডিসকো মেগার’ দাম ধরা হয় ২৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ ছাড়া ‘সুপার এয়ার রেসের’ দর ধরা হয় ৪৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় একটি এসইউভি বা স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল (জিপ গাড়ি) ও একটি পিকআপ কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, শহীদ জিয়া শিশু পার্কের পুরো এলাকা সবুজ টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। জরাজীর্ণ গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় বামপাশে একটি চায়ের টং দোকান। সামনের খালি জায়গাটুকু মোটরসাইকেলের পার্কিংয়ে রূপ নিয়েছে। আর বড় বড় দু’টি বিশাল সাইনবোর্ডে সংস্কার প্রকল্পের ছবি দিয়ে লেখা রয়েছে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক মডার্নাইজেশন’। বাস্তবায়নে: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, প্রকৌশল বিভাগ (যান্ত্রিক)। সাইনবোর্ড এড়িয়ে সামনে এগুতেই হাতের ডানে-বামে নতুন ভবন তৈরির জন্য কাঠামো দাঁড় করানো রয়েছে। পাশেই মাটি খুঁড়ে স্তূপ করা হয়েছে। সামনে স্যুয়ারেজ লাইনের জন্য রড বিছিয়ে ঢালাইয়ের কাজ চলছে। ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিংয়ের কাজ সম্পন্ন হলেও উপরের পুরো এলাকা জুড়ে খাঁ খাঁ করছে। শিশুদের খেলনা-রাইডতো দূরের কথা একটা স্থাপনা পর্যন্ত নেই সেখানে। খোলা জায়গার মাঝের দুইপাশে লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দু’টি রাইড ছাউনি। আর ভূগর্ভস্থ কার পার্কিংয়ের ছাদের ওপর তৈরি করা হয়েছে পানির ফোয়ারা। এ ছাড়া পুরো পার্ক এলাকা খুঁড়ে রাখা রয়েছে। একটা রাইডও সেখানে নেই। কিছুদিন আগেও পুরনো একটি রাইড জঞ্জালে ভরা অবস্থায় থাকলেও সেটাকেও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে এই প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত থাকাকালেই দেখা যায় একদল যুবক বসে মাদক সেবন করছে। পার্কের গেটে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি করা এক দোকানি বলেন, বছরের পর বছর ধরেই তো এটা চলছে। কবে শেষ হবে তা কেউ বলতে পারে না। তিনি বলেন, মাঝে কিছু দিন পুরো কাজই বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই তো দেখছি কাজ করতে লোক আসে। কিন্তু একটু ধীর গতিতে চলছে।

এ সব বিষয়ে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের সংস্কার কাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যান্ত্রিক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে আমাদের সার্বিক প্রকল্পের কাজ ৩৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। পার্কের নিচে গর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে প্রকল্প নিয়েছিল, তাও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বাজারদর যথাযথ মূল্যায়ন করেই এই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর প্রকল্পের মালামালের দাম নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। পরে পুনর্মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে ডিএসসিসি। সেই কমিটিও সব কিছু যাচাই করেছে। দামে কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে শিশু পার্কের রাইডগুলো কেনার প্রস্তুতি চলছে। আশা করি আগামী বছরের মধ্যেই সব শেষ করে পার্কটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে পারবো।