Image description
 

 

 
আমার অ্যাক্টিভিজমের একমাত্র বিষয় সংস্কার। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সংস্কারটা হয়ে গেলে চুপচাপ চাকরি করব। কারণ, সংস্কার হলে আর প্রতিবাদ সমালোচনা করতে হবে না। ক্ষমতার ভারসাম্যের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। নিজের খেয়ে প্রতিবাদ-সমালোচনার মত বিনা মজুরিতে বনের মোষ তাড়ানো বন্ধ হবে।
 
কিন্তু আজ যা হল, তাতে পথ দুটি। হয় হতাশা হয়ে চুপ হয়ে যেতে হবে। কিংবা আরও বেশি লেখালেখি করে, এই সরকারেরও বিরাগভাজন হতে হবে।
সরকার যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করতে যাচ্ছে, এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ, দুদক শক্তিশালীকরণ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সরকারি তথ্য আরও বেশি প্রকাশে তথ্য অধিকারের মত বিষয় ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ।
 
গত জানুয়ারিতে এটা যখন জারি হয়, খুবই উচ্ছ্বাসিত হয়ে ছিলাম। কারণ, এই অধ্যাদেশে মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের সরকার বা সরকারপ্রধান নিজের ক্ষমতা কমিয়েছিল।
গণতন্ত্র চাইলে, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ সবচেয়ে জরুরি। এ জন্য দরকার নিরপেক্ষ বিচারপতি। অধ্যাদেশটি ছিল, এ পথের যাত্রায় প্রথম পদক্ষেপ।
সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। প্রধান বিচারপতির পরামর্শে নয়। পরামর্শ করে নিয়োগ দেবেন। মানে পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়।
 
৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। বাকি সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করেন। ফলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই হয়।
 
এ জন্যই শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, খিজির খায়াত, কে কামরুলসহ আরও অনেক দলান্ধ বিচারপতি কপালে জুটেছিল। এর ফল কী হয়েছিল, তা সবার জানা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্টের দুইজন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রধান বিচারপতির মনোনীত সাবেক একজন বিচারপতি এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত আইনের একজন অধ্যাপককে নিয়ে গঠিত ৭ সদস্যের কাউন্সিল সিভি বাছাই করে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে বিচারপতি পদে নিয়োগে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করবে।
এরপর কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়োগের জন্য নাম পাঠাবে। এই প্রস্তাব প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে। রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলের বাছাই করা ব্যক্তিকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেবেন। কিংবা আপত্তি জানিয়ে কাউন্সিলে ফেরত পাঠাবেন। কাউন্সিল দ্বিতীয় বাছাইয়েও একই নাম পাঠালে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন ১৫ দিনের মধ্যে।
 
খুবই প্রগ্রেসিভ ব্যবস্থা ছিল এটি। এতে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের চিরকুটে কোনো বটতলার উকিলের বিচারপতি হওয়ার পথ বন্ধ হয়েছিল। গত মার্চে এ পদ্ধতিতে নিয়োগও হয়েছে। পারফেক্ট ছিল না, নানা সমালোচনা আছে। কিন্তু অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো নিয়োগ হয়েছে। এই প্র্যাকটিসটা থাকলে, ১০-১৫ বছর পর আসলেই আসল স্বাধীন বিচার বিভাগ পাওয়া যেতো।
জুলাই সনদে এই কাউন্সিলকে সাংবিধানিক কমিশনে রুপান্তরের প্রস্তাব ছিল। বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে, আইন করার কথা বলেছিল। গণভোটে হ্যাঁ জিতলেও, এই প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট কার্যকরের বিধান রয়েছে। সুতরাং বিএনপি সাংবিধানিক কমিশন না করার এখতিয়ার রাখে।
 
কিন্তু যে কারণ দেখিয়ে, অধ্যাদেশটি বাতিল করা হলো তা সবচেয়ে হৃদয় বিদারক। বলা হচ্ছে, এই অধ্যাদেশে গঠিত কাউন্সিলের ফলে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে।
বিএনপির ৩১ দফায় নবম দফায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৫(গ) অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড সম্বলিত ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন করা হবে।
তবে আজকের পরে মনে হচ্ছে, যে আইন হবে, তাতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা আগের মত প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকবে। ফলে দলীয় আনুগত্যের বাইরে কেউ নিয়োগ পাবে, এটা ভাবার কারণ নেই। দলীয় অনুগত বিচারপতির ফল কী তা তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই।
 
সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশও বাতিল করা হচ্ছে। অথচ জুলাই সনদের ৫২ দফায়, বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের প্রস্তাবে কোনো আপত্তি ছাড়া একমত হয়েছে। অথচ আজ অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়েছে! আবার বলছে, জুলাই সনদে যেখানে নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেগুলো দাঁড়িকমা, সেমিকোলনসহ বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির ৩১ দফায় বলা হয়েছে, "অধঃস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যাস্ত হবে (সংবিধানের ভাষা)। বিচারবিভাগের জন্য সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক সচিবালয় থাকবে।"
বিএনপি তিন বছর ধরে প্রচার করে আসা ৩১ দফা থেকে সরে এসে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি বাতিল করেছে। আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে "অধঃস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যাস্ত হবে"।
 
আর এখন অধ্যাদেশ বাতিলের যুক্তি হিসেবে মন্ত্রণালয় বলছে, "অধ্যাদেশ-অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিম্নআদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রনের অধিকারী হবেন। সরকারের সাথে কাজের কোনো সমন্বয় থাকবে না। একজন ব্যক্তির একক নিয়ন্ত্রন বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে"।
 
নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় বিরোধীদলে থাকাকালে সবচেয়ে নির্যাতিত হয়েছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীদের জামিন হতো না। অন্যায় রিমান্ড হতো। আইনমন্ত্রীর ফোনে ঠিক হত, কে জামিন পাবে আর কে রিমান্ডে যাবে। বিএনপি নেতাকর্মীদের জামিনের জন্য, রিমান্ড ঠেকাতে হাইকোর্টে আসতে হতো।
এখন ক্ষমতায় এসে বিএনপি মনে করছে, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের কাছেই থাকা উচিত। বলছে, 'সরকার উপযুক্ত মনে করিলে, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, ধারা ৭ এর বিধানাবলি (নিয়ন্ত্রণ) সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকর করিবে।'
 
এগুলো শুধু হতাশাজনক নয়, হৃদয় বিদারক।
বিএনপি নেতা কর্মীরা সবচেয়ে গুমের শিকার। তারপরও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ পাস করা হলো না। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, 'জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আটককে গুম বলা যাবে না'। এবং 'সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া সরকারি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের তদন্ত করা যাবে না'।
 
ঠিক এই আলাপ তো আওয়ামী লীগ করত। গুম করে জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিত। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ পাস না করাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়েছে, 'গুম একটি সংবেদনশীল অপরাধ। এর সঙ্গে সরকারের শৃঙ্খলা-বাহিনী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত'।
 
হায় আল্লাহ! অথচ আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজে গুমের শিকার, ভয়াবহ নিপীড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রলণালয় থেকে এ কী মতামত এলো!
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে কমিশনকে স্বপ্রণোদিত হয়ে গুম, সরকারি বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগ সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে সার্চ কমিটির বিধান করা হয়। সরকার চাইলেই যাতে সরিয়ে দিতে না পারে, সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদ্ধতিতে অপসারণের বিধান করা হয়েছিল। এটাও পাস করা হচ্ছে না!
 
যুক্তিটা এত লেইম! বলা হয়েছে, "মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। মানবাধিকার কমিশনকে গুমের মতো সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের শৃঙ্খলা-বাহিনী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিমীর দায় সম্পৃক্ত।"
 
মানবাধিকার কমিশন যদি মন্ত্রণালয়েরই অধীন হয়, তাহলে এটা রাখার দরকার কী? কমিশনকে তো স্বাধীনই থাকতে হবে। দুদকও তো কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন না। তাহলে এটাও বাদ দিয়ে দেন।
ভালো কথা, দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি, চেয়ারম্যান-কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের অধ্যাদেশও বাতিল হচ্ছে। কারণ, আট সদস্যের সার্চ কমিটিতে সরকারির প্রতিনিধি নাকি মাত্র চারজন। আরও সরকারি প্রতিনিধি লাগবে! কিন্তু কোনো? সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মতই কমিশনার নিয়োগ দিতে?
 
সরকার চালাক আছে। যেসব অধ্যাদেশ পাস করালে ক্ষমতা বাড়বে, সেগুলো পাস করছে। যেমন অভ্যুত্থানের পর, আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত নির্বাচনের জনপ্রতিনিধি, বিতর্কিত নিয়োগের ওয়াসাগুলো এমডি অপসারণে যে অধ্যাদেশগুলো করা হয়েছিল, সেগুলো আইনে পরিণত করা হচ্ছে। যাতে সরকার যেকোনো সময়ে কারণ দেখানো ছাড়া যে কাউকে অপসারণ করতে হবে।
এতে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা নির্বাচন জাস্ট তামাশায় পরিণত হবে। কলমের এক খোঁচায় যে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করে প্রশাসক বসানো হবে। অথচ বিএনপি ৩১ দফা এবং ইশতেহারে ওয়াদা করেছিল, মৃত্যু ও আদালতের রায়ে পদ শূন্য না হলে কখনই প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হবে না।
 
ইউনূস সরকারের সময়ে বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির আন্দোলন দমনে সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, কর্মচারীরা সরকারের প্রতি আনুগত্য না দেখালে, আন্দোলন করলে ২৮ দিনের মধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। তখন বিএনপি এই অধ্যাদেশের সমালোচনা করেছিল। বিএনপিপন্থি সাবেক আমলারা আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বলেছিলেন, এই অধ্যাদেশ ফ্যাসিবাদের আমলের আইনের চেয়ে খারাপ।
কিন্তু কী পরিহাস! বিএনপি এই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করছে! এখন সরকারের যদি মনে হয়, কর্মচারীদের কেউ আনুগত্য প্রকাশ করছে না, তাহলেই চাকরি খাওয়া যাবে।