Image description

Sabina Ahmed ( সাবিনা আহমেদ)

 
 
সংসদের স্পিকার যতই বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলতে বাধা দান করুন না কেন, বিরোধী দলের সকল এমপিদের উচিত সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিদিন সংসদে হাজির হওয়া। তাদের উচিত যুক্তি-তর্ক, তথ্য-প্রমাণ, সাংবিধানিক ধারা এবং জুলাই চার্টারের সুনির্দিষ্ট অংশগুলো লিখে নিয়ে যাওয়া। স্পিকার যদি “মুখস্থ বলুন” বলেন, তাতে বিচলিত হওয়ার দরকার নেই — লিখিত নোট থেকে ধীরে, দৃঢ়ভাবে এবং যুক্তি দিয়ে বলে যান। কারণ সংসদের রেকর্ডে আপনার কথা থাকবে, জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছাবে।
 
এই মুহূর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জুলাই চার্টার নিয়ে সবচেয়ে বেশি বাধা দিচ্ছেন এবং চার্টারের মূল পরিবর্তনগুলোকে কার্যত নাল অ্যান্ড ভয়েড করে দিতে চাইছেন। তাই বিরোধী দলের উচিত একজন যোগ্য, লজিক্যাল ও সাংবিধানিক জ্ঞানসম্পন্ন এমপিকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া — যিনি সালাহউদ্দিন আহমেদসহ পুরো ট্রেজারি বেঞ্চকে তীব্র যুক্তিতে মোকাবিলা করবেন।
 
এই দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও দিকনির্দেশনা:
১) সাংবিধানিক জ্ঞান: ১৯৭২ সংবিধানের মূল চেতনা, ধারা ৭(২), ২৬, ৪৮, ১১৯, ১৪২ (সংশোধন প্রক্রিয়া) পুরোপুরি আয়ত্ত করুন।
 
২) জুলাই চার্টার: চার্টারের ৮৪ দফা, রেফারেন্ডামের ফলাফল এবং এর আইনি-রাজনৈতিক ভিত্তি মুখস্থ রাখুন। জনাব সালাহউদ্দিন “অসাংবিধানিক” বললে জবাব দিন — “জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেটাই সংবিধানের সর্বোচ্চ উৎস (ধারা ৭)।” ওনারা যেভাবেই বলুক, আপনার বারবার এই কথা মনে করিয়ে দিন।
 
৩) প্রতিদিনের প্রস্তুতি: আগের দিন রাতে টিম মিটিং করে সালাহউদ্দিনের সম্ভাব্য বক্তব্যের কাউন্টার পয়েন্ট তৈরি করুন। প্রশ্নোত্তর, সংশোধনী প্রস্তাব ও পয়েন্ট অব অর্ডার ব্যবহার করুন।
 
৪) বক্তব্যের ধরন: যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, আবেগ ছাড়াই কথা বলুন। প্রতিটি বক্তব্য শেষে স্পষ্ট করে বলুন — “আমরা সংসদ ছেড়ে যাইনি এবং যাব না, জুলাইয়ের চেতনা রক্ষা করতে আমরা ভিতরে থেকেই লড়াই চালিয়ে যাব।”
আবারও বলছি বিরোধী দল হিসেবে তাদের উচিত সংসদের ভিতর থেকেই লড়াই করা। সংসদকে একটা “যুদ্ধক্ষেত্র” বানানো — তবে সেটা হবে তীব্র বিতর্ক, যুক্তি-প্রমাণ, প্রশ্নোত্তর, সংশোধনী প্রস্তাব এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে। যেসব সিদ্ধান্ত বা বিলকে তারা অবৈধ, অগণতান্ত্রিক বা জুলাইয়ের চেতনাবিরোধী মনে করেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিটি অধিবেশনে দাঁড়িয়ে কথা বলা, জনগণের সামনে ইস্যু তুলে ধরা এবং তাদের কথা সংসদীয় রেকর্ডে রাখাই সঠিক ও কার্যকর পথ।
 
ওয়াকআউট বা বয়কট করে সংসদ ছেড়ে চলে যাওয়া মানে নিজেদের কণ্ঠস্বরকে স্বেচ্ছায় দুর্বল করে দেওয়া। ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, এই পথটি বিরোধী দলের জন্য ক্ষতিকর এবং গণতন্ত্রের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন দীর্ঘ সময় সংসদ বর্জন করেছিল, তখন সরকার প্রায় বিনা বাধায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। বিরোধীদের অনুপস্থিতিতে সংসদ কার্যত একপক্ষীয় হয়ে পড়ে, যা শেখ হাসিনাকে আরও শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।
 
এই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। বর্তমানে বিএনপি ২/৩ মেজরিটি নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এমনকি সুপারমেজরিটি থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দলের তীব্র বিতর্ক, প্রশ্ন এবং সংশোধনী প্রস্তাব ছাড়া সরকার যেকোনো আইন বা সাংবিধানিক সংশোধনী বিনা চ্যালেঞ্জে পাস করে ফেলতে পারে। বিরোধী দল সংসদে না থাকলে সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর কোনো স্বাধীন যাচাই হয় না, জনগণের কাছে স্বচ্ছতা থাকে না এবং গণতন্ত্র কার্যত একদলীয় হয়ে যায়। বিরোধীদের উপস্থিতি সংসদকে শুধু রুলিং পার্টির রাবার স্ট্যাম্প না বানিয়ে সত্যিকারের আলোচনা ও চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্সের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। এটাই গণতন্ত্রের মূল স্বাস্থ্যের লক্ষণ। এবার বিএনপি কথা শুনুক আর নয় শুনুক, আপনারা এমন যুক্তি তর্কের মাঝ দিয়ে যেয়ে আরও ম্যাচিওর সাংসদে পরিণত হবেন, যা পরবর্তী সংসদে ভালো মতন কাজে আসবে।
 
জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল স্পিরিট ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং সংসদকে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। সংসদ ছেড়ে বাইরে আন্দোলন করলে জনগণের কাছে বার্তা যায় যে, বিরোধীরা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় নিজেদের আস্থা রাখতে পারছেন না। অথচ সত্যিকারের গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা হলো ভিতরে থেকে চাপ তৈরি করা, যাতে সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়।
জামাত বা এনসিপি যদি সত্যিকারের শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত প্রতিদিন সংসদে উপস্থিত থেকে লড়াই করা। প্রতিটি অবৈধ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, জনমত তৈরি করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা — এটাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ও সম্মানজনক পথ।
 
সংসদ ছাড়া সহজ, কিন্তু ভিতরে থেকে ধারাবাহিক লড়াই করা কঠিন এবং সাহসের। গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে বিরোধীদের এই কঠিন পথটাই বেছে নেওয়া উচিত। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে শুরু করার সময় এখনই।
 
জুলাইয়ের চেতনা রক্ষা করতে হলে সংসদের ভিতরেই থাকুন, প্রস্তুত হোন এবং লড়ুন। জনগণ দেখছে।