মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস—সব মিলিয়ে দেশের রফতানিমুখী শিল্প এখন বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে।
রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি দামের অস্থিরতা, শিপিং রুটের ঝুঁকি এবং ক্রেতা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন রফতানি খাতে নতুন অর্ডার কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগের অর্ডারও স্থগিত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাতের প্রভাব মূলত তিনটি পথে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবেশ করছে— জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া। এর ফলে রফতানি প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে তৈরি পোশাক খাতে পড়তে শুরু করেছে। অনেক বিদেশি ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনও অর্ডার বাতিল হওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্রেতা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষা করছেন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয়—তা দেখেই তারা সিদ্ধান্ত নিতে চান। কারণ শেষ পর্যন্ত এসব পণ্য তাদের নিজ নিজ বাজারে বিক্রি করতে হবে, আর যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তায় বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, দেশে এখনও জ্বালানির দাম না বাড়লেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পণ্য উৎপাদনের খরচ আরও বাড়তে পারে।
রফতানি আদেশ কমছে
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ট্রানজিট ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের রফতানির বড় অংশ নির্ভরশীল। বিশেষ করে দুবাই, দোহা ও আবুধাবি হয়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবাহিত হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব রুটে ফ্লাইট কমে যাওয়ায় এয়ার কার্গো পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসূর বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংকটের কারণে শাকসবজি ও ফল রফতানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি গন্তব্যে সীমিত পরিসরে কিছু ফ্লাইট থাকলেও মোট রফতানি কার্যক্রম প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।
তার ভাষায়, আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য বিদেশে যেত, এখন সেখানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পণ্য সীমিত আকারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাইট না থাকায় পণ্য পাঠানোই সম্ভব হচ্ছে না।
প্রায় বন্ধ কৃষিপণ্য রফতানি
কৃষিপণ্য রফতানিকারকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলো অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশের কার্গো গ্রহণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে ইউরোপগামী পণ্য পরিবহন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শাকসবজি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান লী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবুল হোসাইন বলেন, যুদ্ধের কারণে কার্যত আমাদের রফতানি ব্যবসায় ধস নেমেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কন্টেইনার পণ্য রফতানি হতো, এখন পুরো সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৫ কন্টেইনার পণ্য পাঠানো যাচ্ছে।
তিনি জানান, এয়ার ফ্রেইট ব্যয়ও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। আগে যেখানে প্রতিকেজি পণ্য পরিবহনে খরচ ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, এখন তা বেড়ে প্রায় ৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইউরোপে যেতে অনেক বিমানকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
চাপ বাড়ছে শিল্প খাতে
চামড়া শিল্পেও যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, নতুন রফতানি আদেশ প্রায় আসছে না। আগের অর্ডারগুলোর অনেকগুলোই ধীরগতিতে চলছে বা স্থগিত রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি করা কেমিক্যালের দাম বেড়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহকারীরা বুকিংও নিচ্ছে না, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্ডার কমে যাওয়ায় শিল্প খাতে দ্বৈত চাপ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা মূলত সময় ও খরচের ওপর নির্ভরশীল। পরিবহন সময় বা লিড টাইম বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজেই বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে যেতে পারেন।
বাড়ছে শিপিং ব্যয় ও লিড টাইম
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করছে। ফলে শিপিং খরচ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময়ও ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
এতে দ্রুত সরবরাহ নির্ভর শিল্পগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে ক্রেতারা অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নেতিবাচক ধারায় রফতানি
নেতিবাচক ধারা থেকে বেরোতে পারছে না দেশের পণ্য রফতানি। গত ফেব্রুয়ারিতে টানা সপ্তম মাসের মতো রফতানি কমেছে। ওই মাসে দেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৩৫০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কম।
টানা সাত মাস রফতানি কমার প্রভাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের সামগ্রিক পণ্য রফতানিতেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ সময়ে মোট রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১৯১ কোটি ডলারের পণ্য, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার সমান। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ রফতানি ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কম।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত মাসে প্রধান রফতানি খাতগুলোর বেশিরভাগেই নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াবিহীন জুতা রফতানি কমেছে।
বাণিজ্য ঘাটতির চাপ বাড়ছে
রফতানি আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকায় দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির চাপও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।
এই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে, অপরদিকে রফতানি আয় কমে হয়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি খাতের একটি বড় দুর্বলতা হলো—সীমিত পণ্য বৈচিত্র্য এবং নির্দিষ্ট শিপিং রুটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ফলে বৈশ্বিক কোনও সংঘাত বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই বাংলাদেশের মতো রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প বাজার, বিকল্প শিপিং রুট এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।