কোভিড-১৯ মহামারির সময় জরুরি সরঞ্জাম কেনার নামে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্পের ক্রয়ের নামে প্রায় ১২ কোটি ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা লুটপাটের তথ্য উদ্ঘাটন করেছে সংস্থাটির অনুসন্ধান দল। এই দুর্নীতির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ৩৮ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জনকে ব্যক্তি হিসেবে আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ভুয়া বিল তৈরি, অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ এবং কাজ না করেই অর্থ উত্তোলনের মতো সুনির্দিষ্ট অনিয়ম।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা (উপপরিচালক) মো. আকতারুল ইসলাম জানান, অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল হয়েছে। যেহেতু বর্তমানে কমিশন নেই, তাই মামলা বা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য নতুন কমিশনের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এর বাইরে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে কেএন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ক্রয়ের নামে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৫০ টাকা আত্মসাতের। এই মামলায় আটজনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন: সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার, জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক কাজী শামীমুজ্জামান অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী দ্বিতীয় মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে হাসপাতালের ইলেকট্রিক বেড ক্রয়ের প্যাকেজে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আত্মসাতের। এই মামলায় ছয়জনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন- প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার, ইনশা ট্রেড করপোরেশনের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী তৃতীয় মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে কেএন-৯৫ মাস্ক ক্রয়ের প্যাকেজে ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা আত্মসাতের। মামলায় মোট আটজনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার এবং এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের মালিক মো. সাইফুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল তৈরি, কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন এবং সরবরাহ সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলার তথ্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
অন্য দিকে চতুর্থ মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ এবং সচেতনতামূলক টিভিসি প্রচার না করেই ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭০ টাকা আত্মসাতের। এই মামলায় দুদকের অনুসন্ধান টিম চারজনকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা এবং ই-মিউজিকের প্রধান নির্বাহী মো. হোসনী ইয়ামিন।
প্রতিবেদনে পঞ্চম মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে মেডিকেল ও সার্জিক্যাল পণ্য ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৫ টাকা আত্মসাতের। এই মামলায় আসামি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার এবং সিম করপোরেশনের ম্যানেজিং পার্টনার মো. মোস্তফা মনোয়ার।
ষষ্ঠ মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে করোনা বিষয়ক মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব-অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাতের। এই মামলায় আসামি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে ডা. ইকবাল কবীর, ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সিম করপোরেশনের ম্যানেজিং পার্টনার মো. মোস্তফা মনোয়ার এবং ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের মালিক রইসুল কবীর।