ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১২ দিনে হাসপাতালে ১০৬ জন রোগী ভর্তি হয় হাম আক্রান্ত হয়ে। এর মধ্যে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্ত রোগী। আশপাশের জেলাগুলো থেকেও শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে এ হাসপাতালে। ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় পরিস্থিতি সামলাতে গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম, করা হয়েছে পৃথক কর্নার। হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ তলার ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তিন ইউনিটের তিনটি কক্ষে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষগুলো ‘হাম কর্নার’ নামে মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে শিশুদের। তবে কক্ষগুলোতেও সংকুলান হচ্ছে না রোগী। যে কারণে রোগীরা মেঝেতে এবং বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সরজমিন হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬১১ নম্বর কক্ষে কথা হয় ২৫ মাস বয়সী হাম আক্রান্ত আয়াতের মা ঝর্ণা আক্তার কনার সঙ্গে। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চুকাইতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, প্রথমে জ্বর, কাশি, চোখ লেড়ানো, নাক দিয়ে পানি পড়া, শরীর গুটি গুটি লালচে দাগ, মুখের ভেতরে সাদা দাগ দেখা দেয়। এমন অবস্থা দেখা দিলে তিনদিন বাইরের ফার্মেসি থেকে ঠান্ডা-জ্বরের ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। কিন্ত কোনো উন্নতি না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালে ভর্তি করি। বর্তমানে শিশুর অবস্থা আগের চাইতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। একই কক্ষে নিজের ৯ মাস বয়সী হাম আক্রান্ত আবু জাফরকে নিয়ে ভর্তি আছেন জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার ওমর ফারুক। তিনি বলেন, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমি, শরীরে ছোট ছোট লালচে দাগ দেখা দিলে গত ৯ই মার্চ সন্ধ্যায় জামালপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে ১৫ দিন ভর্তি থাকার পর কোনো উন্নতি হয়নি। পরে সেখানে আমরা নিজেরাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। বর্তমানে হাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে- তবে নিউমোনিয়া কমেনি। যে কারণে এখানো হাসপাতালে আছি।
একই ওয়ার্ডের ৬০৬ নম্বর কক্ষে গিয়ে কথা হয় বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার মো. পনির হোসেনের সঙ্গে। তিনি গাজীরপুর জেলার শ্রীপুরে শ্বশুরবাড়িতে থেকে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি বলেন, আমার ৭ মাস বয়সী সন্তান ছোয়াদ গত ৩রা মার্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালে ৪ দিনে কিছুটা উন্নতি হলে চিকিৎসক ছুটি দিয়ে দেয়। পরে আবারো অবস্থার অবনতি হলে গত ২৫শে মার্চ হাসপাতালে আবারো ভর্তি হই। তবে এখন পর্যন্ত বাচ্চার তেমন উন্নতি হয়নি। নগরীর শানকিপাড়া এলাকার স্বপ্না আক্তার তার ৭ মাস বয়সী আদনানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
তিনি বলেন, হাম রোগের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমবার ২১শে মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করি। ভর্তি হলে ২৩ তারিখ শিশুর অবস্থা উন্নতি হলে চিকিৎসক ছুটি দিয়ে দেয়। পরে রোববার সকালে অবস্থার অবনতি হলে আবার হাসপাতালে ভর্তি করি। কিশোরগঞ্জের ইটনা থেকে জমজ দুই সন্তানকে নিয়ে গত মঙ্গলবার ভর্তি হন আল আমিন ও নাজমা আক্তার দম্পতি। জুঁই ও জুনাইনা নামের দুই শিশুর বয়স ১৪ মাস। ৯ মাসের সময় হামের টিকা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেড়াতে যাওয়া টিকা দিতে পারেননি নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘টিকা না দিলে এমন হইবো জানলে টিকাটা আগেই দিতাম।’ শিশু বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষে প্রায় ১৫-১৬ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছেন। এক বিছানায় দুই রোগীর চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী থাকায় অন্য রোগীদের সঙ্গেই হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুঝুঁঁকি তৈরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণগুলো রয়েছে। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. গোলাম মওলা বলেন, হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি দু’ধরনের রোগীই আমরা পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে আইসিইউতে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। কয়েকমাস ধরে এক-দু’জন রোগী পাওয়া গেলেও এ মাসেই বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তিনটি ?পৃথক কর্নার করা হলেও সেখানে রোগী না ধরায় হাম আক্রান্ত রোগীদের শতভাগ আইসোলেশনে রাখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া অন্য রোগীদেরও চাপ রয়েছে।
নার্স মোমেনা খাতুন জানান, চলতি ১৮ই মার্চ থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের তথ্য তারা পৃথকভাবে সংরক্ষণ করছেন। এর মধ্যে ১৮ই মার্চ ওয়াজকুরুনী নামে ৪ মাস বয়সী এক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শিশুটি জেলার গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল ১৫ই মার্চ। ২৬শে মার্চ ময়মনসিংহ নগরের নওমহল এলাকায় তনুসা নামে ৩ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সামিয়া নামে ২ বছর বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই শিশুটিকে পুলিশ লাইন্স এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, শনিবার রাত ১১টার দিকে ৬ মাস বয়সী নুরুন্নবী নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটি নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের ছেলে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের সাত মাস বয়সী ছেলে লিয়নকে ২৭শে মার্চ দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শিশুটি শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মারা যায়। শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, হাসপাতাল প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ রোগী থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ রোগীদের মাঝে আছে এমন সংখ্যা কম। আপাতত তিনটি কক্ষে রোগীদের রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) লোকজন এই হাসপাতালে এসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ হাম আক্রান্ত বেড়ে গেল তা বুঝা যাচ্ছে না। তবে শিশুদের টিকাদানে সমস্যা হওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যদের দূরে রাখতে হবে ও সাবধানে থাকতে হবে। এই রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, আগে এ ধরনের রোগী এত বেশি দেখা যায়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি ও ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে টিকাদান সঠিকভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সারা দেশেই হামের প্রকোপ বেড়েছে। টিকা সঠিকভাবে হলে হাসপাতালে রোগী দেখা যেতো না। সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফয়সল আহমেদ বলেন, হাম আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি করে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড ফিবার ক্লিনিক চালুর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেলে সব জায়গা থেকেই রোগী আসে।