Image description

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। দেশ জুড়ে অরাজকতা। পাম্পগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে হাতাহাতি, সংঘর্ষ নিত্যদিনের ঘটনা। কোথাও কোথাও হত্যার ঘটনাও ঘটছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে এ অরাজকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে তেল সংকটের কারণে ব্যক্তিগত যানবাহন বের করতে পারছেন না। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদ- সবখানেই সংকট। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করলেও পাম্পগুলোতে উল্টো চিত্র। নানা জায়গায় অবৈধ মজুতের সন্ধানও পাচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের রিপোর্টে-
স্টাফ রিপোর্টার, মৌলভীবাজার থেকে জানান, মৌলভীবাজারে জ্বালানি তেল নিয়ে এখন গ্রাহকদের এমন দুর্ভোগ চরমে। তেল না থাকার অজুহাতে বন্ধ থাকছে পাম্প।

হঠাৎ করে দুই-একটি পাম্পে তেল বিক্রির খবরে দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা ছুটে আসছেন। শত শত যানবাহন নিয়ে একসঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। এতে বিশৃঙ্খলা, মারামারি, হামলা ও মামলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যে অল্প তেল পাচ্ছেন, এতে করে তারা যেখান থেকে আসছেন সেখানে পৌঁছারও নিশ্চয়তা থাকছে না। এখন রাতদিন তেল নিয়ে জেলার অর্ধশতাধিক ফিলিং স্টেশন ও প্যাক্ট পয়েন্টে এমন চরম হট্টগোল আর ঝগড়ার দৃশ্য লক্ষণীয়। এ নিয়ে তেল ক্রেতা ও বিক্রেতারা চরম বিরক্ত ও বিব্রত। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নেই- এমন সাইনবোর্ড ঝুলিয়েও গ্রাহকদের সরানো যাচ্ছে না। অনেক ফিলিং স্টেশন ও প্যাক্ট পয়েন্টে অতিরিক্ত মূল্যে তেল বিক্রি ও মজুতের অভিযোগ উঠছে। গ্রাহকদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন অভিযান ও জরিমানা অব্যাহত রেখেছেন। এ ছাড়া, অনেক গ্রাহকও দৈনন্দিন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে উঠছেন।

জানা যায়, মৌলভীবাজারে বিপিসি’র তিনটি ডিপোর নিয়ন্ত্রণে দুই জেলা। ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ থাকলেও সংকট কাটছে না। ফিলিং স্টেশন ও প্যাক্ট পয়েন্টের গাড়ি দীর্ঘ অপেক্ষার পর চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে। মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)’র আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার তিনটি বৃহৎ ডিপো থেকে। সেখানে প্রতিদিনই ট্রেনের ওয়াগনের মাধ্যমে কয়েক লাখ লিটার তেল মজুত হয়।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাতটি উপজেলায় নিয়মিত যে তেল পেতেন সেটি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন ফিলিং স্টেশন ও প্যাক্ট পয়েন্টের মালিক ও ম্যানেজাররা। এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গলস্থ মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ডিপোর তত্ত্বাবধায়ক কাজী আবু জাফর, যমুনা ওয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মো. রাশেদুল ইসলাম, পদ্মা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মো. আব্দুল হান্নান মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান, মজুতকৃত জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের এ সময় তারা দুই জেলার তাদের গ্রাহকদের যেভাবে সার্ভিস দিয়েছেন, এখনো অনুরূপভাবে সার্ভিস দেয়া হচ্ছে। ডিপোতে পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে। সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল মানবজমিনকে বলেন, রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে ফিলিং স্টেশন ও প্যাক্ট পয়েন্টের মালিক ও তাদের প্রতিনিধি, ডিপো ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এ বিষয়ে সভা হয়েছে। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, পার্বত্য জেলা বান্দরবান বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ভুগছে। যা স্থানীয় জনজীবন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। হঠাৎ করে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, পরিবহন খাতে স্থবিরতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদর ও লামা উপজেলা মিলে সাতটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। রোববার সকালে পাহাড়ি ফিলিং স্টেশন ছাড়া বাকি ছয়টিতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বন্ধ রেখেছে জ্বালানি তেল। তবে অকটেন ও ডিজেল থাকলেও বিক্রি করছেন সীমিত আকারে। বাকি পাঁচটি উপজেলাতে কোনো ফিলিং স্টেশন নাই। সরবরাহ বন্ধ থাকায় সেসব উপজেলাতেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা গত ১৫ দিন ধরে দোকান বন্ধ রেখেছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, রংপুরে বেশি তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছে ডিপোগুলো। অপরদিকে, নিরাপত্তার শঙ্কায় তেলের ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। জানা যায়, সিলেট গ্যাসফিল্ড থেকে রেলের ওয়াগনের মাধ্যমে পেট্রোল-অকটেন পরিবহন করা হতো রংপুরের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেলের ডিপোতে। তেল সংকট তৈরি হলে চট্টগ্রাম থেকেও এসব ডিপোতে তেল সরবরাহ করা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সম্প্রতি তেল সংকট নিয়ে উৎকণ্ঠায় গ্রাহকরা বেশি বেশি করে তেল সংগ্রহ করে চলেছে। এতে গত বছরের মতো ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হলেও পাম্পগুলো গ্রাহকদের জ্বালানি তেল দিতে পারছে না।

ফলে পাম্প থেকে বাড়তি চাহিদা আসায় ডিপোগুলো বাধ্য হয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে। এ ছাড়া, বিগত দিনে মাসে ৮-১০ বার ওয়াগনের মাধ্যমে রংপুরের ডিপোগুলোতে তেল এলেও বর্তমান ইঞ্জিন সংকটের কারণে চাহিদামাফিক ডিজেল আসছে না। মেঘনা ডিপোর ইনচার্জ জাকির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, রংপুর জেলায় ৪৫-৬০টি তেলের পাম্প রয়েছে। আগে পাম্পগুলো সপ্তাহে দু’বার পেট্রোল-অকটেন নিলেও বর্তমানে প্রতিদিনই পাম্প থেকে চাহিদা আসছে। ফলে সেই অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া পাম্পে গ্রাহকদের ভিড়ের কারণে নিরাপত্তার শঙ্কায় ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট ১২টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। অধিকাংশ পাম্পে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেলচালক ও ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারীরা। সংকট নিরসনে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। ফলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়ছে। শহরের উত্তর তেহমুনীর ফিলিং স্টেশন ঈদের আগে পর্যন্ত পাম্পটি সীমিত পরিসরে জ্বালানি সরবরাহ চালু রাখলেও বর্তমানে তারাও পেট্রোল ও অকটেন সংকট দেখাচ্ছেন। সংকটের খবর পেয়ে কয়েকবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভি দাস সরজমিন ওই ফিলিং স্টেশন পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি পাম্পের মজুত ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। অভিযান চলাকালেও পাম্পে পেট্রোল-অকটেন না পাওয়ায় উপস্থিত গাড়িচালক ও বাইকারদের মধ্যে হতাশা দেখা যায়।

মোটরসাইকেলচালকরা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে। পেট্রোল ও অকটেননির্ভর যানবাহন চলাচল কমে যাওয়ায় অনেকেই জরুরি কাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বিকল্প হিসেবে সিএনজি বা গণপরিবহন ব্যবহার করতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, ময়মনসিংহ জেলায় জ্বালানি তেলের ক্রয়-বিক্রয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমোদিত ফিলিং স্টেশন ও ডিলার ছাড়া খোলা বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও তেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবার চলছে। পাম্পের কতিপয় মালিক রাতের আঁধারে জ্বালানি তেল সরিয়ে মজুত করে রাখার প্রমাণ মিলেছে। শনিবার দুপুরে ফুলপুরে মাটির নিচে ট্যাংক থেকে ২৩ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছে প্রশাসন। নগরীর ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পগুলো বন্ধ রয়েছে। তেল সরবরাহ কম। তাই তেল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে মালিক কর্মচারী জানান। এ সুযোগে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, সিএনজি, পিকভ্যান, সকল গাড়ির ভাড়া দ্বিগুণের বেশি আদায় করছে।