Image description

৬ মাস বয়সী শিশু ইয়াশফিকে নিয়ে কুষ্টিয়া সদর থেকে তিন হাসপাতাল ঘুরে রবিবার (২৯ মার্চ) মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসেছেন আরাফাত। প্রথমবার ভর্তি নেয়নি, পাঠানো হয় ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালে। তবে শিশুর বয়স এক বছরের কম হওয়ায় সেখানেও ভর্তি নেওয়া হয়নি। পুনরায় সংক্রামক ব্যাধিতে আসেন আরাফাত। অবশেষে ভর্তি করান ইয়াশফিকে। হাসপাতালের ৬ষ্ঠ তলার চিকেনপক্স ওয়ার্ডের একটি বেডে তার সঙ্গে কথা হয়। তবে শিশুটি চিকেনপক্স নয়, হামে আক্রান্ত।

দুপুরে কথা বলার সময় ওই বেডেই শিশু ইয়াশফিকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। তার বাবা জানালেন, শিশুটির আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত রোগীর কারণে তাকে সেখানে নেওয়া হচ্ছে না, শিশুটির অবস্থা খুব খারাপ। আরাফাত জানান, গত শুক্রবার হঠাৎ নিউমোনিয়া দেখা দেয় ইয়াশফির। প্রথমে কুষ্টিয়া, পরে রাজশাহী, এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে এখানে এসেছেন তিনি।

ইয়াশফির বাবার মত এরকম বহু শিশুকে নিয়ে অভিভাবকদের গন্তব্য এখন এই হাসপাতাল। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার (২৮ মার্চ) পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৫৬০ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এক রকম জ্যামিতিক হারেই বেড়েছে রোগটির প্রকোপ। অবস্থার নাজুকতায় এক সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ২২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। সারাদেশে এই সংখ্যা আরও বেশি।

রোগীর স্বজন, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মায়ের বুকের দুধ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্তত ৯ মাস পর্যন্ত শিশুকে হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। নিয়মিত টিকা কর্মসূচির শিডিউলে তাই হামের টিকা কার্যক্রম শুরুই হয় শিশুর নয় মাস বয়সে। কিন্তু এ বছর হঠাৎ এই চিত্র বদলে গেছে। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের চিকিৎসা নিতে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই নয় মাসের কম বয়সী। সারাদেশে এই চিত্র প্রায় ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে।

গত ২৪ মার্চ শিশু আব্দুল্লাহ ইসলাম আনাসকে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল। রবিবার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ৮ নং ওয়ার্ডের ৬ নং বেডে কথা হয় তার মায়ের সঙ্গে। আনাসের র‌্যাশের কারণে চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তার মা ফাতেমা বেগম জানালেন, বর্তমানে ৮ মাস ২ দিন বয়সী আনাসকে ২৪ মার্চ টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও তার আগের দিনই ভয়াবহ জ্বরের কবলে পড়ে। এজন্য টিকা দেওয়া হয়নি। পরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, গত সোমবার (২৩ মার্চ) এলার্জির মত দেখছিলাম। ওর এলার্জি হয়। ভাবছিলাম সেটাই। ফার্মেসিতে গিয়ে এলার্জির ওষুধ খাইয়েছি। রাতে গিয়ে দেখি অনেক জ্বর। ১০০ ডিগ্রির ওপরে হবে। ঠিক, সকালে ফার্মেসিতে গিয়ে দেখি ১০২ ডিগ্রি জ্বর। ফার্মেসি থেকে একটা সাপোজিটরি দিয়েছে, একটা সিরাপ দিয়েছে। সাপোজিটরির ডোজ দিয়ে সিরাপটা খাওয়ানোর পর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। কিন্তু আধাঘণ্টা পরে আবার জ্বর। পরে ডাক্তার বলছে, যদি ১০০-র ওপরে থাকে ডোজ দিবেন। কম থাকায় ডোজ দেইনি। পরের দিন দেখি পাতলা পায়খানা শুরু।

যে বাচ্চাগুলার হাম হচ্ছে, তাদের কিন্তু নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। সারাদেশে এরকম ৩৩ শতাংশ শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। এটা কিন্তু সচরাচর হয় না। আমরা প্রথম ডোজই দেই নয় মাস পূর্ণ হলে, কিন্তু তার আগেই হয়ে যাচ্ছে। এখন এটা কেন হচ্ছে, তা যাচাই করতে আমাদের বিভিন্ন টেকনিক্যাল কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বের করতে হবে যে এটা কেন হচ্ছে এবং আমাদের টিকাদানের সময়টা এগিয়ে আনতে হবে কিনা— মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ, উপ-পরিচালক, সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)

পরে শিশুকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান ফাতেমা বেগম। চিকিৎসক তাকে সতর্ক হতে বলেন। একই সঙ্গে তিনি আরেকজন চিকিৎসকের কাছে পাঠান। পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে ফাতেমা বেগম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ওই ডাক্তার বলেন যে এই রোগী প্রাইভেটে রেখে বাঁচাতে পারবেন না, তাড়াতাড়ি গিয়ে ভর্তি হন। তিনি নিজেই শিশু হাসপাতাল, কলেরা হাসপাতালে ফোন দেন। জায়গা পাওয়া যায়নি। পরে একটা বেসরকারি হাসপাতালেই চেষ্টা করি, সেখানেও জায়গা পাইনি। এখানে রাত ১২টা বাজে এসেছি। প্রথমে ৪ তলা, পরে ৬ তলায় নিয়ে আসা হয়েছে। মেঝেতেই থাকতে হয়েছিল। একটু আগে বেড পেয়েছি।

পাশের বেডের তুবা মনিকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন মা ঝুমুর। সপ্তাহখানেক হল এই হাসপাতালে আছেন তিনি। বললেন, প্রথমে জ্বর উঠছে। থামে না, তখন দেখি শরীরে র‌্যাশ উঠছে। জ্বরের তিনদিন পর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাসপাতাল যাই। সেখান থেকে এখান পাঠিয়েছে। লাল দাগ ছিল, কমে গেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, এখন হাম ভাল হয়ে গেছে, তবে নিউমোনিয়া আছে।

হাম ছড়িয়েছে সারাদেশে, হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এটি শুধু সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিত্র নয়। সারা বাংলাদেশে হঠাৎ হামের একটা ‘আউটব্রেক’ হয়েছে। তারা বলছেন, গত জানুয়ারির শেষ দিক থেকে একটু একটু করে হামের রোগী বাড়তে শুরু করে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যমতে, গত জানুয়ারি মাসেও হাসপাতালটিতে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, যা অন্যান্য সময়ের তুলনায় স্বাভাবিক হিসেবেই দেখেছেন তারা। তবে ফেব্রুয়ারিতে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ জনে। চলতি মার্চের ২৮ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন ৪৪৭ জন। এ সময়ে জানুয়ারিতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে এক এবং বাকিরা মার্চ মাসে মারা গেছে।

tdc (3)
চোখে-মুখে এমন র‌্যাশ নিয়ে আনাসকে ভর্তি করা হয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে

 

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হয়েছিল ৬৯ জন। এর মধ্যে ২৫ শতাংশের পজিটিভ রিপোর্ট আসে। অর্থাৎ, ২০ বা ৩০ জন রোগী ছিল গত বছর। কিন্তু চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৫৬০ জন আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া ২২ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে তিনজন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি থাকত। সেখানে এখন প্রতিদিন গড়ে একশোর বেশি রোগী ভর্তি অবস্থায় থাকছে। আর রাজধানী ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। হাসপাতালটিতে আসা রোগীদের মধ্যে কড়াইল বস্তি এবং মোহাম্মদপুরের রোগীর আধিক্য রয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশ থেকেই আসছে রোগীরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরগুনা, চট্টগ্রাম ও যশোরকে গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আমরা যে ৯ মাস নির্ধারণ করেছি, তার একটা বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে যে অ্যান্টিবডি আসে, সেটা প্রায় ৯ মাস বা তার বেশি সময়ও থাকে। যে জন্য ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম থেকে ৯ মাসের পর দেওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে যদি দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মায়ের থেকে যে অ্যান্টিবডিটা পাবে, সেটা ওই ভ্যাক্সিনটাকে নষ্ট করে দিবে। এজন্য বৈশ্বিকভাবেই এটা ৯ মাসে দেওয়া হয়— অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, সাবেক চেয়ারম্যান, ভাইরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

এদিকে রোগীর আকস্মিক ঢলে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ১০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল সংক্রামক বিভিন্ন রোগ অনুযায়ী শয্যা ভাগ করা আছে। এর মধ্যে ১০ শয্যার একটি আইসোলেশন সেন্টার রয়েছে, যা হামের রোগীদের জন্য নির্ধারিত। তবে নিয়মিত রোগী না থাকায় এর দুটি শয্যা নিপা ভাইরাসের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়। বাকি ৮টির মধ্যে আবার হাম ছাড়া ডিপথেরিয়া, মামস, এনথ্রাক্সসহ এই ধরনের আরো যে সকল ছোঁয়াচে রোগীদের রাখা হয়। তবে হামসহ এসব রোগ কমে যাওয়ায় এতদিন সমস্যা হচ্ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে হামের রোগী বেড়ে যাওয়ায় সক্ষমতায় কুলিয়ে উঠছে না প্রতিষ্ঠানটি।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত দুই-তিন দিন আগে ১৫৫ থেকে ১৬০ জন করে রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ২৫টি এইচআইভি, চতুর্থ তলায় ধনুষ্টঙ্কারের ২৫টি শয্যা রয়েছে। এ ছাড়া আইসিইউ, গুটিবসন্ত, জন্ডিস, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, এ ধরনের রোগীদের জন্য রয়েছে। ফলে এত হামের রোগীকে অন্য কোথাও রাখার সুযোগ নেই প্রতিষ্ঠানটির। তবে নিরুপায় হয়ে মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্য প্রতিটি ফ্লোরেই রোগী রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে জনবলও কম। হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির জন্য রয়েছেন ১৯ জন ডাক্তার। এ ছাড়া নার্সসহ অন্যান্য জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে হঠাৎ রোগীর প্রকোপ বাড়লে বেশ হিমশিম খেতে হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। ঈদের বন্ধেও দিনরাত একটানা কাজ করতে হয়েছে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল সংকট রয়েছে। আমরা এইচআইভি বা চিকেনপক্সের সাথে হামের রোগী রাখতে পারি না। সবাইকে আলাদা আলাদা জায়গা দিতে হয়। এজন্য চাইলে সবাইকে জায়গা দিতে পারছি না। আর প্রকল্পের অধীনে চলা আইসিইউ বন্ধ ছিল, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা হয়েছে। তবে সেটিকে শিশুদের উপযোগী করার জন্য কিছু যন্ত্রাংশ প্রয়োজন। এই বিষয়ে আমরা চিঠি লিখেছি। নিশ্চয়ই আমরা খুব দ্রুতই এটা কনভার্ট করে ফেলতে পারব। আমরা আমাদের সক্ষমতা দিয়েই চালাচ্ছি।

সময়ের আগে আক্রমণে উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও
স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। সম্প্রতি হামের দুটি টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, দ্বিতীয়টি দেওয়া হয়ে থাকে ১৫ মাস বয়সে। সাধারণত মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এই সময়ের জন্য হামপ্রতিরোধী শক্তি পেয়ে থাকে শিশু। কিন্তু হাম এ বছর কোনো ব্যাকরণ মানছে না।

একটি সূত্র বলছে, প্রতি বছর নিয়মিত শিডিউলে টিকা দেওয়া হলেও এতে কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং অবহেলার পাশাপাশি কখনো কখনো টিকার ঘাটতির কারণেও এমনটি হতে পারে। এজন্য বাদ পড়া শিশুদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে প্রতি ৪ বছর পরপর একটা ক্যাম্পেইন করে সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষ সময়ের জন্য নির্ধারিত এই ক্যাম্পেইনটি অনুষ্ঠিত হয়নি। হয়নি ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের ক্যাম্পেইনটিও। এসব কারণে হামের প্রকোপ বাড়তে পারে। তবে যে রোগের টিকা নয় মাসের পর দেওয়া হয়, সে রোগের আক্রমণ ৯ মাসের আগে হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা করে জনবলের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ জ্বরের মতই চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটি সাধারণত খুব খারাপ না হলে তিন থেকে চারদিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমরা হাম সনাক্ত করতে পারি। আর মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি না। তবে মারা গেলেও আমাদের সক্ষমতার ঘাটতির জন্য মারা যাচ্ছে না। এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো সিচুয়েশনের ওপর ডিপেন্ড করে। সিচুয়েশন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারব। টিকা বাদ পড়েছে এটা রিউমার। এর সত্যতা আমরা পাইনি— ডা. আবু হোসেন মো. মাইনুল আহসান, পরিচালক (হাসপাতাল), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) শ্রীবাস পাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের প্রায় ৭০ শতাংশ বাচ্চা হচ্ছে ৯ মাসের কম। প্রকৃতপক্ষে মায়ের তরফ থেকে পাওয়া ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কত মাস থাকবে, এটার কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নাই। তাহলে ৯ মাসে যেহেতু প্রথম ভ্যাকসিন পাচ্ছে, আমরা ধরে নিতে পারি যে নয় মাসের আগে এই রোগ হওয়া বাচ্চাগুলোর ইমিউনিটি নেই।

tdc (8)
হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীর বক্তব্যে। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা যে ৯ মাস নির্ধারণ করেছি, তার একটা বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। মায়ের কাছ থেকে শিশুর শরীরে যে অ্যান্টিবডি আসে, সেটা প্রায় ৯ মাস বা তার বেশি সময়ও থাকে। যে জন্য ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম থেকে ৯ মাসের পর দেওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে যদি দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মায়ের থেকে যে অ্যান্টিবডিটা পাবে, সেটা ওই ভ্যাক্সিনটাকে নষ্ট করে দিবে। এজন্য বৈশ্বিকভাবেই এটা ৯ মাসে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এ কারণে এক থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা ঝুঁকিতে থেকে যায়। এখন বাংলাদেশে বিভিন্ন টিকার সংকট রয়েছে। হয়ত বা বড় একটা জনগোষ্ঠী ভ্যাকসিন দিতে পারছে না, বা কাভারেজে সংকট আছে। যার কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে এই প্রকোপটা হয়েছে। এখন যতদ্রুত সম্ভব ভ্যাকসিন বা টিকার কাভারেজ বাড়াতে হবে।

এদিকে সময়ের আগে হামের আক্রমণে এ রোগের টিকাদানের সময় এগিয়ে নিয়ে আসার কথা বিবেচনা করছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যে বাচ্চাগুলার হাম হচ্ছে, তাদের কিন্তু নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। সারাদেশে এরকম ৩৩ শতাংশ শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। এটা কিন্তু সচরাচর হয় না। আমরা প্রথম ডোজই দেই নয় মাস পূর্ণ হলে, কিন্তু তার আগেই হয়ে যাচ্ছে। এখন এটা কেন হচ্ছে, তা যাচাই করতে আমাদের বিভিন্ন টেকনিক্যাল কমিটির সভা আহ্বান করা হয়েছে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বের করতে হবে যে এটা কেন হচ্ছে এবং আমাদের টিকাদানের সময়টা এগিয়ে আনতে হবে কিনা।

তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যেই গ্যাভির (বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য টিকা কিনতে সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা গ্যাভি, দ্য ভাকসিন অ্যালায়েন্স) কাছে সহায়তা চেয়েছে। গ্যাভি বলেছে যে, আপনারা করতে পারেন, অসুবিধা নাই। উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, তবে অধিকাংশ দেশই ৯ মাসে হামের টিকা দেয়। মাত্র দুইটা দেশ আছে যে দুইটা দেশ ছয় মাসে হামের টিকা দেয়। আমরা আশা করব যে এটার সঠিক যখন কারণ বের করতে পারব, তখন সেই মত টিকা ব্যবস্থাপনাটা করতে পারব।

tdc (5)
টিকা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে ইপিআই

 

এদিকে হামের বাদ পড়া টিকা ক্যাম্পেইন ১৯ এপ্রিল সম্পন্ন করতে চায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তবে এখনও মেলেনি প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়া যায়নি। ইপিআইয়ের উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ২০২৪ সালে বাদ পড়া ক্যাম্পেইনটা করার জন্য পর্যাপ্ত টিকা আমরা পেয়ে গেছি। আইসিসি কমিটির সিদ্ধান্ত হচ্ছে এপ্রিলের ১৯ তারিখ এই ক্যাম্পেইন করা হবে। কিন্তু আমরা তো এখনো লজিস্টিক এবং ফান্ডিং পাইনি। এটা গ্যাভি পুরোপুরি আমাদেরকে অনুদান হিসেবেই দেয়, এটা দিয়ে আমরা কাজ করি। কাজেই এটা পেয়ে গেলেই আমরা আশা করি মে, জুন অথবা জুলাই, যেকোনো এক সময় যখনই আমরা পেয়ে যাব করে ফেলব। আমরা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে ফেলছি। এজন্য ধারাবাহিক মিটিং-প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মো. মাইনুল আহসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিয়েছে। ঈদের ছুটিতেও ঢাকার প্রায় সবগুলো হাসপাতাল ভিজিট করেছি। দেশের বড় যে হাসপাতালগুলো আছে, ১০টা হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছি। ঢাকার চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ডিএনসিসি ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এ ধরনের রোগীদের জন্য আইসিইউ প্রয়োজন হয়, এজন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১০টি আইসিইউ চালু করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের সক্ষমতা দিয়েই আমরা ম্যানেজ করতে পারছি। সমস্যা হচ্ছে না।

২০২৫ সালে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হয়েছিল ৬৯ জন। এর মধ্যে ২৫ শতাংশের পজিটিভ রিপোর্ট আসে। অর্থাৎ, ২০ বা ৩০ জন রোগী ছিল গত বছর। কিন্তু চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৫৬০ জন আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া ২২ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে তিনজন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি থাকত। সেখানে এখন প্রতিদিন গড়ে একশোর বেশি রোগী ভর্তি অবস্থায় থাকছে।

তবে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা করে জনবলের প্রয়োজন হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, সাধারণ জ্বরের মতই চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটি সাধারণত খুব খারাপ না হলে তিন থেকে চারদিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমরা হাম সনাক্ত করতে পারি। আর মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশি না। তবে মারা গেলেও আমাদের সক্ষমতার ঘাটতির জন্য মারা যাচ্ছে না। এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো সিচুয়েশনের ওপর ডিপেন্ড করে। সিচুয়েশন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারব। তিনি বলেন, টিকা বাদ পড়েছে এটা রিউমার। এর সত্যতা আমরা পাইনি।