Image description

১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় সাম্প্রতিক সময়ের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ব্যাপক গণবিক্ষোভে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারপর গত দেড় বছরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালিত হয়। এ সময়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো একত্র হয়ে ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি দলিল প্রণয়ন করে। এটি মূলত বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের একটি পুনর্লিখন। এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে- নাগরিক অধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু। আরও শক্তিশালী নজরদারি ও দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান গঠন।
১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটাররা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে। ফলে এ দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান হন নতুন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’কে দেশের নতুন সংবিধান হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়।

নির্বাচনের সময় বিএনপি ব্যাপক আর্থিক সহায়তা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। তবে দলটি এখন এমন একটি দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যেখানে তাদের এই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এই সংস্কার বাস্তবায়নে তাদের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

রাজনৈতিক অবনমন ও নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তার

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, গত তিন দশকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ছিল উদ্বেগজনক। ১৯৯৫ সালের পর থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে ২০০০-এর দশকের শেষ দিক থেকে রাজনৈতিক অধিকার ও আইনসভা ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইনের শাসনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ হয়েছে। ১৯৯৫ সালের পর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতায় বিশ্বের মধ্যে সপ্তম বৃহত্তম অবনতি ঘটেছে। এর ফলে দুর্নীতি বেড়েছে।
নতুন সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে?
ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি ইনডেক্স দেখায় যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, জুলাই সনদে প্রস্তাবিত বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়ন করলে বিএনপি তাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোতে পারে।

নেপালের শিক্ষা: সংবিধান সংস্কারের কঠিন বাস্তবতা

বিশ্বের অনেক দেশ যেমন ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও তিউনিসিয়া নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে। তবে বাংলাদেশের জন্য নেপালের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নেপাল দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। বাংলাদেশের জুলাই সনদের মতোই, সেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করা হয়। প্রথমে নেপালকে গণতান্ত্রিক সাফল্যের উদাহরণ মনে হলেও, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের কারণ ছিল- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব। বর্তমানে নেপালের নতুন সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ। তিনি এই সমস্যাগুলো সমাধানের চ্যালেঞ্জের মুখে আছেন। এই উদাহরণ এটাই দেখায় যে, শুধু সাংবিধানিক অধিকার যথেষ্ট নয়, অর্থনৈতিক সুযোগও জরুরি।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

বাংলাদেশ ও নেপালের পরিস্থিতি এক নয়। তবে প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরি। জুলাই সনদের সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা উচিত। তবে বিশেষভাবে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
১. দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়া
বর্তমানে এটি একটি আইনি প্রতিষ্ঠান। একে সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নীত করতে হবে। সনদের ৭২, ৭৩ ও ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোম্পানি, ট্রাস্ট ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা প্রকাশ করতে হবে। রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন স্বচ্ছ করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের ও পরিবারের সম্পদের তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে। এসব পদক্ষেপ সরকারকে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করবে।
২. জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রক্রিয়া পরিবর্তন
জুলাই সনদ বলছে, অতীতে নির্বিচারে জরুরি অবস্থা জারি করা গণতন্ত্র ক্ষয় করার একটি হাতিয়ার ছিল। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে- শুধু প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর নয়, মন্ত্রিসভার অনুমোদন, বিরোধী দলের নেতার তদারকি এই পরিবর্তন জরুরি অবস্থা ঘোষণার স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কমাবে।

উপসংহার

নেপালের মতো উদাহরণ দেখায় যে, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা আইনের শাসন যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। একইসঙ্গে গবেষণা বলছে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। বিএনপির অতীতে দুর্নীতির ইতিহাস থাকলেও, যদি তারা স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক সংস্কারের সমন্বয় করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ অস্থিরতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হবে।