Image description

দেশে বনাঞ্চল কমছে ধারাবাহিকভাবে, কমছে বৃক্ষ–আচ্ছাদিত এলাকা। ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে নির্বাচনী ইশতেহারে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার করে বিএনপি। ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগোচ্ছে। সেই জন্য দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব আগামী এপ্রিল মাসে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বন অধিদপ্তর। এ বছরের জুনে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন।

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারের ২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন’ অধ্যায়ে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণ, ১০ হাজার নার্সারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং এ দুটির মধ্য দিয়ে মোট ৬ লাখ কর্মসংস্থানের অঙ্গীকারের বিষয়টি রয়েছে। এ ছাড়া দ্বীপ ও চরাঞ্চলে বিশেষায়িত ড্রোন ব্যবহার করে বৃক্ষরোপণ, শহরগুলোয় পার্ক, ফুটপাত ও খেলার মাঠের পাশে বৃক্ষরোপণের কথা বলছে দলটি।

 

এপ্রিলের মধ্যে বৃক্ষরোপণে প্রকল্প প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (অর্থ ও প্রশাসন) আর এস এম মুনিরুল ইসলাম।

২০১৫ সালে জাতীয় বন জরিপে বন আচ্ছাদনের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, সেটি এখন কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বন জরিপে দেশে বনভূমি আছে ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। আগের বন জরিপে যেটির পরিমাণ ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর।

মুনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বন অধিদপ্তর তাদের চলমান প্রকল্পের আওতায় এ বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ১ কোটি ৫০ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে এক লাখ নিমগাছ রয়েছে। আগামী ৫ বছরে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এ তিন ধাপে ভাগ করে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

বন অধিদপ্তরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নথিতে বলা হয়েছে, এসব গাছের পরিচর্যা ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের জন্য একটি ‘মাই ট্রি মনিটরিং’ অ্যাপ তৈরি করা হবে। বিএনপির ইশতেহারেও ট্রি মনিটরিং অ্যাপ চালুর কথাটি ছিল।

নথিতে দেখা যাচ্ছে, স্বল্প মেয়াদে ২০২৬ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ, ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৩ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১০ কোটি চারা রোপণ করবে বন বিভাগ।

বান্দরবানের শ্যামল নিসর্গ। দেশে সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে পার্বত্য অঞ্চলে
বান্দরবানের শ্যামল নিসর্গ। দেশে সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে পার্বত্য অঞ্চলেফাইল ছবি: প্রথম আলো

কোথায় কতটুকু বনায়ন

বন অধিদপ্তর বলছে, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণকে ৬টি খাতে ভাগ করা হয়েছে।

আগামী ৫ বছরে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এ তিন ধাপে ভাগ করে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
আর এস এম মুনিরুল ইসলাম, বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ধারণাপত্রে কোথায় কতটুকু বনায়ন করা হবে, সে বিষয়ে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ কোটি চারা রোপণ করা হবে, যা কর্মসূচির ৪০ শতাংশ। নতুন জেগে ওঠা চর, অবক্ষয়িত উপকূলীয় বন ও উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরির অংশ হিসেবে এখানে বনায়ন করা হবে।

চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের পাহাড়ি অবক্ষয়িত ও দেশের মধ্যাঞ্চলের অবক্ষয়িত শালবন পুনরুদ্ধারে লাগানো হবে ৫ কোটি চারা, যা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ২০ শতাংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বন উজাড়ের কারণে নদী, ঝিরি ও খালের উৎসমুখে পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। সেখানে বনায়নের লক্ষ্য থাকবে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো, ভূমিধস রোধ ও মাটির উর্বরতা বাড়ানো।

নগরগুলোয় বায়ুদুষণ ও তাপমাত্রা কমাতে রোপণ করা হবে ১ কোটি ২৫ লাখ গাছের চারা। এ ছাড়া কাঠ, কাগজ, পার্টিকল বোর্ডের চাহিদা মেটাতে উৎপাদনমুখী বনায়ন করা হবে এ কর্মসূচির আওতায়। ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, এতে প্রাকৃতিক বনের গাছের ওপর চাপ কমবে।

এ ছাড়া কমিউনিটিভিত্তিক প্রান্তিক ভূমিতে বনায়নে লাগানো হবে ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ। বিশেষ করে রাস্তার ধার, রেলপথের ধার, নতুন খনন করা খালের পাড় ও নদীর তীরে এ বনায়ন করা হবে।

প্রতিষ্ঠান, বসতভিটা ও কৃষি বনায়নের অংশ হিসেবে লাগানো হবে ৩ কোটি ৭৫ লাখ গাছ। দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারি অফিস প্রাঙ্গণ ও বসতবাড়ির আঙিনা ও খালি জায়গাকে এ বনায়নের আওতায় আনা হবে।  

নতুন প্রকল্পের আওতায় এ বছরের জুন পর্যন্ত ১ কোটি ৫০ লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হবে। এরপর ২০২৬ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ, ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৩ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০২৯ সাল থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১০ কোটি বৃক্ষ রোপণ করবে বন বিভাগ।

কমছে বনভূমি

বন অধিদপ্তর ২০২৫ সালে সর্বশেষ বন সমীক্ষা করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১ লাখ হেক্টর (২ লাখ ৪৭ হাজার একর) বনভূমি হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে পার্বত্য অঞ্চলে। শুধু রাঙামাটি জেলাতেই বনভূমি কমেছে ৮০ হাজার হেক্টর।  

২০১৫ সালে জাতীয় বন জরিপে বন আচ্ছাদনের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ, সেটি এখন কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বন জরিপে দেশে বনভূমি আছে ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। আগের বন জরিপে যেটির পরিমাণ ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বন—চট্টগ্রামের চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, কক্সবাজারের মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও ফাসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ তিনটি বন ছিল অবিভক্ত বনাঞ্চল। এ তিনটি বনের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দোহাজারি–কক্সবাজার রেললাইন। এতে কাটা পড়েছে এ তিন বনের ৬ লাখ ৭০ হাজারের মতো ছোট–বড় গাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতির চলাচলের করিডর।

এভাবে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে গত এক দশকে বনের জায়গায় গাছ কেটে করা হয়েছে সরকারি প্রকল্প। বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) হিসাব বলছে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সরকারি প্রকল্পে প্রায় ১৩ লাখ গাছ কাটা পড়েছে। সংস্থাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য সংকলন করে এ হিসাব করেছে তারা।