মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এর ফলে হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে বাধ্য হয়ে হোটেল ও অস্থায়ী অফিসে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সামরিক সূত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ অভিযানের জবাবে ইরান হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে স্থলভিত্তিক মার্কিন সেনাদের বড় অংশ এখন কার্যত দূরে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। তবে যুদ্ধবিমান চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া পাইলট ও সংশ্লিষ্ট ক্রুরা এখনও মাঠ পর্যায়েই কাজ করছেন।
গত বুধবার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের আইআরজিসি ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সেনাদের নতুন অবস্থানের তথ্য দিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমেরিকান সন্ত্রাসীদের লুকানোর স্থান জানানোটা আপনাদের ইসলামী দায়িত্ব। তাদের তথ্য আমাদের টেলিগ্রামে পাঠান।’ এ ছাড়া ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন সেনারা হোটেলে অবস্থান করে বেসামরিক লোকজনকে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের হুমকি তাদের অভিযান চালানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা ইরানের ভেতরে ও তাদের সামরিক অবকাঠামোতে সাত হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি।’
সেনাদের অস্থায়ী বা বিকল্প স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধ শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের মধ্যে হাজার হাজার সেনাকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিয়েছে। এখনও মধ্যপ্রাচ্যে আছেন অনেকে। তবে তারা আগের ঘাঁটিতে নেই। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এতে যুদ্ধ পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ মাস্টার সার্জেন্ট ওয়েস জে. ব্রায়ান্ট বলেন, ‘আমরা দ্রুত অস্থায়ী অপারেশন সেন্টার গড়ে তুলতে পারি; কিন্তু এতে সক্ষমতা কমে যাবে। সব ধরনের সরঞ্জাম হোটেলের ছাদে বসানো সম্ভব নয়। কিছু বিষয় খুবই জটিল।’
মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত অঞ্চলের ১৩টি ঘাঁটির অনেকই এখন বসবাসের অযোগ্য। বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী কুয়েতের ঘাঁটিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোর্ট শুয়াইবায় এক হামলায় মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার ধ্বংস হয়ে ছয় সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প বুহরিংয়ে হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে হামলায় একটি সতর্কীকরণ রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে ড্রোন হামলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যোগাযোগ সরঞ্জাম ও জ্বালানি ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, তীব্র বিমান হামলার পরও ইরানের কিছু সামরিক সক্ষমতা এখনও রয়েছে। তিনি বলেন, অঞ্চলজুড়ে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের সেনা ও স্বার্থ রক্ষা করছে। তবে প্রতিরক্ষা আরও জোরদারের চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেন্টাগনের জন্য অনেক সমস্যার একটি হলো, ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্র যে ঘাঁটি ও অবকাঠামো তৈরি করেছিল, তা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ইরান আগের প্রতিপক্ষদের মতো নয়। ইরানের কাছে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যুদ্ধের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবও ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।