ময়মনসিংহ নগরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, একই সঙ্গে দুর্যোগকালে উদ্ধার কার্যক্রম নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে টাকা দিলেই মিলছে বাড়ি তৈরির অনুমোদন।
২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর সিটি করপোরেশন গঠিত হয়। পুরোনো ২১টি ওয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও ১২টি নতুন ওয়ার্ড। বিভাগীয় শহর হওয়ায় মানুষের আগমন বাড়ে কয়েক গুণ। এই চাপ সামাল দিতে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে দ্রুত গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। তবে এর বেশির ভাগই নির্মিত হচ্ছে নিয়ম না মেনে। সরু সড়কের পাশে এসব ভবন নির্মাণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি গুলকীবাড়ি এলাকায় একটি পাঁচতলা ভবন হেলে পড়ার ঘটনা নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অভিযোগ, পাশের একটি ভবনের বেজমেন্ট নির্মাণে নিয়ম না মানায় ওই ঘটনা ঘটে। সিটি করপোরেশন ভবনটি সিলগালা করলেও কিছুদিন পর আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়।
সরেজমিনে গুলকীবাড়ি, কাচিঝুলি, চরপাড়া, মাসকান্দা, আকুয়া, নতুন বাজার ও টাউনহল এলাকায় দেখা যায়, আগে যেখানে ছোট ভবন ছিল, এখন সেখানে উঠেছে বহুতল ভবন। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের মাঝে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি; একটির সঙ্গে আরেকটি প্রায় লেগে আছে। নির্মাণাধীন ভবন থেকে সড়কে ইটপাথর পড়েও ঘটছে দুর্ঘটনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এক শ্রেণির ভবনমালিক ও ডেভেলপার নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করলেও সিটি করপোরেশন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করেই অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়া জানান, পাশের বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে তার বাড়ির দেয়ালে ফাটল ধরেছে। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন জেল রোডের একটি ফিলিং স্টেশনের মালিক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের ফলে তার প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে; বাধ্য হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক সময় অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয় না। চারতলার অনুমোদন নিয়ে ছয়তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে। নিরাপত্তাব্যবস্থাও উপেক্ষিত থাকছে। সম্প্রতি জিলা স্কুলের সামনে নির্মাণাধীন একটি ভবনের দেয়াল ভেঙে একটি গাড়ির ওপর পড়ে; অল্পের জন্য প্রাণহানি এড়ানো যায়।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, নগরে ৭২ হাজার ৬২১টি হোল্ডিংয়ে লক্ষাধিক ভবন রয়েছে। সিটি করপোরেশন গঠনের পর দেড় হাজারের বেশি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ বছরে সাততলার বেশি উচ্চতার দুই শতাধিক ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মউক) গঠনের গেজেট প্রকাশ হয়েছে গত বছর। তবে অবকাঠামো উন্নয়নে এই সংস্থায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নাগরিক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ময়মনসিংহ।
সংগঠনটির সভাপতি ইয়াজদানী কোরায়শি কাজল বলেন, নিয়মের তোয়াক্কা না করেই নগরে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, ফলে বাসিন্দারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মউকে নাগরিক নেতৃবৃন্দের সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ রেইন বিল্ডার্সের পরিচালক প্রকৌশলী নাদিম পারভেজ খান বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তার ভাষ্য, অনেক ভবন মালিক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করছেন। কেউ কেউ চার তলার অনুমোদন নিয়ে ছয় তলা পর্যন্ত ভবন তুলছেন। অথচ এসব ভবনের মালিকেরা নিজেরা সেখানে বসবাস না করে ভাড়া দিয়ে আর্থিক লাভ করছেন। এতে ভাড়াটিয়ারা ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পেও এসব ভবন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের কঠোর নজরদারি জরুরি।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনগুলো বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সরু সড়কের মধ্যেই গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন, যার অনেকগুলোর নির্মাণকাজ এখনও চলমান। তিনি বলেন, কোনো দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় বহুতল ভবনের অনুমোদন দিতে হবে পরিকল্পিতভাবে।
তবে নিয়মবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের অভিযোগ নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মজীদ বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই ভবন নির্মাণে বিধিমালা মানা হচ্ছে না। বিল্ডিং কোড লঙ্ঘনের তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।