Image description

চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত দেড় বছর ধরে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। শুধু তাই নয়, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রশাসন ও অর্থ পদ দুটিও খালি ছিল ছয় মাসের বেশি সময় ধরে। এর মধ্যে ডিএমডি (প্রশাসন) পদে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও ডিএমডি (অর্থ) পদ এখনো খালি।

সংস্থার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত বছরের মার্চে এমডি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। তবে এক বছরেও যোগ্য কাউকে খুঁজে পায়নি সংস্থাটি। এছাড়া অস্থায়ী এমডি পদেও পরিবর্তন আনা হয় একবার। সবশেষ গত মঙ্গলবার রাতে একজনকে এমডি হিসেবে নিয়োগের পর দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ওই নিয়োগ বাতিল করা হয়। এতে জনমনে যেমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তেমনি সংস্থাটির কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। স্থায়ী এমডি না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়েছে। একাধিক পদে বারবার রদবদল হচ্ছে, যা কোনো সংস্থার জন্য সুখকর নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনভোগান্তি আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।

ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, যেখানে চট্টগ্রাম ওয়াসার বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা, সেখানে নতুন এমডি হিসেবে চতুর্থ গ্রেডের একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে মুহূর্তেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এটিকে অনেকেই নজিরবিহীন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

সূত্রটি আরো জানায়, গত দেড় বছর ধরে ভাসমান এমডি দিয়ে চলছে সংস্থাটি। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর দুর্নীতি ও আওয়ামী ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহর নিয়োগ বাতিল করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। একই বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক আনোয়ার পাশাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত বছরের ৪ জুন তার বদলি হলে এ পদে আবার পরিবর্তন আসে। অতিরিক্ত দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকারের পরিচালক মনোয়ারা বেগম। গত বছরের মার্চে প্রথমবার এমডি নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওয়াসা। এর আগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বদলে সরকারের ইচ্ছায় নিয়োগ দেওয়া হতো। তবে এক বছর পেরোলেও কাউকে নিয়োগ দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কমিটি।

সূত্র আরো জানায়, এমডি না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সেবা সংস্থাটি। ফলে সেবার দিক থেকে অন্যান্য সংস্থার তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশের পদোন্নতি হয়নি। তাদের মধ্যেও আছে কাজে অনীহার পাশাপাশি নানা ক্ষোভ ও অভিমান, যা প্রভাব ফেলছে কার্যক্রমে। এছাড়া বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসা জনবল সংকটে ভুগছে। বিভিন্ন বিভাগে ২০০-৩০০টি পদ খালি রয়েছে। পাঁচ হাজার কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। অথচ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগ দিচ্ছে ওয়াসা। এতে কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ওয়াসা একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন নগরবিদরা।

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ওয়াসায় স্যুয়ারেজ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। তাছাড়াও বাইরের অর্থায়নে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে ওয়াসা। তবে নিয়মিত এমডি না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ অংশে সই করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সংস্থা ওয়াসার এমডি ছাড়া এগোতে আগ্রহী নয়। এছাড়া অস্থায়ী এমডিরাও গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে সই করতে রাজি নন। সব মিলিয়ে ওয়াসার কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ওয়াসার কাজে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। ডিএমডি (প্রশাসন) পদে একজন যোগ দিলেও ডিএমডি (অর্থ) পদে বদলিকৃত ব্যক্তি যোগ দেননি। এছাড়া সচিব ফাহমিদা আক্তার জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাকে প্রায়ই ছুটিতে থাকতে হয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, সংস্থাটিতে প্রকৌশলী সংকট রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার টানা সাতবার ফজলুল্লাহকে এমডি নিয়োগ দিলেও তিনি নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন। সে সময় এমন নজিরও রয়েছে, একজন কর্মকর্তা পাঁচজনের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সংস্থায় কর্মরত জনবলকে পদোন্নতি না দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করায় কাজে অনভিজ্ঞরা প্রবেশ করেন আর অভিজ্ঞরা ঝিমিয়ে পড়েন। এতে ওয়াসা লাভজনক ও সেবামূলক সংস্থা হয়ে ওঠার বদলে বছরের পর বছর লোকসান গুনে যাচ্ছে।

ওয়াসার এক শ্রমিক নেতা জানান, ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করার সামর্থ্য নেই বর্তমান প্রশাসনের। এক যুগ ধরে ২৫০ শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করছেন। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া সংস্থাটির অন্যতম অংশ ‘চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ড’ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে একটি কর্মসম্পাদনে সহায়তার লক্ষ্যে কমিটি করা হয়, যা তখন থেকে বোর্ডের পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসায় প্রথমবারের মতো এমডি পদ সৃষ্টি করা হয়। এ পদে নিয়োগ পান আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ। দীর্ঘ ১৪ বছর দায়িত্বে থাকার পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাকে অপসারণ করা হয়। পরের বছরের ২৪ মার্চ প্রথমবারের মতো এমডি নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এরপর থেকে পদটি নিয়ে নানা নাটকীয়তা শুরু হয়। এ পর্যন্ত সে বিজ্ঞপ্তি চার দফা সংশোধন করা হয়। প্রতিবারই নতুন করে শর্ত যোগ করে সংস্থাটি, যা ফের বিতর্কের মুখে ফেলে সংস্থাটিকে।

সবশেষ এমডি নিয়োগ নিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে দেখা যায় আরেক নাটকীয়তা। রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (চট্টগ্রাম ওয়াসা) ওয়েবসাইটে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী শওকত মাহমুদকে নিয়োগের খবর জানানো হয়। রাতেই তার নিয়োগের প্রজ্ঞাপনপত্র ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে সন্দ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করে অভিনন্দনও জানান। তবে দুই ঘণ্টা পর সে নিয়োগ বাতিল করা হয়। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখার উপসচিব রফিকুল হক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে নিয়োগটি বাতিলের কথা জানানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, এমডি পদে নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জল্পনা-কল্পনা চলছে। মঙ্গলবার রাতে হওয়া নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা করছেন ওয়াসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া দেশের কোনো ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলীকে অন্য ওয়াসায় সরাসরি এমডি পদে নিয়োগের নজিরও নেই।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মনোয়ারা বেগমকে কল দেওয়া হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মসম্পাদনে সহায়তা কমিটির আহ্বায়ক সামছুল হক জানান, আমি মনে করি না নিয়মিত এমডি না থাকায় কোনো জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আমি সবকিছু নিয়মিত মনিটরিং করছি। নগরীতে যেন পানির সমস্যা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখছি। তবে এরকম একটি সংস্থায় নিয়মিত একজন এমডি নিয়োগ হোক, সেটা আমরা সবাই চাই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী জানান, এভাবে কোনো সংস্থা চলতে পারে না। নিয়োগ যেহেতু একবার হয়েছে, নিশ্চয়ই নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে। সেটি আবার বাতিল করা জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। নতুন সরকারের কাছে এমন সিদ্ধান্তহীনতা কাম্য নয়। আমরা আশা করব নতুন সরকার যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে জনকল্যাণে দক্ষ, যোগ্য এমডি নিয়োগ দিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে সমৃদ্ধ করে।