Image description
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

মুনাফায় কাটছাঁট বা ‘হেয়ারকাটে’ ঝুলে আছে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ভাগ্য। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হেয়ারকাট সিদ্ধান্ত বাতিল চান ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। তারা বলছেন, সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দেওয়া এই সিদ্ধান্ত মানি না। টাকা কিছু দিন পরে দিলেও চলবে। কিন্তু মুনাফা কেটে নেওয়া সহ্য করা হবে না। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হেয়ারকাট প্রত্যাহার করে নিলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে পারে। নইলে এই ব্যাংক জীবনেও ঘুরে দাঁড়াবে না। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা পাবেন না। মুনাফায় এই কাটছাঁটের সিদ্ধান্তকে ‘হেয়ারকাট’ হিসাবে অভিহিত করা হচ্ছে।

একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংক হলো-ইউনিয়ন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। পাঁচ ব্যাংকের সমন্বয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হেয়ারকাট প্রত্যাহার চেয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আমানতকারীরা। এসব ব্যাংকের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য প্রথমে সব শেয়ারে শূন্য মুনাফা ঘোষণা করা হয়। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে ব্যক্তি আমানতের ওপর ৪ শতাংশ করে মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাচ্ছেন না।

পাঁচ ব্যাংকে বসানো প্রশাসকরাও এই হেয়ারকাট প্রত্যাহার চান। এ নিয়ে তারা কয়েক দফায় বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ মুনাফা কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার ছাড়া আমানতকারীদের আস্থা পাওয়া যাবে না। আর আস্থার সংকট থাকলে এই ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, হেয়ারকাট প্রত্যাহারে আলোচনা আছে কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান যুগান্তরকে বলেন, হেয়ারকাট প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক্সিম ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে যাবে এক্সিম ব্যাংক। কিন্তু সমস্যা একটাই-হেয়ারকাট। শুধু এ কারণেই আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না সাধারণ আমানতকারীরা। হেয়ারকাট বাতিল করা এখন সময়ের দাবি।

এদিকে শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আইটি ইন্ট্রিগেশনসহ একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকে নিয়োগ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসক ও সহযোগীদের নিয়ে বৈঠক করে এ নির্দেশনা দিয়েছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এ সময় গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসাবে একীভূতকরণ দ্রুত সম্পন্ন করার বিকল্প নেই। ১৫ মার্চ গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, বৈঠকে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক ও তাদের চারজন করে সহযোগীর সঙ্গে এ বৈঠক করেন গভর্নর। সেখানে তিনি ব্যাংকগুলোর আইটি ইন্ট্রিগ্রেশন কেন দেরি হচ্ছে সে বিষয়ে জানতে চান। কর্মকর্তারা ব্যাংকগুলোর আলাদা আলাদা ডেটা একত্রিত করতে এ সময় দরকার হচ্ছে বলে জানান। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত কোনো কোনো কর্মকর্তা বলেন, একীভূতকরণ চলমান থাকবে কিনা এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। জবাবে গভর্নর বলেন, সরকার এরই মধ্যে নতুন এই ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে। আমানত বিমা তহবিল থেকে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। ফলে যত দ্রুত সম্ভব পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। একীভূতকরণ থেকে পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।

এর আগে ৩ মার্চ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের নিয়ে বৈঠক করেন গভর্নর। বৈঠকে শিগগিরই এই ব্যাংকের এমডি নিয়োগ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। আর প্রশাসকদের যথানিয়মে কাজ চালিয়ে যেতে বলেন। যে কোনো উপায়ে এসব ব্যাংকের ঋণ আদায় জোরদার করতে বলেন। একই সঙ্গে পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে পরিচালিত যেসব কারখানার অস্তিত্ব রয়েছে তা বন্ধ হয়ে থাকলে চালুর উদ্যোগ নিতে বলেন।

দীর্ঘদিন আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে এসব ব্যাংকের আইটিসহ সবকিছু একীভূত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসক দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংকে একজন প্রশাসক ও তাকে সহযোগিতার জন্য আরও চারজন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা সবাই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বে। বাকি চার ব্যাংক চলত এস আলমের কর্তৃত্বে। ব্যাংক একীভূতকরণ শুরুর পর থেকেই আগের মালিকরা নানা বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেন।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর আমানতকারীদের বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে। পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। এসব আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের মধ্যে ৭৭ শতাংশ এখন খেলাপি।

দীর্ঘদিন আমানতের টাকা তুলতে না পারলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পর ১ জানুয়ারি থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরতের ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩০ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত বিশেষ স্কিমের আওতায় আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে এ অর্থ দেওয়া হচ্ছে। গভর্নর পরিবর্তন হলেও আমানতকারীরা একই নিয়মে টাকা পাচ্ছেন। দুই লাখ টাকার বেশি যাদের জমা আছে তারা পরে প্রতি ৩ মাস পর এক লাখ টাকা করে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। আর কিডনি ডায়ালাইসিস ও ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রয়োজনীয় যে কোনো পরিমাণের অর্থ তুলতে পারবেন।