Image description
নিরাপদ রুট জাফলং

সিলেটের জাফলং সীমান্ত দিয়ে তরুণীদের ভারতে পাচার নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ঈদের আগের দিন স্থানীয় নকশিয়া পুঞ্জিতে দুই তরুণীকে আটকের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা আরও বেড়েছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে পাচার হওয়া এসব তরুণীর মধ্যে অনেকেই দেশে ফেরেন, আবার অনেকেই চিরদিনের জন্য হারিয়ে যান।

পর যখন বাংলাদেশের অনেক নাগরিকদের ভারত থেকে ধরপাকড় করে বাংলাদেশে পাঠানো হয় সেখানে অনেক তরুণী ছিলেন। ফের আসা এসব তরুণীরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অবর্ণনীয় নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন গণমাধ্যমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে। কাজের কথা বলে তাদের ভারতের দিল্লি, মুম্বইসহ কয়েকটি শহরে নিয়ে গিয়ে জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এতে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ দেশের পথও হারিয়ে ফেলেন। ২০২৪ সালে শেষ দিকে ভারত থেকে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে পুশইন করা এক তরুণী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন- বাংলাদেশের বহু তরুণীকে কাজের কথা বলে ভারতে পাচার করা হয়। যাদেরকে পাচার করা হয়েছিল তাদের বেশির ভাগকেই বলা হয়েছিল পার্লারে কাজ দেবে। এরপর তাদের জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। তার দেখা অনেক তরুণী ভারতে এভাবেই জীবনযাপন করছে বলে জানান ওই তরুণী। বলেন- কাজের সন্ধানে যাওয়া ওই তরুণীরা অনেকেই বাড়ি ফেরার রুটও ভুলে গেছেন।

একে তো তারা অবৈধ, তার ওপর জিম্মি। ফলে তাদের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। পর্যায়ক্রমে তাদের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে সিলেটের জাফলং সীমান্ত যেন তরুণী পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। ঈদের আগের দিন শুক্রবার সকাল ৮টা। নির্জন নকশিয়া পুঞ্জির মন্দিরের সীমান্ত রুট দিয়ে একটি মোটরসাইকেল যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল স্থানীয় পান্থুমাই এলাকার জয়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আফছার। সঙ্গে দুই তরুণী মিনারা খাতুন ও ইতি তাইনি। তাদের বয়স ২২ থেকে ২৪’র মধ্যে। মোটরসাইকেলটি দ্রুত গতিতে সীমান্ত পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। দৃশ্যটি চোখে পড়ে স্থানীয়দের। অচেনা যুবক, যুবতীদের আনাগোনা তাদের কাছে সন্দেহ হয়। সীমান্ত এলাকার কাছে যেতেই স্থানীয়রা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কেন এসেছেন, কোথায় যাচ্ছেন- সেটি তারা প্রথমে স্পষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি। পরে তারা পার্শ্ববর্তী বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যদের খবর দেন। তারা এসে তাদের আটক করে। তবে বিজিবি’র জিজ্ঞাসাবাদে ইতি ও মিনারা দু’জনই স্বীকার করে, তারা কাজের সন্ধানে ভারতে যাচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ দেখা দেয় স্থানীয়দের মধ্যে। সীমান্ত ব্যবহার করে তরুণীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া নিয়ে তারা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়ে।

গোয়াইনঘাটের মধ্যজাফলং ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও খাসিয়া পল্লির বাসিন্দা কার্তিক বংসাই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- অনেকদিন ধরে আমরা খবর পাচ্ছিলাম যে সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে তরুণীদের পাচার করছে। সকালে নদীর রাস্তা দিয়ে ভারতে যাওয়ার সময় দুই তরুণীসহ এক পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। খবর পেয়ে সেখানে যান আরেক ইউপি সদস্য কামাল আহমদ। ঘটনায় তিনিও ক্ষোভ ঝাড়েন। কামাল মেম্বার মানবজমিনকে জানান- শুধু এই রুট নয়, পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম জাফলংয়ের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে একটি চক্র ভারতে মানব পাচারের নামে তরুণীদের পাচার করে আসছে। এলাকায় ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি মানব পাচারকারী চক্র রয়েছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে কামাল জানান- ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি এ পর্যন্ত মানব পাচারকারীসহ ২৮ জনকে বিজিবি’র হাতের তুলে দিয়েছেন। শুক্রবার গ্রেপ্তার হয়েছে পান্থুমাই গ্রামের আফসর। এর আগে বিভিন্ন সময় মানব পাচারকারী শাহীন, সাব্বির, নজিরসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পরই এরা জামিনে বেরিয়ে এসে ফের পাচার কাজ শুরু করে। এজন্য প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কামাল মেম্বারসহ জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন- আমস্বপ্ন, নলজুড়ি, প্রতাপপুর, হাজীপুর, পান্থুমাইসহ কয়েকটি এলাকা থেকে তরুণীদের ভারতে পাচার করা হয়। এসব বিষয় তারা জানলেও প্রশাসন কঠোর না হওয়ায় ওই চক্রের স্থানীয় চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। আটক হওয়া তরুণী মিনারা ও ইতি প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছে- ঢাকার ড্যান্সক্লাবের স্বত্বাধিকারী সাগর আহমদ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে ২৮ হাজার টাকা চুক্তিতে ভারতে পাচার করে দেয়ার জন্য তাদের জাফলং সীমান্তে আনা হয়েছে। ওখানে তাদেরকে পার্লারের কাজ দেয়া হবে বলে সাগর নিশ্চিত করে। এরপর ঢাকা থেকে গাড়িযোগে তারা জাফলং বাজারে আসেন।

সেখান থেকে মোটরসাইকেলযোগে আফসর তাদের সীমান্তে নিয়ে আসে। পাচারকারী আফসর জানিয়েছে- সে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ভারতে পাচারের কাজে নিয়োজিত হয়। ঢাকা থেকে তার সঙ্গে কনট্রাক্ট করে ওই তরুণীদের জাফলং পাঠানো হয়। বাসস্ট্যান্ড থেকে সে ওই তরুণীকে রিসিভ করে বলে জানায়। সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান মানবজমিনকে জানিয়েছেন- বিজিবি’র পক্ষ থেকে তিনজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করার পর মানব পাচার মামলা হয়েছে। মানব পাচার চক্রে কারা জড়িত, পেছনে কারা সব বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে বলে জানান তিনি। সিলেটের ৪৮ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানিয়েছেন- সীমান্তে টহল জোরদার রয়েছে। একটি চক্র জাফলংয়ে থাকতে পারে, যারা মানব পাচার করছে। তিনি বলেন- বিজিবি’র কাজ হচ্ছে আটক করে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা, আইনি ব্যবস্থা নেয়া। এর পেছনে কারা জড়িত কিংবা স্থানীয়ভাবে কারা জড়িত সেটি তদন্তকালে দেখার দায়িত্ব বলে জানান তিনি।