Image description

স্বাস্থ্যসেবা একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা ও মানবিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল নাগরিকের জীবনমানকে স্পষ্টভাবে উন্নত করে। আর সেই জীবনমানের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষের স্বাস্থ্য। তাই একটি কার্যকর, সহজলভ্য এবং আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রতিটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

 

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য, গ্রামীণ পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন—এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে।

 

তবে এই সাফল্যের পরেও বাস্তবতা হলো, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো অনেক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো জনগণকেই নিজস্ব আয়ে বহন করতে হয়। গবেষণা ও নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি জনগণের পকেট থেকে ব্যয় হয়। এর ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের নতুন চক্রেও আটকে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সমন্বিত, কার্যকর এবং নাগরিকবান্ধব করে তোলার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগগুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই ধারাবাহিকতায় ই-হেলথ কার্ড উদ্যোগকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি সম্ভাবনাময় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সমন্বিত কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাধারণত তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়—প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং তৃতীয় স্তরের চিকিৎসা ব্যবস্থা। গ্রামীণ পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি তৈরি করে। অন্যদিকে জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে।
কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য দেখা যায়।

শহরাঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত চিকিৎসা সুবিধা তুলনামূলক বেশি থাকলেও গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক সংকট, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। একজন রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট বা ওষুধের তথ্য বিভিন্ন হাসপাতালে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত থাকে। ফলে রোগী নতুন কোনো হাসপাতালে গেলে চিকিৎসককে অনেক সময় নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এতে রোগীর সময়, অর্থ এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়া—সবই প্রভাবিত হয়।

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। আর সেই প্রক্রিয়ায় ই-হেলথ কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

ই-হেলথ কার্ড মূলত একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র, যেখানে একজন নাগরিকের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এতে রোগীর নাম, বয়স, রক্তের গ্রুপ, পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস, ওষুধের তথ্য, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং টিকাদান সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের যেকোনো হাসপাতালে রোগীর স্বাস্থ্য তথ্য দ্রুত দেখা সম্ভব হবে। ফলে চিকিৎসক সহজেই রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাবেন এবং দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ডিজিটাল এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে একটি কার্যকর রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ফলে একজন রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে প্রয়োজনে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রেফার হতে পারবেন। এতে চিকিৎসা প্রক্রিয়া আরও কার্যকর, দ্রুত এবং সমন্বিত হবে।

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন এবং স্বাস্থ্য তথ্যভান্ডার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে।
বাংলাদেশও “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ধারণার মাধ্যমে প্রশাসন, শিক্ষা, আর্থিক খাত এবং সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। এখন সেই ডিজিটাল রূপান্তর স্বাস্থ্য খাতেও বিস্তৃত করার সময় এসেছে।

ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইউনিক হেলথ আইডি তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে রোগ প্রতিরোধ, গবেষণা এবং স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার তৈরি হবে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।

বাংলাদেশের একটি বড় অংশ এখনো গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। সেখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ সহজেই স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসতে পারবেন। ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো রোগীর তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।
ভবিষ্যতে টেলিমেডিসিন ও মোবাইল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে এই কার্ড যুক্ত করা গেলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শও সহজে পেতে পারেন।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র বা ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড চালু করেছে। ইউরোপের অনেক দেশে নাগরিকদের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য ডাটাবেস রয়েছে, যেখানে প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে।
ভারতও “ডিজিটাল হেলথ আইডি” কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য একটি স্বাস্থ্য আইডি চালু করেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ল্যাবরেটরিগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।

তবে ই-হেলথ কার্ড উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
দেশের সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা একটি বড় প্রযুক্তিগত কাজ। পাশাপাশি স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি।

একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত পরিমাপ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে হয় না; বরং নাগরিকরা কতটা সহজে, দ্রুত এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন—তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি এই উদ্যোগকে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা হবে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং সমতাভিত্তিক।
অর্থাৎ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা ঠিক ততটাই সহজে পাবেন, যতটা একটি বড় শহরের নাগরিক পান।
সুতরাং একথা বলতেই হবে যে, ই-হেলথ কার্ড সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ । 

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]