রংপুরের পীরগঞ্জের ৪২ বছর বয়সী ফারুক মিয়া একজন সাধারণ ট্রাক চালক। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের ন্যায় তিনি ট্রাকে করে গরু বহন করছিলেন। কিন্তু চলতি মাসের ২০ তারিখটা ছিলো তার জন্য বিভীষিকাময় একটা দিন। এদিন ভোর সাড়ে চারটায় সাভারের বরইতোলা এলাকায় ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। ছিনতাইকারীরা তার ওপর হামলা চালায় এবং বাম বুকে ছুরিকাঘাত করে ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকেন ফারুক মিয়া জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকরা তার অবস্থার গুরুতরতা বুঝে হৃদপিণ্ডে রক্ত জমে যাওয়ার আশঙ্কা (কার্ডিয়াক টেম্পোনেড) সন্দেহ করেন এবং দ্রুত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (NICVD) রেফার করেন। সেখানে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তাকে কার্ডিয়াক আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তখন তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন—রক্তচাপ প্রায় অদৃশ্য, শরীরে জ্বর, কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ইতোমধ্যে হার্ট অ্যাটাক (অ্যান্টেরোল্যাটেরাল MI) শুরু হয়েছে। কিছু সময়ের জন্য ওষুধ ও তরল দিয়ে তার অবস্থা সামান্য স্থিতিশীল করা গেলেও তা ছিল খুবই অনিশ্চিত।
ঠিক এই কঠিন মুহূর্তে সামনে আসে দূরদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। ঈদের দীর্ঘ ছুটি সামনে রেখে হাসপাতালের মাননীয় পরিচালক আগেই একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম প্রস্তুত রেখেছিলেন, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়। সেই প্রস্তুতিই হয়ে ওঠে ফারুক মিয়ার জীবনের আশার আলো। সেই সময় হাসপাতালে পরিদর্শনে আসেন মাননীয় মহাপরিচালক (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, যিনি নিজেও একজন দক্ষ কার্ডিয়াক সার্জন। রোগীর অবস্থা শুনে তিনি দ্রুত আইসিইউতে ছুটে যান, নিজে রোগীকে দেখেন এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করে দেন। তার নির্দেশ ছিল—যখনই রোগীর অবস্থা সামান্য স্থিতিশীল হবে, তখনই অপারেশনে যেতে হবে।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে থাকে। শেষ চেষ্টা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে। অপারেশন থিয়েটারে শুরু হয় এক সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই। অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার রাহা ও তার টিম, অ্যানেসথেটিস্ট, পারফিউশনিস্ট, নার্স ও টেকনিশিয়ান সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়েন একটি জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে।
অপারেশনের সময় দেখা যায়, হৃদপিণ্ডের চারপাশে (পেরিকার্ডিয়াল ক্যাভিটি) জমে আছে রক্তের জমাট এবং ছুরিকাঘাতে হৃদপিণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী—LAD (Left Anterior Descending artery) মাঝামাঝি অংশে সম্পূর্ণ কেটে গেছে। এটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও জীবননাশক আঘাত। চিকিৎসকরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জমাট রক্ত পরিষ্কার করেন, ক্ষতস্থান মেরামত করেন এবং পরে LIMA to LAD পদ্ধতিতে একটি বাইপাস সার্জারি (CABG) সম্পন্ন করেন।
বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা, টানা প্রায় ছয় ঘণ্টার নিরলস প্রচেষ্টার পর অবশেষে সফলভাবে অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশন শেষে ফারুক মিয়াকে আবার কার্ডিয়াক আইসিইউতে নেওয়া হয়, তখন তার হেমোডাইনামিক অবস্থা স্থিতিশীল—যা একপ্রকার অলৌকিক পরিবর্তন।
এই গল্প শুধু একটি অপারেশনের সাফল্যের গল্প নয়—এটি মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। একজন গরীব ট্রাক চালক, যার বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাকে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন আল্লাহর রহমতে এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত, এবং চিকিৎসকদের অসাধারণ দক্ষতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে।
শীর্ষনিউজ/