Shahin Siddiquee শাহিন সিদ্দিকী
আমার ছোট মেয়ের এক বান্ধবী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। চাইনিজ অরিজিন, কানাডাতেই জন্ম।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো’র প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ভাবতেই পারিনি এত দ্রুত ওর ভিতরটাতে কত পরিবর্তন ঘটে গেছে!
হাই স্কুল থেকেই ওরা বেশ ঘনিষ্ঠ। পড়ালেখা, এসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট, হ্যাংগআউট, দুনিয়ার কাজ দু’জন এক সাথেই করে। প্রায়শঃ আমি ওদেরকে পিক-আপ, ড্রপ অফ করি। গাড়ীর মধ্যের সময়টুকুতে অনেক কথা হয়। কোন একদিন গাড়ীতেই মেয়েকে বলি, ও যদি কখনো মুসলিম হয়ে যায়, তাহলে এক দূর্বোধ্য, কমপ্লিকেটেড, ক্লোজড কমিউনিটিতে পেনিট্রেট করতে পারবা। ইসলামের নূর হয়তো ওর মাধ্যমেই একদিন ওদের কমিউনিটিতে প্রসারিত হতে পারে।
ওই মেয়েটির বাবা একদমই রিলিজিয়াস না, মা বুড্ডিস্ট টেম্পলে যায়, ও নিজে এথেইস্ট- কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না।
গত ডিসেম্বরে RIS Convention-এ ও আমাদের সাথে নিছক কৌতুহল বশত যায়। তিন দিনের দুইদিন শনি ও রবিবার প্রত্যেকটা লেকচার মেইন হলরুমে বসে মনযোগ সহকারে ও এঞ্জয় করে। বিরতিতে বাজারেও সে যায় না।
হয়তো তখনই মনের সাথে ওর যুদ্ধ শুরু হয়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বিখ্যাত স্পিকারদের জ্ঞান-গর্ভ আলোচনা ওকে স্পর্শ করে। বলে, এভরেথিং মেকস সেন্স, ইটস আ্যমাজিং।
আরো বলে, “আহ্! আমি যদি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিতাম!”
পরিবর্তন শুরু হয়।
ড: মোস্তফা খাত্তাবের “দ্যা ক্লিয়ার কুর’আন” পড়া শুরু করে। পড়তে গিয়ে এটা-ওটা জানতে চায়। বেশী সময় নেয় না। একদিন দুই বান্ধবী ইউনি’র MSA-র Muslim Awareness Event-এ হাঁটতে হাঁটতে এক বুথে যায়। সেখান থেকেই আমার মেয়ের মেসেজ, "বাবা, হিবি টুক শাহাদাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আই ক্যান্ট বিলিভ ইট।”
আমরা তখন বাসায় বিকেলের চা খাচ্ছিলাম। সবাই চিৎকার করে বলে উঠি ‘আলহামদুলিল্লাহ’। সুবহানাল্লাহ, এত দ্রুত!
মুহুর্তেই আমি আমার পুরনো স্মৃতিতে ফিরে যাই। প্রায় ৩৮ বছর আগে আমরা তখন এডওয়ার্ড কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। ওদের মতই বয়স হবে। আমার ছোট-বেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রকিব ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। পাবনা জেলা কোর্টে গিয়ে ওর নাম নারায়ণ চন্দ্র কার্তিক থেকে পরিবর্তন করা হয় আব্দুর রহমান রকিব (এখন ডক্টর, আর এই রকিব নামটা আমারই দেয়া)। আমরা যখন কিনা ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখনই ও শাহাদাহ নেয়, কিন্তু ঘোষণা করা হয় এখন। বাতাসের গতিতে কোর্টের খবর গ্রামে চলে যায়। যুদ্ধ শুরু হয়। কোর্ট থেকে কলেজ হোস্টেলে ফেরত আসতে যত না দেরি, তার আগেই বাড়ি থেকে ওর মেঝদা আর দুলাভাই চলে আসে আমাদের রুমে। আমি ওকে একা ছাড়ি না। বলি, আমিও তোর সাথে যাব। মারলে দুইজনকেই মারবে!
এরপরে কত ঘটনার সাক্ষী আমি! ওর বড়দা’ রামদা নিয়ে আসে “অচ্ছুৎ” রকিবকে জবাই করতে। রামদা দিয়ে শুরু, আর শেষ হয় রাতের আঁধারে একদিন পুরো পরিবারের দেশ ত্যাগ।
এই দেশে রকিব একা, বাবা-মা ভাইবোন থেকেও নেই। অবস্থা সম্পন্ন কুলীন পরিবারের সন্তান হয়েও আজ ও কপর্দকশুন্য। ইসলামই ওর একমাত্র সাথী, ইমানই ওর পাথেয়। তরুণ বয়সে পৃথিবীতে এক ভিন্ন অধ্যায়ের সূচনার নায়ক রকিব। কত কাল-বৈশাখীর ঝড় ওর জীবনে এসেছে, পাহাড় টললেও রকিব টলেনি। চোখের কোণে সামান্যতম পানিও দেখিনি। আজ ও প্রতিষ্ঠিত, বেসরকারি এক ইউনিভার্সিটির টিচার। দুইজন ব্রাইট ছেলেমেয়ে ওদের, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। অসাধারন মেধার অধিকারী।
আমি হিবি’র মানসিক অবস্থা বুঝার চেষ্টা করি।
মেয়েকে বলি, ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু কাম?
“নো বাবা, নট নাউ, শি ইজ ক্রায়িং” মেয়ে উত্তর দেয়।
ওরা সেটেল হয়।
জানতে চাই, হাউ শি ইজ ফিলিং?
হিবি জানায়, দ্যা হোল ওয়ার্ল্ড লুকস ডিফ্রেন্ট টু মি।
হিবি খুব দ্রুত সব রপ্ত করে ফেলছে। সুরা ফাতিহা, এখলাস, কাউসার শেষ করে এখন নাস মুখস্থ করছে। কুরআন পড়া শিখছে। নামাজ পড়ছে, রোযা রাখছে প্রত্যেকদিন। তারাবীহতে মসজিদে যাচ্ছে আমাদের সাথে।
মেয়ে বলে, মনে হচ্ছে শি ইজ মুসলিম বাই বর্ন।
প্রথম রাতে ইমামের সুললিত কন্ঠে তেলাওয়াত শুনে সে কেঁদে ফেলে।
বললাম, এইটাই মুমিনের পরিচয়। কোরআন শুনে তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, তাদের চক্ষু বিগলিত হয়। কোরআনেই এসব বলা আছে। এসব শুনে ও বিষ্মিত হয়।
আমার দুই মেয়ে আর ওদের সব বান্ধবীরা এক সাথে মসজিদে যায়, হ্যাংগআউট করে, ওকে কমফোর্ট দেয়।
আমি ওকে রকিবের গল্প শোনাই। এক জেনারেশন থেকে আরেক জেনারেশনের ইতিহাস ট্রান্সফার করি। ও অবাক হয়। ও মাই গড, দে ওয়ান্টেড টু কিল হিম? হিজ ওউন ব্রাদার্স? হোয়াট!
সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্ব তো ওর কাছে এখনো পক্কতা পায়নি।
আমার আব্বা যেমন রকিবকে ওই দু:সময়ে বলেছিল, আমিও সেরকম ওকে বলি, এইটা তোমার সেকেন্ড হোম। যেকোনো সময় আমরা তোমার সাথে আছি।
প্রসংগ পাল্টাই। জিজ্ঞেস করি, ইসলামের কোন জিনিস তোমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে?
চিন্তা না করেই ও উত্তর দেয়: ‘সুজুদ।’
দোয়া তাকে চমৎকৃত করে।
বলি, “এক্সাক্টলি। নামাজের সমস্ত প্রস্তুতিই যেন শুরু হয় সিজদাকে কেন্দ্র করে। তুমি নিজেকে একান্তভাবে সঁপে দাও স্রষ্টার কাছে। মনে হয়, আমি যেন আমার বডিটাকে নিউট্রোলাইজ করছি, আর্থিং করছি আমার মাথাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে।”
“সিজদায় কি চাও?”
ইনোসেন্ট মেয়ে জবাব দেয়, “গুড গ্রেড!”
“আর কী চাও? বাবা-মা’র জন্য দোয়া করো?”
বলে, হ্যাঁ, ফর দেয়ার ওয়েল বিং।
জিজ্ঞেস করি, “আর কি ভাল লাগে?”
“সকালের নামাজ, স্পেশালি ওযু” ও উত্তর দেয়।
আমি অবাক হই। এই ফজরের নামাজ ও অযু অসংখ্য মুসলমানের জন্য পীড়াদায়ক। ছোটবেলায় এমনদিনও গেছে আমার গ্রামের মসজিদে ফজরে আমি আর ইমাম সাহেব- আমার মাওলানা নানা! পুরো গ্রামের আর কেউ নাই!
ওরা তিনজন একসঙ্গে ইফতার করে, ঈদের শপিং করে, খুনসুটিতে মেতে ওঠে। ঈদে কি কি করবে তার প্ল্যান করে। আমি তাকিয়ে থাকি। তিনজনের ভিতরে শি লুকস এন্টারলি ডিফ্রেন্ট বাট গোল সেইম।
নতুন এক জেনারেশনের স্বপ্ন দেখি। হিবির ভিতরে কল্পনায় আঁকি মোঙ্গলীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রচন্ড শক্তিধর মামলুকসম নতুন এক জেনারেশনের উত্থান, নতুন উপাখ্যানের আবির্ভাবের সূচনা হিসেবে।