এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘ ছুটি পেয়েছেন। ১৮ মার্চ নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণার ফলে টানা ৭ থেকে ১২ দিনের ছুটির সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সময় নিয়ে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি ফেরার আহ্বান জানানো হলেও, এক শ্রেণির যাত্রী ও চালকের অস্থিরতা, খামখেয়ালি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এবারের ঈদযাত্রা রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। সড়ক, রেল ও নৌ— কোনও পথই এখন পর্যন্ত পুরোপুরি নিরাপদ প্রমাণিত হয়নি।
লম্বা ছুটি পাওয়ার পরও ঈদযাত্রায় কেন এত অস্থিরতা— এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
অস্থিরতা ও দুর্ঘটনার নেপথ্যে
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের ঢাকা ছাড়ার চাপ, যানবাহনের সংকট এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী ও তাদের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সপরিবারে মোটরসাইকেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এক ধরনের ‘খামখেয়ালি’, যা এই মর্মান্তিক পরিণতির জন্য দায়ী।
একইভাবে বুধবার (১৮ মার্চ) বগুড়ার শেরপুরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এক পরিবারের ৩ জন নিহত হয়েছেন। ওই দিন বিকালেই সান্তাহারে ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হন। রেললাইনে কাজ চলাকালীন সতর্ক সংকেত অমান্য করে ট্রেন প্রবেশ করায় এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এ ঘটনায় স্টেশন মাস্টার ও চালককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
নৌপথেও অব্যবস্থাপনা
সদরঘাটে ট্রলার দিয়ে লঞ্চে ওঠার সময় দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে দুই যাত্রীর মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছে। সদরঘাটের ভিড় এড়াতে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সংলগ্ন টুরিস্ট ঘাট এবং বছিলায় বিকল্প টার্মিনাল স্থাপন করা হলেও অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি। যাত্রীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় জীবন ঝুঁকি নিয়ে তারা ট্রলারে করে লঞ্চে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, “সরকারের উদাসীনতা, কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালি এবং যাত্রীদের অস্থির মানসিকতা— এই তিনের সমন্বয়েই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুগুলো ঘটছে।”
সায়েদাবাদ বাসটার্মিনালে কক্সবাজার যাওয়ার গাড়ির জন্য অপেক্ষারত যাত্রী মকবুল হোসেন জানিয়েছেন, সরকার, পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং যাত্রী উভয়কেই সতর্ক হয়ে ঈদযাত্রা করতে হবে। এ সময় যেকোনও অস্থিরতা বড় ধরণের অমঙ্গল ডেকে আনবে। পরপর কয়েকটি ঘটনা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।”
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, “ঈদযাত্রা আনন্দময় করতেই ১৮ মার্চ ছুটি দিয়ে টানা ৭ থেকে ১২ দিনের ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেকে তো বাড়তি দুদিনের ছুটি নিয়ে ১২ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন। সুতরাং এবার তাড়াহুড়ো করার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই।”
সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম প্রতিদিন টার্মিনাল ও স্টেশন পরিদর্শন করছেন। তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার। আমরা সবাইকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের অনুরোধ জানাচ্ছি। আর চেষ্টা করছি ঈদযাত্রা আনন্দময় করতে।”
মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও ছোট যান চলাচল বন্ধে পুলিশের বিশেষ নজরদারি থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিরাপদ ঈদযাত্রার জন্য যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট— উভয় পক্ষকেই আরও ধৈর্যশীল ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকার ও বিশেষজ্ঞরা।


