হজ মৌসুমে সৌদি আরবে বাংলাদেশি হাজীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সমন্বয়ে ১৮০ জনের ‘সমন্বিত হজ চিকিৎসক টিম’ গঠন করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে দুটি পর্যায়ে এই টিমের সৌদি আরবে উড়াল দেওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে টিমের সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে কেবল ভিসা অনুমোদন। এমন সময়ে হঠাৎ করেই টিম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ১০ চিকিৎসকসহ মোট ২৩ জনকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কারণ ছাড়াই শেষ মুহূর্তে এই ২৩ জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে বিএনপিপন্থী চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও টেকনোলজিস্টদের টিমে ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে বিস্মিত বাদ পড়া সদস্যরা। তারা বলছেন, বিএনপি সরকারের শুরুতেই হজ চিকিৎসক টিমের মত সম্মানজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিকে দলীয়করণ করছেন যুক্ত কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেডিকেল টিমের সদস্যদের সাধারণত রাষ্ট্রীয় খরচে হজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। খুব ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে কেউ বাদ হজ থেকে বাদ পড়েন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সুবিধাও পান তারা। এর মধ্যে চিকিৎসকদের প্রত্যেককে ১২ লাখ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮ লাখ টাকা করে ভাতা দেয় সরকার। সৌদি আরব যাওয়ার আগেই এর এক-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করা হয়। ফলে ২৩ জনকে বাদ দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি আর্থিক সুবিধাও জড়িয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, গত বছরের ২৩ নভেম্বর সমন্বিত চিকিৎসক দলের সদস্য মনোনয়নের জন্য নাম আহ্বান করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় ধর্ম মন্ত্রণালয়। ২৫ নভেম্বর নাম আহ্বান করে অধস্তন দপ্তরে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরে ২১ ডিসেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ-২ শাখা থেকে উপসচিব মো. রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়। এতে ১৮০ জনের নাম রয়েছে, যদিও ২৩ নভেম্বরের পাঠানো পত্রের হিসাবে চিকিৎসক টিমের মোট সদস্য হওয়ার কথা ছিল ১৫৫ জন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ৮১, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ২৫, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৭, ইসলামিক মিশন হাসপাতালের ১৭, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ৮ এবং বাংলাদেশ সচিবালয় ক্লিনিকের সাতজন কর্মকর্তার থাকার কথা ছিল।
পরবর্তীতে গত ১৬ মার্চ পবিত্র ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে ঘোষিত ছুটির আগের শেষ কর্মদিবসে নতুন একটি জিও জারি করা হয়। এতে পূর্বে গঠিত টিমের সদস্যদের মধ্য থেকে ২৩ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়া সবাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী।
যাদের সঙ্গে ‘রদবদল’
দুটি জিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নতুন তালিকায় ১০ জন চিকিৎসক, ৪ জন নার্স, ৭ জন ফার্মাসিস্ট ও দুইজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বাদ পড়েছেন। বাদ পড়া চিকিৎসকরা হলেন— জামালপুর মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ডা. কাজী এজাজুল ফেরদৌস, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক (নিউরোফিজিওলজি) ডা. মো. মেরাজুল ইসলাম সেখ, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (রেসপিরেটরী মেডিসিন) ডা. মো. শফিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্টার (গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজি) ডা. তাসবীরুল হাসান জিহান, নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. নাহিদুজ্জামান, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) ডা. ওয়াসেক বিন শহীদ, অধিদপ্তরের উপপরিচালক (শৃঙ্খলা) ডা. মুহাম্মদ আবদুল কাদের, কুষ্টিয়া মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবদুল মোমেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ইমরান হোসেন ও কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার আবাসিক মেডিকেল অফিসার (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত) ডা. নুজহাত নাদিয়া।
বাদ পড়া নার্সরা হলেন— ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. মোশাররফ হোসেন ও সিনিয়র স্টাফ নার্স তৌকির আহমেদ, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আছমা আকতার ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শারমিন জাহান।
এ ছাড়া বাদ পড়া ৭ ফার্মাসিস্ট হলেন— টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট মুহাম্মদ আব্দুর রহমান, রাজশাহীর গোদাগাড়ী (প্রেমতলী) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট মো. সুমন আলী, সিরাজগঞ্জের খোকশাবাড়ী ১০ শয্যা বিশিষ্ট পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মো. আজমল হোসেন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট মো. আরশাফুল হক, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট মোহা. শামীম রেজা, বগুড়ার ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির ফার্মাসিস্ট মো. আব্দুর রউফ, রাজশাহীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির লেকচারার (ফার্মেসি) মো. আলাউদ্দিন। আর বাদ পড়া দুই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হলেন নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল মান্নান ও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটি অ্যাসিসটেন্ট আবদুল আজিজ।
পলিটিক্যালি ওনাদের লোক ঢুকানোর জন্য হয়ত আমাদেরকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমরা তালিকার অনেককে চিনি, যারা আওয়ামী লীগ করে, অনেকে আছে ওখানে। আবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতেরও আছে। তবে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়ত রাজনৈতিক মত দেখা হয়নি, জামায়াতপন্থীরাও যেমন বাদ গেছে, আমাদের মত সাধারণরাও বাদ গেছে। মূলত স্রেফ সরকারি দলের লোকজন ঢোকানোর জন্য এরকম র্যান্ডম বাদ দিয়েছে। কিন্তু এতে তো আমরা সাফারার হলাম। একটা মানুষকে এভাবে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসে বাদ দিতে পারে না— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স
এদিকে তালিকা থেকে তাদের বাদ দেওয়ার আগে গত ৯ মার্চ এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। ওই প্রস্তাবনায় বিদ্যমানদের বাদ দিয়ে ২৫ জনকে স্থলাভিষিক্ত করতে নাম প্রস্তাব করা হয়। নতুন স্থলাভিষিক্তদের তালিকায় বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সদস্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংগঠন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এম-ট্যাব) সদস্য ও বিএনপিপন্থী নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে পরিচিতিদের নাম রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী নতুন করে যুক্ত হতে যাওয়া চিকিৎসকরা হলেন— স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার (এমবিডিসি) ডা. আরিফুর রহমান, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহবুব আরেফিন রেজানুর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মশিউর রহমান সরকার, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিস্ট্রার (নিউরোলজি) সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জামিল আহমেদ, ঢাকা মেডিকেলের রেসিডেন্ট সার্জন (ভাস্কুলার সার্জারি) মঞ্জুরুল হাসান, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (শিশু বহিঃবিভাগ) সাখওয়াত হোসেন, একই মেডিকেলের অ্যানেসথেসিওলোজিস্ট মো. বাবুল হোসেন, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতলের সহযোগী অধ্যাপক মো. বন্দে আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের সহকারী সার্জন মোহা. শামসুল হক ও নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আমির-উল-মূলক।
তালিকায় যুক্ত হতে যাওয়া নার্সরা হলেন— কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাসলিমা আক্তার, সিরাজগঞ্জ শহীদ এম. মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মোছা. লতিফা হেলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ পারভীন, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মোছা. রেখা খাতুন।
ফার্মাসিস্টদের মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েয়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের মো. আসাদুল্লাহ মিয়া, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মো. আব্দুল কাদের ও মো. ফিরোজ হোসেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মো. মরতুজ আলী, লক্ষ্মীপুর জেলা সদর হাসপাতালের মো. জসিম উদ্দিন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের গোলাম ফারুক ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মো. শাহাদত হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মধ্যে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের (মিরপুর) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মোছা. মমতাজ আক্তার বানু, মহাখালীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইচটি) মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) মো. রুবেল আহমেদ এবং জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের অটোক্লেভ স্টাবিলাইজার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর আলমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
যা বলছেন বাদ পড়া স্বাস্থ্যকর্মীরা
বাদ পড়াদের তালিকা ধরে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। সরকারি কর্মচারী হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কয়েকজনকে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এই অর্ডারটা এখনও বের হয়নি। যাদের যুক্ত করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে তাদেরকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে যে আপনারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সম্ভবত একই সাথে আমাদের বাদ দিয়ে ওদের যুক্ত করা হলে সমালোচনাটা বেশি হত, তাই ওদেরকে এখনই যুক্ত করা হয়নি।
অপর এক চিকিৎসক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হঠাৎ করে অর্ডার রিভাইজ করেছে। কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি যে ঠিক কোন কারণে বাদ দিয়েছে। আমাদের বায়োমেট্রিক হল, আমাদের টিকা দিতে বলল, সবকিছু কমপ্লিট করতে বলল, সার্টিফিকেটগুলো এরাবিক করতে বলল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বাদ দিয়ে দিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে তালিকা হয়েছে, সেখানে গ্রামে-গঞ্জে চাকরিরত ও সুবিধাবঞ্চিতদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের হাসপাতাল অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব তালিকা চূড়ান্ত করেন। নতুন করে তালিকা পরিবর্তনের সময় কোনো কোনো কর্মকর্তা নতুন স্বাস্থ্য সচিবকে পরিবর্তন না করার অনুরোধ করেছিলেন— নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নার্স দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নভেম্বরে অ্যাপ্লিকেশনের পরে ডিসেম্বরে ওনারা সিলেক্ট করেছে আমাদের। সিলেক্ট করে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করছিল, ওখানে বিভিন্ন নির্দেশনা দিত। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি। উনারা বলে রেখেছেন যে আপনারা পাসপোর্টটা রেডি রাখেন, যেকোনো সময় আশকোনাতে জমা দিতে হবে। আমরা সে অনুযায়ী অপেক্ষায় আছি। সবকিছু রেডি। নিজেদেরকে ওভাবে প্রস্তুত করেছি। এখন হঠাৎ করে শেষ কর্মদিবসে নতুন জিও আসছে। একই সাথে আমাদেরকে সেই গ্রুপ থেকে রিমুভ করা হয়েছে। আমাদেরকে কোনো তথ্য জানায়ও নাই ওনারা, যে আসলে কেন আপনাদেরকে বাদ দিলাম বা এই সমস্যা হয়েছে। কিছু না বলে জিওটা গ্রুপে দিয়ে যারা বাদ পড়েছে, ওখান থেকে সবাইকে রিমুভ করেছে।
তিনি বলেন, পলিটিক্যালি ওনাদের লোক ঢুকানোর জন্য হয়ত আমাদেরকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমরা তালিকার অনেককে চিনি, যারা আওয়ামী লীগ করে, অনেকে আছে ওখানে। আবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতেরও আছে। তবে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়ত রাজনৈতিক মত দেখা হয়নি, জামায়াতপন্থীরাও যেমন বাদ গেছে, আমাদের মত সাধারণরাও বাদ গেছে। মূলত স্রেফ সরকারি দলের লোকজন ঢোকানোর জন্য এরকম র্যান্ডম বাদ দিয়েছে। কিন্তু এতে তো আমরা সাফারার হলাম। একটা মানুষকে এভাবে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসে বাদ দিতে পারে না।
ভেবেছিলাম, আল্লাহ মনে হয় কবুল করল আমাকে
বাদ পড়া চিকিৎসকদের একজন নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. নাহিদুজ্জামান। কেন বাদ দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। তবে বাদ দেওয়ার ঘটনায় নিজের অনুভূতি জানিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হজ মেডিকেল টিমে আমার পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এবারে ফার্স্ট টাইম আবেদন করছিলাম, সৌভাগ্যবশত সিলেক্টও হয়েছিলাম। ভালই লাগছিল। অনেক আশা নিয়ে সিলেক্ট হয়েছি যে এবার মনে হয় হাজীদের সেবা করতে পারব, ওখানে গিয়ে আল্লাহর ঘর তওয়াফ করতে পারব, রাসূলের (সা) রওজায় সালাম দিতে পারব, এই ছিল আশা। আমাদের তো নিজের তেমন খরচ নেই, সব সরকারি খরচে। কিন্তু আল্লাহর ঘর তাওয়াফের আশা থাকায় নতুন আদেশে দুঃখ পেয়েছি। তবে এটি তো সরকারি আদেশ।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আমি একজন হাফেজ। এরপর পড়াশোনা করে এ পর্যন্ত আসছি। প্রথমবার যখন সংবাদটা শুনেছি— আমার তো আর সামর্থ্য নাই যে আমি ওখানে যেতে পারব, তো এই জায়গা থেকে মানসিকভাবে একটা আশা তৈরি হয়েছিল যে আল্লাহ মনে হয় কবুল করল আমাকে। এইভাবে প্রিপারেশনও নিয়েছিলাম, রমজানে নিজেকে তৈরি করছিলাম, কিছু বই পড়াশোনা করছিলাম ওখানে কিভাবে কী করব। আমার অনেক সৌভাগ্য যে ওখানে আমি হাজী সাহেবদের সেবা করব, পাশাপাশি আমারও হজ করা একটা সুযোগ হবে। সরাসরি হজ্ব করার একটা বিষয়, পাশাপাশি হাজীদের সেবা করা, দুইটা একসাথে।
এ বিষয়টার সাথে আমি জড়িত না। কী হয়েছে আমি তা জানি না। তবে হজ টিম বদল হতেই পারে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা আদেশ দিয়েছিল, এর মধ্যে হয়তো বা ডিপার্টমেন্টে কোনটা বাদ করে থাকতে পারে। ডিপার্টমেন্ট হয়তো রিপ্লেস করে, যেটা স্বাভাবিক। রিপ্লেসমেন্ট হতেই পারে— সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী
তিনি বলেন, পরবর্তীতে যখন জিও আসে, আমার মানসিকভাবে এমন একটা বিধ্বস্ত অবস্থা, পুরো রাস্তায় কান্নাকাটি করতে করতে এসেছি। তারপরেও নিজেকে বুঝিয়েছি, আল্লাহ হয়ত আমাকে এখনো কবুল করেনি।
একজন চিকিৎসক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটা একজনের জন্য কী পরিমাণ জুলুম তা আসলে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরে অনেককে বলা হয়েছে, অনেকে বিদায় নিয়েছেন, মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন। তারপরও যদি দেখা যায় শুধুমাত্র দলীয় কারণে নাম থেকে বাদ গেছে, এটা আসলে অন্তরের ওপরে বিরাট আঘাত।
যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
এ বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. আয়াতুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এটা সরকারের যে সিদ্ধান্ত, সেই অনুযায়ী হয়েছে। এই মুহূর্তে আমি ডিটেইলস বলতে পারব না। অফিস খুললে গিয়ে দেখে বলতে হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয় এই অনুবিভাগের হজ-২ শাখা থেকে। উভয় আদেশে উপসচিব মো. রফিকুল ইসলামের সই রয়েছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে উপসচিব মো. রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, মেডিকেল টিমের বড় অংশই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে প্রপোজাল দেয়, সেটার ওপরে ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়। একই সাথে গভর্মেন্ট অর্ডারে কোনো কারণ জানানো হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, যাওয়ার আগ পর্যন্ত যে কেউ বাদ পড়তে পারেন।
সংশোধন ও পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের আদেশ থেকে কিছু সমন্বয় করে সংশোধন করা হয়েছে। যেগুলো বাদ গেছে এগুলো রিপ্লেস হবে। তবে নতুন করে সদস্য যোগ করার ইস্যুটা এখনও ফাইনাল হয়নি। সৌদির সাথে আমাদের এই বিষয়টা ২১ ডিসেম্বর ক্লোজ হয়ে গেছে। একটা-দুইটা চেঞ্জ করতে হলে সৌদি আরবে লিখতে হয়। রিপ্লেসের অনুমোদনটাও ওখান থেকে হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
আমাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কয়েকজনকে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এই অর্ডারটা এখনও বের হয়নি। যাদের যুক্ত করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে তাদেরকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে যে আপনারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সম্ভবত একই সাথে আমাদের বাদ দিয়ে ওদের যুক্ত করা হলে সমালোচনাটা বেশি হত, তাই ওদেরকে এখনই যুক্ত করা হয়নি— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, এটা মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ের এখতিয়ার। কোনটা পরিবর্তন হবে, কোনটা হবে না, এটা সম্পূর্ণ তাদের বিষয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যে তালিকা হয়েছে, সেখানে গ্রামে-গঞ্জে চাকরিরত ও সুবিধাবঞ্চিতদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের হাসপাতাল অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব তালিকা চূড়ান্ত করেন। এই কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন করে তালিকা পরিবর্তনের সময় কোনো কোনো কর্মকর্তা নতুন স্বাস্থ্য সচিবকে পরিবর্তন না করার অনুরোধ করেছিলেন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তর হাসপাতাল অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলমের মুঠোফোনে পরপর দুদিন কল দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ওই অনুবিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমানও কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এই অনুবিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখা-১-এর সিনিয়র সহকারী সচিব সুশান্ত কুমার মাহাতো দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে দেখবেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ বিষয়টার সাথে আমি জড়িত না। কী হয়েছে আমি তা জানি না। তবে হজ টিম বদল হতেই পারে। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা আদেশ দিয়েছিল, এর মধ্যে হয়তো বা ডিপার্টমেন্টে কোনটা বাদ করে থাকতে পারে। ডিপার্টমেন্ট হয়তো রিপ্লেস করে, যেটা স্বাভাবিক। রিপ্লেসমেন্ট হতেই পারে। ডেইলি ক্যাম্পাস