দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী এক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হামলা ও পাল্টা হামলার তীব্রতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হারানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। ইরানের এই আগ্রাসী প্রতিরোধ যুদ্ধের সামনে শত্রুপক্ষ কার্যত নাস্তানাবুদ। এমনকি কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব জ্বালানি ক্ষেত্রেও লেগেছে এক বিশাল ধাক্কা।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসের হাত থেকে বাঁচাতে এবার ইরানের কাছে নতি স্বীকার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র! কেননা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করার মরিয়া চেষ্টায় দেশটি এবার সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ইঙ্গিত দিয়েছে ।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে খোদ মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সংরক্ষিত তেল মজুত থেকেও বাজারে তেল ছাড়তে পারে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বেসেন্ট বলেছিলেন, ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে, যা বিশ্ববাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায় সহায়তা করছে।
ইসরায়েল ও ইরান একে অপরের প্রধান গ্যাসক্ষেত্র ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা তীব্রতর হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল সম্প্রতি ইরানের ‘সাউথ পার্স’ গ্যাসক্ষেত্রে বড় ধরনের হামলা চালালে ইরানও পাল্টা আঘাতে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা কাতারের ‘রাস লাফান’-এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ দিনের যুদ্ধে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর এই ‘মরণকামড়’ অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি অচিরেই এক অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য নমনীয়তাকে অনেক বিশেষজ্ঞ তেহরানের জ্বালানি শক্তির কাছে ওয়াশিংটনের এক প্রকার নতি স্বীকার হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের আঁচ সরাসরি গিয়ে লেগেছে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। বৃহস্পতিবার সকালে ডাচ পাইকারি গ্যাসের মূল্য এক ধাক্কায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মেগাওয়াট-ঘণ্টাপ্রতি ৬৮ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। একইভাবে যুক্তরাজ্যেও পাইকারি গ্যাসের দাম ২৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি থার্ম ১৭২ পেন্সে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ব্রিটেনে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যার ফলে গৃহস্থালির বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শীর্ষনিউজ