Image description

রাজনৈতিক সুপারিশে নতুন করে ১০টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সদ্যসাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে আবেদন করা এসব কলেজের মধ্যে দুটির জন্য দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন দুই উপদেষ্টা। এছাড়া অন্য দুটি কলেজের জন্য সুপারিশ করেছিলেন বর্তমান দুই মন্ত্রী; যারা সুপারিশের সময় মন্ত্রী ছিলেন না। ১০টি কলেজের মধ্যে ৯টির জন্যে সুপারিশ রাজনৈতিক নেতাদের। অন্য একটির জন্য সুপারিশ করেছেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

 

সুপারিশকারী সদ্যসাবেক দুই উপদেষ্টা হলেন—অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অন্য দুটির সুপারিশকারীদের মধ্যে একজন বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যজন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

 

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫২টি মেডিকেল কলেজ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাত্র ৫ বছরেই ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অনুমোদন পেয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়, যার মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি ভুগছে এখন নানা সংকটে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক সুপারিশে আরো ১০টি কলেজের অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

চিকিৎসকরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মেডিকেল কলেজের অনুমোদন হওয়া উচিত নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি এবং মান নিশ্চিত না করেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষার মান না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যে চিকিৎসক বের হবে, তারা সবার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।

 

 

নতুন মেডিকেল কলেজের আবেদনকারী কারা
নতুন করে যে দশটি মেডিকেলে কলেজ চালুর তোড়জোড় চলছে তার মধ্যে নয়টি সরকারি এবং একটি বেসরকারি। সরকারি মেডিকেল কলেজের জন্য আবেদন করা হয়েছে মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাটোর, লক্ষীপুর, ভোলা, ঠাকুরগাঁও ও শেরপুরের জন্য। একমাত্র বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আবেদন এসেছে দিনাজপুর থেকে।

 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের একাধিক সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এসব কলেজের লিখিত আবেদন জমা পড়ে। কেউ কেউ আবার নির্বাচনে জয় পেতে নিজ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। সে অনুযায়ী চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

 

এশিয়া পোস্টের হাতে আসা তথ্য এবং মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন মেডিকেল কলেজ চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তোড়জোড় চলছে মুন্সিগঞ্জে। এ কলেজটি চালুর আবেদন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সরকারের পক্ষ থেকেও এই কলেজ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে।

 

নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করেন অন্তবর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গত বছরের ৩ আগস্ট নিজ জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য তিনি চিঠি দেন তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে। চিঠিতে ড. সালেহউদ্দিন লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৮ লাখের বেশি মানুষের জন্য প্রাচীন এ জেলায় মেডিকেল কলেজ হলে পার্শ্ববর্তী জেলা কুমিল্লা, হবিঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নরসিংদীর কয়েকটি উপজেলার মানুষ এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে।’ তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ উপদেষ্টার চিঠিতে উল্লিখিত নরসিংদী ছাড়া বাকি জেলাগুলোতে আগে থেকেই মেডিকেল কলেজ রয়েছে।

 

অন্যদিকে, উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইতিমধ্যে সরেজমিনে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে হয়েছে পরিদর্শন।

 

নরসিংদীতে মেডিকেল কলেজ চালুর প্রক্রিয়া চলছে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের আবেদনের ভিত্তিতে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাখায়াওয়াত হোসেন এখন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল নরসিংদীতে মেডিকেলে কলেজের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।

 

নারায়ণগঞ্জে একটি মেডিকেল কলেজ চালুর আবেদন করেছেন জেলা গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজন।

 

মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চালুর তোড়জোড় চলছে শেরপুরেও। কলেজটি স্থাপনের পেছনে সামরিক বাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানা গেছে।

 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, সামরিক বাহিনীর ওই কর্মকর্তা গত বছরের ২১ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে মেডিকেল কলেজ চালু করতে চিঠি দেন। এ প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব সঞ্জীব দাস শেরপুর জেলা সদরে মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একই বছর ২৭ নভেম্বর চিঠি প্রদান করেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালককে (প্রশাসন) প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

নাটোরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিন ধরে। দাবিটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরে তা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের ৭ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম।

 

বাকি চার জেলার মধ্যে নাটোরের জেলা সদর হাসপাতালটিকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের জন্য সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আবেদন করেছেন জেলার বিশিষ্টজনরা। এ বিষয়ে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোক্তাদির আরেফিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক বিভাগ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। এছাড়া তারা চিকিৎসা সেবার মান, জনবল কাঠামো, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা এবং সম্প্রসারণের সুযোগ-সুবিধা খতিয়ে দেখেন। হাসপাতালটির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূল্যায়ন করে সবকিছু সন্তোষজনক হলে পরবর্তী ধাপে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠানোর কথা জানান।’ তবে এখনো এ বিষয়ে কোন তথ্য সিভিল সার্জন অফিসে নেই বলে জানান তিনি।

 

ভোলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আবেদন করা হয়েছে ‘আমরা ভোলাবাসী’ নামক একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে। এ সংগঠনের আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর জেলা বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। সংগঠনটির সদস্য সচিব জেলা এনসিপির সদস্য মীর মোশারেফ অমি। সংগঠনের পক্ষ থেকে মেডিকেল কলেজের আবেদনে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা স্বাক্ষর করেছেন।

 

লহ্মীপুরে মেডিকেল কলেজের আবেদনকারী হিসেবে একজন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের নাম শোনা গেলেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দিনাজপুরে ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ নামে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আবেদন করা হয়েছে। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এটির অস্থায়ী ক্যাম্পাস করা হয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এটি পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে।

 

রাজনৈতিক বিবেচনার ২৬ মেডিকেল এখন ‘বিষফোঁড়া’
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ১১১টি মেডিকেল কলেজ। এর মধ্যে সরকারি ৩৮টি, বেসরকারি ৭৩টি। সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষকদের ৪৩ ভাগ পদই খালি। এসব কলেজের মধ্যে ৯টির অবকাঠামো ও পাঁচটির নেই নিজস্ব হাসপাতাল। আর উভয় সমস্যা নিয়ে একেবারে সংকটাপন্ন অবস্থা ছয়টি কলেজের। অন্যদিকে বেসরকারি ৭৭টির কলেজের মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে ২০টি।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কলেজের অধিকাংশই অনুমোদন দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। ফলে মানহীন এসব স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক পর্যায়ে বন্ধের চিন্তা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যদিও নানা বাস্তবতায় সেই প্রচেষ্টা থেমে যায়। তবে বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলের আসনও কমিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরও আগে চারটি বন্ধ এবং দুটি মেডিকেলে ভর্তি স্থগিত করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। যদিও আদালতের শরণাপন্ন হলে সরকারের নেওয়া এসব পদক্ষেপ আটকে যায়। চলতিও বছর শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারছে ওই কলেজগুলো।

 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৫ বছরে ৫২টি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। এর মধ্যে ২০টি সরকারি আর ৩২টি বেসরকারি। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৩৯টি মেডিকেলে কলেজের অনুমোদন দেয়।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্বল ও নানা সংকটে জর্জরিত এই ২৬টি মেডিকেল কলেজ শনাক্ত করা হয়। সরকারি দুর্বল মেডিকেল কলেজের তালিকায় রয়েছে, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, নওগাঁ মেডিকেল কলেজ, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ, মাগুরা মেডিকেল কলেজ এবং নীলফামারী মেডিকেল কলেজ।

 

জানা গেছে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ৫০ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে চালু হয় নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ। ছয়টি ব্যাচে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। জেলার আধুনিক সদর হাসপাতালে তিনটি কোয়ার্টার মেরামত করে চলছে এর কার্যক্রম। এখনো নিজস্ব ক্যাম্পাসের বন্দবস্ত হয়নি। এমনকি কোথায় হবে, কলেজের সঙ্গে যুক্ত থাকা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ কোথায় হবে, সবকিছুই ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়েছে।

 

গত বছরের জানুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ একর জায়গা থেকে ৫০ একর জায়গা নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনের বাধায় তা আটকে যায়। এখন পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করা হয়নি।

 

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য স্থান নির্ধারণ হয়েছে; কিন্তু একনেকে অনুমোদন না পাওয়ায় কাজ থেমে আছে। একই অবস্থা উত্তরের জেলা নওগাঁ মেডিকেলের। কলেজের কার্যক্রম চলছে ২৫০ শয্যার নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের পুরোনো ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি অংশে। এই কলেজের ৩২০ শিক্ষার্থীর জন্য ন্যূনতম সাতটি লেকচার হল (শ্রেণিকক্ষ) দরকার হলেও আছে চারটি। চাঁদপুর জেলা সদর হাসপাতাল। হাসপাতালের ভবনের চতুর্থ তলায় চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ। মাত্র ১১টি কক্ষেই চলছে একটি সরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।

 

অন্যদিকে, আইন ও নীতিমালা অনুসারে মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় ২০২৪ সালে কেয়ার মেডিকেল কলেজ ও আশুলিয়ার নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের নিবন্ধন বাতিল করে সরকার। একই সঙ্গে ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয় উত্তরার আইটি মেডিকেল কলেজ, ধানমন্ডির নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, রংপুরের নর্দান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহীর শাহ মখদুম মেডিকেল।

 

রাজনৈতিক বিবেচনায় মেডিকেল কলেজ নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
দুর্বল মেডিকেল কলেজগুলোর মান বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে অনুমোদনের ক্ষেত্রে মান নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চান বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘মানহীন কলেজ শুধু মানহীন চিকিৎসক তৈরি করে না, এটি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। মানহীন চিকিৎসক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হলে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারেনা। তবে আমরা কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে না। মান বাড়াতে, মানদন্ড বাস্তবায়নে সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। তারপরও বাস্তবায়ন না করলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন যেসব অনুমোদন দেওয়া হবে, সেখানেও মানের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর হতে হবে।’

 

নতুন মেডিকেলে কলেজ চালুর তোড়জোড় নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতপন্থী চিকিৎসসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা অতীতেও বলেছি, এখনো বলছি। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মেডিকেল কলেজ হওয়া উচিত নয়। যে কলেজগুলোর মান নেই, তাদের মান সংরক্ষণের সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতোমধ্যে বিএমডিসি সরেজমিনে পরিদর্শন করে কয়েকটি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বন্ধের পরামর্শ দিয়েছে। আমরা মনে করি মেডিকেল শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি, ব্যবসা থাকা উচিত নয়। কারণ, শিক্ষার মান না থাকলে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যে চিকিৎসক বের হবে, তারা সবার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।’

 

মেডিকেল কলেজ অনুমোদনে পুরনো প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মত স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুবের। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘সরকার মেডিকেল কলেজ করতেই পারে, কিন্তু সেটি অবশ্যই মান নিশ্চিত করতে হবে। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, কলেজের ভবন করা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষকসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। আবারও একই প্রক্রিয়ায় অনুমোদন পেলে সংকট আরও বাড়বে। এই অবস্থা যেন না হয় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

 

মান নিশ্চিত ছাড়া অনুমোদন নয়, বলছে কর্তৃপক্ষ
নতুন ১০ আবেদন জমা পড়ার পর এখন পর্যন্ত পাঁচটি জেলা পরিদর্শন করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জেলাগুলো হল—মুন্সিগঞ্জ, নাটোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদী। অনুমোদনের আগে সবধরনের সুযোগ-সুবিধাগুলো যাতে নিশ্চিত করা হয় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ তাগিদ দেওয়া হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বাকিগুলোও শিগগিরই করার কথা রয়েছে।

 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়ে ২০১৮ সালের পরে স্থাপিত ৬টি মেডিকেল কলেজগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাল পরিকল্পনা ছিল না। এ কলেজসমূহে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে ল্যাব, হোস্টেল কোনটাই ঠিকমত নেই। নতুন করে একই প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেওয়া হলে সংকট আরও বাড়বে তবে, বর্তমানে নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে যে মান নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো কলেজের অনুমোদন দেয়া হবে না। সরকারি কিংবা বেসরকারি, যেটিই হোক মানের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়।’

 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগে অনুমোদন পাওয়া মানহীন এবং দুর্বল মেডিকেল কলেজকে নতুন করে হতে যাওয়া মেডিকেল কলেজের সঙ্গে পূর্ণ সক্ষম করে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। একইসঙ্গে দুর্বল বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

যা বললেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘বেসরকারি কিংবা সরকারি- যে কোনো কলেজ চালুর আগে সবকিছু নিশ্চিত করা না হলে পরবর্তীতে বন্ধ করা কঠিন। সেজন্য কিভাবে সেগুলো সবল করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে সরকার। দুর্বল ছয় কলেজের মধ্যে নীলফামারী কলেজকে অন্য একটি ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করে কিছুটা কার্যকর করা গেছে। কিন্তু বাকি পাঁচ মেডিকেলের অবস্থা দুর্বল রয়ে গেছে। এগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হচ্ছে। নতুন কলেজের কাজ চালু হলে ওই ছয় কলেজের শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, শিক্ষক নিয়োগসহ সব কাজ চলবে।’

 

মানহীন বেসরকারি কলেজগুলোকে কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি পিছিয়ে থাকা কলেজগুলোর একটা বড় সমস্যা হাসপাতাল থাকলেও রোগী না থাকা। টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়, সেজন্য অনেক বেসরকারি হাসপাতালে সহসাই যান না রোগীরা। কিন্তু সরাসরি রোগী দেখা ছাড়া ভাল চিকিৎসক তৈরি হয়না। তাই, এমন কলেজগুলোতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে রোগী ভর্তি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এ সকল রোগীর জন্য সরকার ভর্তুকি দিতে পারে। এতে সরকারি হাসপাতালে যেমন রোগীর চাপ কমবে, তেমনি মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। আর সবচেয়ে বড় উপকার হবে রোগ নির্ণয়, সরাসরি রোগীকে দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ সকল বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা শিখতে পারবে। এটি করা গেলে ইনশাআল্লাহ আগামী দু-বছরের মধ্যে পুরো স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক সংকট কাটাতে বিগত ছয় মাসে কয়েক হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। যদিও তাদের পদায়ন এখনো হয়নি। পদায়ন হলে শিক্ষক সংকট সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। ৯টি মেডিকেল কলেজের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরে নির্দেশনা এসেছে এবং পরিদর্শন চলমান রয়েছে। অনুমোদনের আগে সবধরনের সুযোগ-সুবিধাগুলো যাতে নিশ্চিত করা হয় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।’