ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটি। গত ১২ মার্চ উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি বক্তব্য শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দিতে দিতে কক্ষ ত্যাগ করেন, তবে রাষ্ট্রপতি হট্টগোলের মধ্যেই তার ভাষণ শেষ করেন।
বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন, যেহেতু ভাষণ নিয়ে সংসদে আপত্তি ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তাই এত দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করা ও রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা কতটুকু যৌক্তিক।
কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত
শনিবার (১৪ মার্চ) স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে কার্য উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রথম অধিবেশন চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। রবিবার (১৫ মার্চ) ও সোমবার (১৬ মার্চ) অধিবেশন চলার পর তা মুলতবি হয়ে আবার ২৯ মার্চ বসবে।
এই সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনা হবে। এছাড়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
খরচ ও যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সংসদীয় কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে গড়ে ব্যয় হয় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। দশম সংসদে (২০১৪–২০১৮) প্রতি মিনিটে ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এতে সংসদ সদস্যদের পারিশ্রমিক, কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিল, বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
একেকজন সংসদ সদস্য ১২ মিনিট করে বক্তব্য রাখলে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০০ শব্দ উচ্চারণ করতে পারবেন। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে ভাষণ নিয়ে সংসদে আপত্তির ঝড় উঠেছে, তার ওপর এত দীর্ঘ আলোচনা ও ব্যয় কতটুকু যৌক্তিক।
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি বিগত দিনে ফ্যাসিস্টদের দোসর ছিলেন। তাই উদ্বোধনী অধিবেশনে তার ভাষণের সময় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। কার্য উপদেষ্টা বৈঠকে তার ভাষণের ওপর আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, রেওয়াজের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্টকে নরমালাইজ করার অপচেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। আলোচনায় অংশ নিলেও আমরা ফ্যাসিবাদের সব অপকর্ম তুলে ধরব।
আইনি প্রেক্ষাপট
সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনা ও ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন, যেখানে সাধারণত সরকারের নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও বিভিন্ন খাতের সাফল্য-ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, ১২ মার্চ উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তাকে ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ আখ্যা দিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দেন। রাষ্ট্রপতি বক্তব্য শুরু করলে বিরোধী সদস্যরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দিতে দিতে কক্ষ ত্যাগ করেন। হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শেষ করেন।