Image description

সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কেনাকাটায় অনিয়ম ও প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের মুখে থাকা মো. মিজানুর রশীদকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দায়িত্বে বসানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে বিস্ময় ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (যানবাহন) পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন মিজানুর রশীদ। গত ৪ মার্চ তাঁকে বদলি করে অর্থ ও হিসাব বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর ৫ মার্চ তাঁকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক করা হয়।

একই সঙ্গে তাঁকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। পরিচালকের পদটি মহাব্যবস্থাপকের চেয়ে উচ্চতর হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

বিমানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকা একজন কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া অস্বাভাবিক। তাঁদের অভিযোগ, বিমানের সাবেক ও বর্তমান কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার একটি পক্ষ মিজানুর রশীদকে এসব পদে বসাতে ভূমিকা রেখেছে।

বিমানের একাধিক সূত্র জানায়, এ প্রক্রিয়ায় এক অবসরপ্রাপ্ত পরিচালকের নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি নিজেকে একজন মন্ত্রীর আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিমানের সূত্র বলছে, মিজানুর রশীদের পরিবারেও অতীতে দুর্নীতির অভিযোগের ঘটনা রয়েছে। তাঁর বড় ভাই মো. হারুন অর রশীদ বিমানের বেতন শাখায় হিসাব তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ভ্রমণ ভাতা ও দৈনিক ভাতার ভুয়া ভাউচার তৈরি করে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।

২০১৮ সালে ঢাকার মহানগর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করেন। তবে রায়ের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।

মিজানুর রশীদ অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিভাগীয় মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং দুদক থেকেও অব্যাহতি পেয়েছেন।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন-এর উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম। তিনি জানান, মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান এখনো চলমান।

তিনি বলেন, “কিছু তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আরও তথ্যের জন্য বিভিন্ন সংস্থায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।”

দুদক সূত্র জানায়, গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন, সফটওয়্যার কেনার তথ্য ও বিভাগীয় মামলার নথি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। গত সপ্তাহে এসব তথ্য দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে।

বিমানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ভারতের প্রতিষ্ঠান অ্যাসেলিয়া সলিউশন লিমিটেডের কাছ থেকে দুটি সফটওয়্যার কেনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাজার যাচাই বা উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একক উৎস থেকে সফটওয়্যার কেনার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে ‘ফ্লাইট প্রফিটেবিলিটি সিস্টেম’ এবং ২০১৮ সালে ‘কস্ট অ্যান্ড বাজেট’ সফটওয়্যার কেনা হয়। তদন্তে দেখা যায়, এই সফটওয়্যার ব্যবহারে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।

বিমানের তদন্ত কমিটি মনে করে, বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে সফটওয়্যার কেনার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা ভিনিত সুদ ও মিজানুর রশীদ সমানভাবে দায়ী ছিলেন। যদিও পরে বিভাগীয় মামলায় মিজানুর রশীদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।