Image description

গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। তার কিছুদিন পরই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায় মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে অভিভাবক শূন্য ছিল সংস্থাটি। অনেকটা ক্রান্তিকালে দায়িত্ব পান মো. আবদুল মোমেন। তার নেতৃত্বে ঢিলেঢালা দুদকে ফিরে আসে চাঙ্গাভাব। ঘরে-বাইরে দুর্নীতিরোধে প্রবল চেষ্টাও দেখাচ্ছিল মোমেন কমিশন। কিন্তু ফের ছন্দপতন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় হয়। বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মো. আবদুল মোমেন এবং অপর দুই কমিশনার মোহাম্মদ আলী আকবর আজিজি ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এতে আবারো দুদক হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন। শূন্য কমিশনে অনেকটা নেমে আসে স্থবিরতা। দুদকের নিয়মিত কার্যক্রম চললেও নতুন কোনো মামলা কিংবা অনুসন্ধান কিংবা তদন্তেও হাত দেয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো শূন্য হয়েছে দুদকের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কমিশনের অনুপস্থিতিতে মামলা, অনুসন্ধান, তদন্ত, অভিযানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কে নেবে, সেটি দুদক আইন বা বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় বারবার প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং কিছু নিয়মিত রুটিন কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যত থমকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরবর্তী কমিশনের অনুমোদন নেয়ার শর্তে কমিশনের অনুপস্থিতিতে সচিবের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি অথবা সচিবের নেতৃত্বে দুদকের আটজন মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়ে গঠিত একটি কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী কোনো কমিশনার প্রেসিডেন্টের কাছে এক মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। একই আইনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে যেসব কারণে এবং যে পদ্ধতিতে অপসারণ করা যায়, একই কারণে ও পদ্ধতিতে দুদক কমিশনারদের অপসারণ করা যাবে। এর বাইরে অন্য কোনোভাবে কমিশনারকে অপসারণের সুযোগ নেই।

অবশ্য বাস্তবতা ভিন্ন। বেশির ভাগ কমিশনই নির্ধারিত নোটিশ পিরিয়ড পূরণ না করেই পদত্যাগ করেছে। এ ছাড়া নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের অনুপস্থিতিতে কীভাবে সংস্থার কার্যক্রম চলবে, এ বিষয়েও আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পরিবর্তন ঘটে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে কমিশন কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।

ঢিলেঢালা কার্যক্রম

চেয়ারম্যান কমিশনার না থাকায় ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছে কর্মকর্তাদের মাঝেও। তবে অনেক কর্মকর্তার হাতে একাধিক অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব রয়েছে। অবশ্য কমিশন না থাকায় তারাও এখন চাপমুক্ত। সরজমিন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত কাজগুলো হাতে থাকলেও সেগুলো আপাতত না করেই সময় কাটাচ্ছেন। আবার এক কর্মকর্তাকে দেখা গেছে নিজ দপ্তর রেখে অন্য এক কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়ে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, মোমেন স্যারের আমলে কর্মকর্তাদের একেকজনের ঘাড়ে অতিরিক্ত ফাইল চাপানো হয়েছিল। এখন কমিশন না থাকায় অনেকে হাঁপছেড়ে বাঁচার মতো অবস্থা। তাই নতুন কমিশন না আসা পর্যন্ত ঢিলেঢালা দিয়েছে কাজে।

প্রসঙ্গত, দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১শে নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গঠিত সাতটি কমিশনের মধ্যে চারটিই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে চেয়ারম্যান করে প্রথম কমিশন গঠন করা হয়। তবে, ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রথম কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে। দ্বিতীয় কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এ কমিশনও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়। ২০০৯ সালে অবসরপ্রাপ্ত সচিব গোলাম রহমানকে চেয়ারম্যান করে তৃতীয় কমিশন গঠন করা হয়। চতুর্থ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান। পঞ্চম কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক সচিব ইকবাল মাহমুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গঠিত এ তিনটি কমিশনই পুরো মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছিল।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২৯শে অক্টোবর ষষ্ঠ কমিশন পদত্যাগ করে। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং কমিশনার মো. জহুরুল হক ও মোছা. আছিয়া খাতুন সেদিনই পদত্যাগ করেন। এরপর টানা ৪২ দিন দুদকে কোনো কমিশন ছিল না। এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সংস্থার কার্যক্রমও একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ১০ই ডিসেম্বর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন আবদুল মোমেন। অন্য দুই কমিশনার যথাক্রমে ১১ ও ১৫ই ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন।