মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাসুদ কামালের ফেসবুক পেজ ‘কথা’য় ৬ মার্চ ২০২৬ “ভাই আমার পেটে বাচ্চা আছে, আমাকে মাইরেন না! কেন পুলিশ হত্যার বিচার হবে না?” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
মাসুদ কামালের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেখানে দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল বলেন, “কেন পুলিশ হত্যার বিচার হবে না? কোনো পুলিশ হত্যার বিচার করা দরকার নেই, একটা হত্যার বিচার করেন ভাই। একেবারে অনুরোধ করি, সেটি হচ্ছে সেই অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ কনস্টেবল। এই হত্যাটার বিচার করেন। যে কিনা চিৎকার করে বলছিল, আমাকে মাইরেন না, আমার পেটে বাচ্চা।”
দেখুন এখানে।
এর আগে ৪ মার্চ কালের কণ্ঠের এক টকশোতে সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “একটা অন্তঃসত্ত্বা পুলিশকে মারছেন আপনি। ঐ অন্তঃসত্ত্বা পুলিশকে না মারলে হাসিনার পতন হতো না? আমি এটার বিচার করতে চাই। যদি বিচারে প্রমাণ হয়—হ্যাঁ, এই অন্তঃসত্ত্বাকে তার ভ্রূণসহ মারতে হবে, কারণ ভ্রূণটাও খারাপ ছিল; তাকে না মারলে হাসিনার পতন হতো না, আন্দোলন সফল হতো না—যদি এটা প্রমাণ হয়, ওকে ফাইন। আমরা আর এই বিচার চাইবো না। ওর অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে বলবো, তোমার এই লোকটার মৃত্যু প্রয়োজন ছিল দেশের জন্য। ওকে ফাইন। কিন্তু আপনি বিচারই করতে দেবেন না—এ তো হয় না।”
দেখুন এখানে, এবং এখানে।
জানতে চাইলে মাসুদ কামাল দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি এ ধরনের কথা বলিনি। আমার অনুষ্ঠানে অন্য একজন বলেছেন। …আমি বলেছি বলে মনে পড়ে না।”
দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হত্যার দাবি সত্য নয় জানানো হলে মাসুদ কামাল বলেন, “ইউ আর রাইট, আপনি ঠিক আছেন। প্রেগন্যান্ট মহিলার কাহিনী যে ফলস, সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েই বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে—এটি সত্য নয়। এটা কোনো বিষয় না। বিষয়টা হলো, প্রেগন্যান্ট মহিলা না হয় মরেননি, কিন্তু যেই পুলিশরা মারা গেছে, সেটা গ্রহণযোগ্য না। সিরাজগঞ্জে কি এরকম ঘটনা ছিল? সিরাজগঞ্জে কি স্টুডেন্টদের ওপর আক্রমণ ছিল? আমি বলেছি, এরকম আমার মনে পড়ে না।”
এরপর দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদক মাসুদ কামালকে কালের কণ্ঠের টকশোতে তার বক্তব্যের অডিও শোনালে তিনি বলেন, “এটি বলা ঠিক হয়নি। ভুল তো হয়, ভুল হয় মানুষের—সেটা স্বীকার করা ভালো।”
তবে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ইত্তেফাকের প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, “সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে গুলিতে ৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।” একই দিনে প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “এটা কনফিউজিং। আমি এটা পরে ক্রসচেক করেছি। ম্যাক্সিমাম ইনফরমেশন ঠিক না। আমি যেহেতু বলে ফেলেছি, এটা তো আর ঠিক করা যাবে না—এটা তো ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছিল।”
এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারী নবনীতা চৌধুরি এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, ‘থানায় আগুন দেওয়ার পর যে গর্ভবতী মা কাতরাতে কাতরাতে বেরিয়ে এসে বললেন তিনি গর্ভবতী, তিনি কি আর কোনো সন্তান বাড়িতে রেখে এসেছেন?’
সিরাজগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ হত্যার দাবি কতটা সত্য?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন ফেসবুক একাউন্ট থেকে একটি ভুয়া গল্প ছড়ানো হয়েছিল যে, ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের একটি থানায় হামলা করে যে ১৯ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছিল বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে একজন গর্ভবতী পুলিশ সদস্যও ছিলেন।
কিন্তু দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, নিহতদের মধ্যে কোনো অন্তঃসত্ত্বা বা নারী পুলিশ সদস্য নেই। এছাড়াও, ১৯ জন পুলিশ হত্যার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় ১৩/১৫ জন পুলিশের নিহত হওয়ার খবর। একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর, পুলিশের দায়ের করা মামলাতেও কোনো নারী পুলিশ সদস্যের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়না।
যেমন, ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ইত্তেফাক পত্রিকার শিরোনাম ছিল, এনায়েতপুরে “গণপিটুনিতে’ ১৩ পুলিশ সদস্য, গুলিতে তিন শিক্ষার্থী নিহত”। প্রথম আলোর খবরের শিরোনাম ছিল, “হামলায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ নিহত"।
কি ওয়ার্ড সার্চ করে বিডিনিউজ২৪ এর ওয়েবসাইট “সিরাজগঞ্জে থানায় হামলা: নিহত ১৫ পুলিশের লাশ হস্তান্তর” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, গত ৪ অগাস্ট এনায়েতপুর থানায় আন্দোলনকারীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ জন ঘটনাস্থলে এবং পরবর্তীতে ০২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহতদের মধ্যে একজন ওসি, পাঁচ এসআই, একজন এএসআই এবং আটজন কনস্টেবল ছিলেন।
ঘটনাস্থলে মারা যাওয়া ১৩ পুলিশ সদস্য হলেন, এনায়েতপুর থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক, এসআই রইজ উদ্দিন খান, এসআই প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, এসআই মো. তহছেনুজ্জামান, এসআই আনিছুর রহমান মোল্লা, এএসআই ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল আরিফুল আযম, কনস্টেবল রিয়াজুল ইসলাম, কনস্টেবল রবিউল আলম, কনস্টেবল হাফিজুল ইসলাম, কনস্টেবল আব্দুস সালেক, কনস্টেবল লোকমান আলী এবং কনস্টেবল শাহিন উদ্দিন।
প্রতিবেদনে ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত দুইজনের মধ্যে একজনের নাম (এসআই নাজমুল) নাম প্রকাশ করা হলেও অপর কনস্টেবলের নাম পরিচয় জানা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
উক্ত ঘটনায় গত ২৫ আগস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার অভিযোগপত্র থেকে হাসপাতালে নিহত অপর পুলিশ সদস্যের পরিচয় জানা যায়। নিহত ঐ পুলিশ সদস্য হলেন কনস্টেবল হুমায়ুন কবির। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় থেকে এটা নিশ্চিত যে এনায়েতপুর থানার হামলার ঘটনায় কোনো নারী পুলিশ সদস্য নিহত হননি। উক্ত মামলায় থানায় হামলার ঘটনায় কোনো নারী পুলিশ সদস্য নিহতের তথ্য বলা হয়নি। তবে মামলায়, ওই দিন এনায়েতপুর থানায় নারী কনস্টেবল রেহেনা পারভীনকে মারধর করে টানাহেঁচড়া করে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রকাশিত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় নিহত পুলিশ সদস্যদের তালিকায় এনায়েতপুর থানার পাশাপাশি পুরো পুলিশ বাহিনীতে কোনো নারী পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও, কিছু পোস্টে এক নারী পুলিশ সদস্যের ছবি প্রচার করে তাকে সেই তথাকথিত অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ সদস্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ছড়িয়ে পড়া ছবিটি জীবিত আরেকজন নারীর। তার নাম পৃথিবী চাকমা তিনি বেঁচে আছেন। এ নিয়ে একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়, দেখুন এখানে এবং এখানে।