ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাড়ির টানে রাজধানী থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। গতকাল অফিস শেষে অনেকে ছুটি নিয়ে সড়ক পথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। আজ শুক্রবার ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যাওয়ার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদের বিশেষ ট্রেনযাত্রা শুরু হবে। এ ছাড়া নৌপথেও ইতিমধ্যে বাড়ছে মানুষের ভিড়। রাজধানী ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে নানা উদ্যোগ
নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রেলপথে টিকিটবিহীন যাত্রী পরিবহন না করতে নানা ব্যবস্থা; নৌপথে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালামাল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা, বাল্কহেড চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ফেরিতে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প লঞ্চঘাট; সড়কে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ব্যবস্থা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সতর্কতাসহ নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সরজমিন কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, স্টেশনে প্রবেশের পথে বাঁশ দিয়ে ৬ লেনের পথ তৈরি করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রথম লেন দিয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট কেনা যাবে এবং পরের চারটি দিয়ে যাত্রীরা স্টেশনে প্রবেশ করবেন। ষষ্ঠ পথটি রাখা হয়েছে যাতায়াত করার জন্য। গতবারের মতোই এই পথগুলোর মুখে যাত্রীদের টিকিটের প্রাথমিক পরীক্ষা করা হবে। স্টেশন এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ধুয়ে-মুছে পুরো প্ল্যাটফরম পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। স্টেশনের সামনে প্রবেশমুখে র্যাব, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও পুলিশের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে। তাছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের বুথ রয়েছে, যেখান থেকে হুইলচেয়ার সরবরাহ করা হবে।
কমলাপুর রেলস্টেশন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবার টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্ল্যাটফরমে ঢুকতে দেয়া হবে না। কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে ট্রেন অপারেশনের সঙ্গে যারা জড়িত আছে, তারা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে সতর্ক রয়েছেন যাতে, সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে এবং শিডিউল বিপর্যয় না হয়। স্টেশনে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিনা টিকিটের যাত্রী যাতে স্টেশনে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন। আমরা আশাকরি এবারের ঈদযাত্রা অন্যান্য ঈদের মতোই নির্বিঘ্নে হবে।
বৃহস্পতিবার বিকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, স্টেশনে ঢুকার পথ যেখানে ক্লোজ করা সম্ভব না, সেখানে আমাদের সিকিউরিটি ফোর্স, আরএনবি বা জিআরপি মোতায়েন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। ঢাকা স্টেশনে (কমলাপুর) কয়েকটা জায়গায় এরকম লিকেজ আছে; যেখান দিয়ে লোকজন আসতে পারে, সেই সমস্ত জায়গায় প্রটেকশনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে রেলের শিডিউল ঠিক রাখতে।
চলবে ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন: ঈদের ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেনে চালানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১; ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটে তিস্তা স্পেশাল-৩; ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫; ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭; জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ স্পেশাল ট্রেন বিভিন্ন সময়ে চলাচল করবে।
চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১ চট্টগ্রাম ছাড়বে বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে, চাঁদপুর পৌঁছাবে রাত ৮টা ২০ মিনিটে। চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-২ ট্রেন চাঁদপুর ছাড়বে ভোর ৪টায়, চট্টগ্রাম পৌঁছাবে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। তিস্তা স্পেশাল-৩ ঢাকা ছাড়বে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে, দেওয়ানগঞ্জ পৌঁছাবে বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে। তিস্তা স্পেশাল-৪ দেওয়ানগঞ্জ ছাড়বে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে, ঢাকা পৌঁছাবে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে। শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫ ট্রেন ভৈরববাজার ছাড়বে সকাল ৬টায়, কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৬ কিশোরগঞ্জ ছাড়বে দুপুর ১২টায়, ভৈরববাজার পৌঁছাবে দুপুর ২টায়। শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭ ট্রেন ময়মনসিংহ ছাড়বে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে, কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে। শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৮ ট্রেন কিশোরগঞ্জ ছাড়বে দুপুর ১২টায়, ময়মনসিংহ পৌঁছাবে বিকাল ৩টায়। পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ ট্রেন জয়দেবপুর ছাড়বে সন্ধ্যা ৭টায়। পার্বতীপুর পৌঁছাবে রাত ২টা ৩০ মিনিটে। পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-১০ পার্বতীপুর ছাড়বে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে, জয়দেবপুর পৌঁছাবে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে এবং ঈদের পর পার্বতীপুর স্পেশাল-৯ ট্রেন জয়দেবপুর থেকে ছাড়বে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে, পার্বতীপুর পৌঁছাবে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে। পার্বতীপুর স্পেশাল-১০ পার্বতীপুর থেকে ছাড়বে রাত ১০টা ২০ মিনিটে, জয়দেবপুর পৌঁছাবে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে।
নৌপথে ঢাকা ছাড়তে বিকল্প ঘাট: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, যাত্রীদের সুবিধার্থে এবছর অতিরিক্ত কিছু বিশেষ সেবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) হয়ে চলাচলকারী প্রবীণ ও মহিলা যাত্রীদের ব্যবহার্য মালামাল/ব্যাগ (ব্যবসায়িক পণ্য ব্যতীত) বহনের জন্য ১৭ই মার্চ থেকে ২৮শে মার্চ পর্যন্ত ১২ দিন টার্মিনাল থেকে লঞ্চ পর্যন্ত বিনামূল্যে কুলি সেবা দেবে। আগামী ১৭ই মার্চ থেকে ২৮শে মার্চ পর্যন্ত ১২ দিন অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য হইলচেয়ার সেবা ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) এবং বরিশাল নদীবন্দরে দেয়া হবে। ঢাকা থেকে চলাচলকারী যাত্রীদের সদরঘাটের অতিরিক্ত ভিড় এড়িয়ে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট (ব্রিজের নিচে) থেকে ৬টি লঞ্চ এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট হতে ৩টি লঞ্চ ঈদের পূর্বে চলাচল করবে। আগামী মঙ্গলবার থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এই লঞ্চ চলাচল করবে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে, ঈদের আগে ৫ দিন সদরঘাট থেকে নির্গমনকারী সকল যাত্রীবাহী নৌযানে মালামাল পরিবহন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ এবং ঈদের পরে ৫ দিন অন্যান্য নদীবন্দর থেকে সদরঘাটে আগমনকারী সকল যাত্রীবাহী নৌযানে মালামাল পরিবহন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখতে হবে। আগামী সোমবার থেকে আগামী ২৬শে মার্চ পর্যন্ত দিন রাত সার্বক্ষণিক সকল ধরনের বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে। ঈদের পূর্বে ৩ দিন এবং ঈদের পরে ৩ দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য, পচনশীল দ্রব্য, গার্মেন্টস সামগ্রী, ওষুধ, সার বহনকারী ট্রাক এবং জ্বালানি বহনকারী যানবাহনসমূহ ব্যতীত সাধারণ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং লরি ফেরিতে পারাপার বন্ধ থাকবে।
সড়কে চাঁদাবাজি আর বাসে বাড়তি ভাড়া চলবে না: গত বুধবার রাজধানীর মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে এক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানান, আসন্ন ঈদযাত্রায় সড়ক নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও চাঁদামুক্ত রাখা হবে। ঈদযাত্রীদের কোনোরকম হয়রানি করা যাবে না। বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা যাবে না। বাড়তি ভাড়া আদায় ঠেকাতে ঢাকার সব বাস টার্মিনালে স্থাপন করা হবে ‘প্যাসেঞ্জার হেল্প ডেস্ক’। যাত্রীরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সাইফুল আলম বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এর মধ্যে অন্যতম মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী বাস টার্মিনালে ‘প্যাসেঞ্জার হেল্প ডেস্ক’ স্থাপন করা। কোনো বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে যাত্রীরা হেল্প ডেস্কে অভিযোগ জানাতে পারবেন। ঈদযাত্রায় কোনো অবস্থায়ই যাত্রী হয়রানি করা যাবে না। এরই মধ্যে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সেতু পারাপারে ইলেকট্রিক টোল সিস্টেমে নজর: এক সভায় সেতু বিভাগের সচিব মো. আব্দুর রুউফ বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রাপথে সেতুর উভয়প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম-ইটিসি টোল বুথ চালু রয়েছে, যাতে ইটিসি কার্ডধারী গাড়িগুলো নির্বিঘ্নে দ্রুত সেতু পার হতে পারে। এছাড়া, সেতু বিভাগের আওতাধীন সকল সেতু/স্থাপনায় সার্ভিল্যান্স সিস্টেমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনসমূহের ট্র্যাফিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি এবং মনিটরিং-এর জন্য টোল প্লাজা ও টোলবুথে সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রাখতে হবে। এছাড়াও দ্রুত টোল পরিশোধের জন্য টোল বুথে প্রয়োজনীয় অঙ্কের ভাংতি টাকার রাখার বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন/লাইসেন্সবিহীন গাড়ি সেতু ও সড়কে চলাচল করার কারণে যেন যানজট সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে গাড়ির মালিক, গাড়িচালক ও যাত্রীসাধারণকে বলা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর বিআরটি লেনে একমুখী চলবে গাড়ি: গত বুধবার রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেছেন, ঈদযাত্রা সহজ করতে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিআরটি লেন এবং আব্দুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়া রোড পর্যন্ত ওয়ানওয়ে (একমুখী) যান চলাচল চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ঢাকা বাইপাস রোড খোলা রাখার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ডিএমপি কমিশনার বলেন, সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হলো ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস। এই বাসগুলো হাইওয়েতে নষ্ট হলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এসব বাস যাতে রাস্তায় নামতে না পারে সেজন্য বিআরটিএ এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। গতবারের মতো এবারো লক্কড়-ঝক্কড় বাস মেরামতের জায়গায় নজরদারি চালানো হবে।