Image description

‘মৃত্যুপুরী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পুরান ঢাকায় একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষের যেন কোনও হেলদোল নেই। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ বছর ধরে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ফলে ছোটখাটো আগুনও নিমেষেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। প্রায় ২৫ হাজার ছোট-বড় কেমিক্যাল গোডাউনের ওপর দাঁড়িয়ে যেন প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকিতে বসবাস করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

সর্বশেষ সোমবার (১২ অক্টোবর) চকবাজারের মনজুর খান প্লাজা মার্কেটের একটি দোকানে আগুন লাগে। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করে। অবশেষে ১০টি ইউনিট টানা ১২ ঘণ্টা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। সরু গলি ও ঘনবসতির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশে বাধা এবং দুর্ঘটনাস্থলে প্রচুর প্লাস্টিক ও দাহ্য পদার্থ মজুত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে।

অথচ কয়েক বছর আগেই পুরান ঢাকার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ফায়ার সার্ভিস একগুচ্ছ সুপারিশমালা দিয়েছিল, যার বাস্তবায়ন আজও আলো দেখেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুপারিশগুলো কার্যকর করা গেলে আগুন যেমন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো, তেমনি এড়ানো যেতো অসংখ্য প্রাণহানি। 

নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা: আশ্বাসের আড়ালে দাহ্য রাসায়নিক

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১০ সালে নিমতলী ও ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টায় ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যথাক্রমে ১২৪ জন ও ৭১ জন তাজা প্রাণ অঙ্গার হয়ে যায়। দুটি ঘটনার পরই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল— খুব দ্রুত পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক দাহ্য রাসায়নিকের ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা; কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের দখল থেকে আজও মুক্ত হয়নি পুরান ঢাকা।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কেমিক্যাল হঠানোর সেই তোড়জোড়ও একসময় স্তিমিত হয়ে গেছে। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলী ট্র্যাজেডির পর যা ঘটেছিল, প্রতিবারই যেন তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একের পর এক প্রাণ ঝরলেও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গোডাউন সরেনি। গণমাধ্যমের সংবাদ ও মানুষের মনে ট্র্যাজেডির ক্ষত যত শুকিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতাও যেন ততটাই ফুরিয়ে যায়।

বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গোডাউনের ওপরই জীবন বাজি রেখে বসবাস করছে এক বিশাল জনগোষ্ঠী। যদিও এর মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউনের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারেরই অবস্থান খোদ আবাসিক বাসাবাড়িতে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকার বাইরে আলাদা ও পরিকল্পিত কেমিক্যাল জোন গড়ে তোলা হলে তারাও ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হতেন। 

আবাসিক ভবনের নিচতলায় বিপজ্জনক ‘বারুদ’

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি প্লাস্টিকের ড্রাম ও দাহ্য রাসায়নিক পদার্থে ঠাসা সব দোকানপাট। কোথাও আবার বস্তাভর্তি দাহ্য কেমিক্যাল। আর এসবের ঠিক ওপরেই মাকড়সার জালের মতো ঝুলে রয়েছে অসংখ্য এলোমেলো বৈদ্যুতিক তার। কোনও কোনও দোকানের ঠিক ওপরের তলাতেই রয়েছে আবাসিক বাসাবাড়ি।

শুধু দোকানই নয়, আবাসিক ভবনগুলোর নিচতলার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিপজ্জনক কারখানা ও গোডাউন। এসব গুদামে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, থিনার ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো চরম দাহ্য রাসায়নিক মজুত রাখা হয়, যা সামান্য আগুনের সংস্পর্শে এলেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। 

ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ

১. রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গোডাউন অপসারণ

  • ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল স্থানান্তর: আবাসিক, বাণিজ্যিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক, প্লাস্টিক কাঁচামাল এবং দাহ্য পদার্থের গোডাউন ও কারখানা অবিলম্বে নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে (যেমন: বিসিক কেমিক্যাল শিল্পনগরী) স্থানান্তর করতে হবে।
  • লাইসেন্স বাতিল ও কঠোর নজরদারি: আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কেমিক্যাল মজুতকারীদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

২. ভবনের কাঠামোগত সংস্কার ও ফায়ার সেফটি প্ল্যান

  • বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মান্য করা: প্রতিটি ভবন বা মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (বিএনবিসি) এবং নকশা শতভাগ মেনে চলা।
  • জরুরি বহির্গমন পথ: বহুতল ভবন ও মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত প্রশস্ত জরুরি প্রস্থান পথ বা ফায়ার ডোর রাখা, যা কোনোভাবেই মালামাল রেখে বা তালাবদ্ধ করে রাখা যাবে না।
  • অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন: প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে ফায়ার ডিটেক্টর সেন্সর, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার ও হোস পাইপ সিস্টেম সচল রাখা।

৩. পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা (ফায়ার হাইড্রেন্ট)

  • ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন: অগ্নিকাণ্ডের সময় পুরান ঢাকায় পানির চরম সংকট দেখা দেয়। তা দূর করতে প্রধান রাস্তার মোড়ে মোড়ে ও বড় মার্কেটগুলোর পাশে ‘ফায়ার হাইড্রেন্ট’ (পানির বিশেষ উৎস) স্থাপন করা।
  • জলাশয় সংরক্ষণ: এলাকার প্রাকৃতিক পুকুর ও প্রাচীন পানির উৎসগুলো কোনোভাবেই ভরাট না করে ফায়ার সার্ভিসের ব্যবহারের উপযোগী রাখা।

৪. সরু গলি ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন

  • রাস্তা প্রশস্তকরণ: অত্যন্ত সংকীর্ণ গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। তাই পর্যায়ক্রমে রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
  • ছোট রেসপন্স টিম গঠন: বড় গাড়ি প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে দ্রুতগতিসম্পন্ন মোটরসাইকেল ইউনিট বা ওয়াটার-মিস্টবাহী ছোট গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো।

৫. গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের নিয়মিত সংস্কার

  • পুরোনো তার ও পাইপলাইন পরিবর্তন: শর্ট সার্কিট বা গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। তাই তিতাস এবং ডেসকো-ডিপিডিসির মাধ্যমে নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার এবং গ্যাস পাইপলাইন পরীক্ষা ও সংস্কার করা।

৬. জনসচেতনতা ও নিয়মিত মহড়া

  • ফায়ার ড্রিল (অগ্নিনির্বাপণ মহড়া): স্থানীয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও বাসিন্দাদের নিয়ে নিয়মিত বিরতিতে ফায়ার সেফটি মহড়া পরিচালনা করা।
  • তাৎক্ষণিক সাড়াদান প্রশিক্ষণ: আগুন লাগার প্রথম কয়েক মিনিটে আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

ফায়ার সার্ভিসের মতে, পুরান ঢাকার মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও অতি-ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে ঝুঁকিমুক্ত করতে রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালাদের সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। 

কেন নিয়ন্ত্রণহীন আগুন? কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেনেন্স) লেফট্যানেন্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সোমবারের আগুনের ভয়াবহতার মূল কারণ ছিল সেখানে জমিয়ে রাখা প্লাস্টিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ। যদিও ধোঁয়ার কারণে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকতে পারিনি, তবে কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া দেখে আমরা পরিস্থিতি অনুমান করতে পেরেছি। অত্যন্ত সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতেই কষ্ট হচ্ছিল। এর ওপর ছিল পানির তীব্র অভাব। সব মিলিয়ে এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের টানা ১২ ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে।’ 

তিনি আরও যোগ করেন, ‘পুরো পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে আমাদের বিস্তারিত সুপারিশমালা ছিল, যাতে আগুন লাগলে দ্রুত নেভানো যায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোডাউনগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দারা সহযোগিতা না করলে আমাদের বারবার নিমতলী কিংবা চুড়িহাট্টার মতো ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতে হবে।’ 

চকবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সরকার আমাদের সুনির্দিষ্ট কেমিক্যাল জোন বা জায়গা দেওয়ার কথা বলেছিল; কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত তা বুঝে পাইনি। যে নিরাপদ পরিবেশে এ ব্যবসাটা করা উচিত, তা আমরা গড়ে তুলতে পারছি না। একটি নির্দিষ্ট বিসিক এলাকায় এই ব্যবসা স্থানান্তরিত হলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যেতো।’ 

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটির সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল— আবাসিক এলাকায় যেকোনও ধরনের রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা। তবে কিছু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর অধিকাংশই থমকে গেছে। ফলে পুরান ঢাকা এখনও চরম অগ্নিঝুঁকিতে রয়ে গেছে।