Image description

বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে। যুদ্ধের কারণে সোমবার (৯ মার্চ) অপরিশোধিত তেলের দাম টানা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছায়। এর প্রভাবে পড়েছে বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারে। ফলে শেয়ার বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করছে। এতে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, যা আবার মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করতে পারে। তাদের ধারণা, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ঠিকমতো এগোয় না, ব্যবসা-বাণিজ্য ধীর হয়ে যায়, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে।

 

কেন শেয়ারবাজারে পতন

 

সোমবার বাজার খোলার আগেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল বেঞ্চমার্কগুলোর দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সাপ্তাহিক বৃদ্ধির রেকর্ড গড়েছে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১৫ মার্কিন ডলারেরও বেশি ছুঁয়েছে, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর প্রথমবারের মতো আবার ১০০ ডলার অতিক্রম করল।

 
 

 

মার্কিন অপরিশোধিত তেলের প্রধান মানদণ্ড, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম এখন জানুয়ারিতে যে প্রায় ৬০ ডলারে ছিল, তার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।

 

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই তেলের বাজারে বড় চাপ তৈরি হয়, যখন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথগুলোর একটি করে তুলেছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা আরও বেড়েছে। জুডো ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওয়ারেন হোগান মনে করেন, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা খুবই কম। তার ভাষায়, ‘বিশ্ব অর্থনীতি তেলের দামের সবচেয়ে আকস্মিক বৃদ্ধির মুখে পড়তে পারে।’

 

এদিকে গ্যাস ও সার সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে সংঘাতের ‘স্বল্পমেয়াদি’ প্রভাব হিসেবে দেখছেন। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এশিয়ার শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যেই বড় ধস নেমেছে। সোমবার নিক্কেই ২২৫ সূচক ৬ শতাংশের বেশি এবং কেওএসপিআই সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এর প্রভাব শিগগিরই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পড়তে পারে।

 

তেলের দাম কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি কমাচ্ছে?

 

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।

 

রয়াল ব্যাংক অব কানাডার অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

 

এর প্রভাব ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহেই পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালনে ২৫ সেন্ট বেড়েছে এবং সপ্তাহান্তে আরও ২৫ সেন্ট বাড়ে। রোববার রাত পর্যন্ত গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৪৪ ডলারে।

 

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচই বাড়ে না, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে থাকে।

 

বিশ্লেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স বলছে, তেলের দাম যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোজোনজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।

 

এদিকে এএনজেড ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ যেহেতু তার অধিকাংশ তেল ও গ্যাস আমদানি করে, তাই যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে তারা পূর্বাভাস দিয়েছে, তেলের দাম বেশি থাকলে চীনের উৎপাদক পণ্যের দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।

 

অস্ট্রেলিয়াতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যা যুদ্ধের আগে করা পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ বেশি। ওয়েস্টপ্যাকের অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে এক ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইতোমধ্যেই প্রতি লিটারে প্রায় শূন্য দশমিক ২০ অস্ট্রেলীয় ডলার বেড়েছে।

 

ওয়ারেন হোগানের মতে, এই পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর তাৎক্ষণিক ও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে এবং মানুষের মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে প্রত্যাশাকেও বদলে দিতে পারে।

 

মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে কারা?

 

তেলের দামের দ্রুত ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতির জন্য প্রায়ই ‘স্থবির ধাক্কা’ হিসেবে কাজ করে। কারণ এতে একদিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে যায় বা স্থবির হয়ে পড়ে, অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। ফলে মন্দার ঝুঁকিও বাড়ে।

 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, জ্বালানির দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এতে বিশ্ব প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোজোনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ শতাংশ বা তারও কম হতে পারে।

 

বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প উৎপাদনের জোরে এশিয়ার অর্থনীতিগুলো শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি উপভোগ করছিল। কিন্তু জ্বালানি দামের ধাক্কা সেই গতি ব্যাহত করতে পারে এবং নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।

 

অডিট ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরএসএম ইন্টান্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ১২৫ ডলারে পৌঁছায়, তাহলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৪ শতাংশের ওপরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

 

বেটাশেয়ারসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড বাসানিজ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ১৯৭০-এর দশকের মতো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে গিয়ে উন্নত অর্থনীতিগুলোকে দীর্ঘ মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

 

তার ভাষায়, যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে থেকে যায় এবং সরবরাহে এই বিঘ্ন অব্যাহত থাকে, তাহলে বছরের প্রথমার্ধেই বিশ্ব অর্থনীতি ‘স্থবির মুদ্রাস্ফীতি’ বা স্ট্যাগফ্লেশনের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকবে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি এতটাই বেশি থাকবে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পক্ষে সহজে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।