মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তৃতীয় দিনে প্রলয়ঙ্করী ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জবাবে ইরান এখন ‘সর্বাত্মক আঘাতের’ নীতি গ্রহণ করেছে।
যার ফলে যুদ্ধের পরিধি একযোগে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরবসহ পুরো আরব উপসাগরে বিস্তৃত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার বেশির ভাগই ইরানে। যুদ্ধের ভয়াবহতা আঘাত হেনেছে বিশ্বের জ্বালানি হৃৎপিণ্ডকে। পরিস্থিতিকে আরো অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে তেহরানের বিস্ফোরক দাবি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর প্রভাবশালী এলিট ফোর্স আইআরজিসি এখন আর সরকারি কমান্ডে নেই। তারা কার্যত ‘স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে’ হামলা পরিচালনা করছে। সংঘাতের এ নতুন মাত্রায় কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপতিত হওয়ার ঘটনা চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। দুটো ইরানি বোমারু বিমান ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে কাতার। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ অভিযান অন্তত চার সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে এবং প্রয়োজনে ইরানে স্থল অভিযানের বিষয়টিও তিনি নাকচ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি মধ্যপ্রাচ্যকে অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সংঘাতের তৃতীয় দিন গতকাল দিনভর ইরানের বিভিন্ন শহরে দফায় দফায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পরমাণু স্থাপনার আশপাশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া বাহরাইন, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও সিরিয়ায় একযোগে সামরিক স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরো টালমাটাল করে দিয়েছে।
এদিকে ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারির বলেছেন, ‘আমেরিকানরা তাদের অধিকাংশ বিমান সাইপ্রাসে সরিয়ে নিয়েছে। আমরা সেখানেও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করব, যাতে সেখান থেকেও তাদের চলে যেতে বাধ্য করা যায়।’ যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে যোগ না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোগুলোতে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলার জন্য নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ইরান ‘সবাইকে পুড়িয়ে দেয়ার’ যে নীতি নিয়ে এগোচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই এ কৌশলগত পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরানের হামলা থামানো না গেলে যোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে জার্মানিও। তবে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেছেন, জার্মান সরকার এ হামলায় অংশ নিচ্ছে না, কিন্তু প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের জন্য ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সামরিক লক্ষ্য অর্জনে সময় লাগবে এবং এ অভিযান অন্তত চার সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। অর্থাৎ দ্রুত কোনো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নেই। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে যে সামনে আরো বড় ধরনের হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এখনো ‘কঠোর আঘাত’ করেনি। বড় হামলা এখনো বাকি। শিগগিরই ‘মূল আক্রমণ’ করা হবে।
ইরানে হামলার পর গতকালই প্রথমবার সংবাদ সম্মেলন করে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি নির্মূল করা, তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন রুখে দেয়া।’ তিনি ইরানে কোনো ধরনের জাতি গঠন বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। যদিও অভিযান রাতারাতি শেষ হবে না বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। অন্যদিকে মার্কিন কর্মকর্তারাও বলেছেন, এ অভিযান কয়েকদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রয়টার্স জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি একটি অভিযানের পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন, যা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এদিকে গতকাল কুয়েতে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপতিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ভুল করে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে। বিধ্বস্ত তিনটি বিমানের ছয়জন ক্রু সদস্যই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি বিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টা জবাব দেয়ার সময় কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত মার্কিন বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলোকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এছাড়া গতকাল রাতে দুটি ইরানি বোমারু বিমান ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে কাতার। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা দুটি সু-২৪ বোমারু বিমান ভূপাতিত করেছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো কোনো দেশ ইরানি বোমারু বিমান ভূপাতিত করার দাবি জানাল।
যুদ্ধের তৃতীয় দিনে গতকাল ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে। এ হামলার পর সৌদি আরামকো রাস তানুরা রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এক ধাক্কায় কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাস লাফান ও মেসাইদে ইরানি ড্রোন হামলার পর কাতার এনার্জি এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, শিল্পনগরী রাস লাফানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এখন কাতার এনার্জি বলছে, তারা এলএনজি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানি হামলার মুখে বিশ্বের অন্যতম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক কোম্পানি ‘কাতার এনার্জি’র উৎপাদন বন্ধের ঘোষণায় ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ শাটডাউন দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।
এদিকে ইরানের প্রভাবশালী এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এখন সরকারি নির্দেশে কাজ করছে না, বরং ‘স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে’ তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরান উপসাগরীয় প্রায় সব দেশেই আক্রমণ চালালেও ওমান হামলার লক্ষ্য ছিল না বলে আল জজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান তিনি। আরাগচি বলেছেন, ‘ওমানে যা হয়েছে সেটি আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল না। আমরা সেনাবাহিনীকে বলেছি নিশানা বাছাই করার ক্ষেত্রে সাবধান হতে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সামরিক ইউনিটগুলো এখন স্বাধীন এবং অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তারা আগে থেকে দেয়া সাধারণ নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানে কাজ করছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, আরাগচির এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো আইআরজিসি এখন সরাসরি ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং নিহত হওয়ার আগে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যে নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন, তারা কেবল সেটিই অনুসরণ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এ রণক্ষেত্রে ইরানের সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তেহরান সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা ‘অ্যাকসিস অব রেজিস্ট্যান্স’। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে তাদের রুখতে গতকাল লেবাননে কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫২ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া গত তিনদিনে যুক্তরাষ্ট্র,–ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় এখন পর্যন্ত ছয় শতাশিক মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ইরানে ৫৫৫ জন, লেবাননে অন্তত ৫২, ইসরায়েলে ১০, ইরাকে দুই, কুয়েতে এক, বাহরাইনে এক, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন, ওমানে এক ও চারজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত কেবল আঞ্চলিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। আরব উপসাগরের প্রায় সবক’টি দেশে ইরানের জোরদার হামলা, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ইঙ্গিত সে আশঙ্কাকে আরো ঘনীভূত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কূটনৈতিক কোনো সমাধান না এলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বিশ্বজুড়ে আরো রক্তক্ষয়ী ও সংকটময় সময় বয়ে আনতে পারে।