ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবেন, তিনি সম্প্রতি বলেন, কাতারের সমর্থনে তুরস্ক ইরানকে হটিয়ে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তার এই কথা কেবল অন্য কোনো শত্রু সম্পর্কে সাধারণ সতর্কবার্তা নয়। বরং, তার এ মন্তব্য একটি গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন: ইসরাইল হয়তো এমন একজন শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ প্রতিপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যার একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যও আছে।
কয়েক দশক ধরে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের মূলে ছিল ইরান এবং তার শিয়া অক্ষ—যার মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং সিরিয়া ও লেবাননের অঘোষিত যুদ্ধ। কিন্তু বেনেটের কথাগুলো একটি নতুন অক্ষের ইঙ্গিত দেয়: তুরস্ক—যা ন্যাটোর সদস্য এবং যার আছে এক সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। আঙ্কারা একটি সুন্নি অক্ষ তৈরি করছে, যা ইরানের শিয়া অক্ষের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুর্কি বিশেষজ্ঞ মেলিহা আলতুনিসিক বলেন, এরদোয়ান একজন বিচক্ষণ অভিনেতা, যিনি বোঝেন কীভাবে আদর্শকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। ইরানের বিপরীতে তুরস্ক বাস্তববাদ বা প্র্যাগম্যাটিজমের সঙ্গে আদর্শের সমন্বয় ঘটায়, যা দেশটিকে একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য এবং অভাবনীয় করে তোলে।
নতুন অক্ষের কলাকৌশল
ইসরাইলি কৌশলবিদদের দৃষ্টিতে এই হুমকি কেবল তুরস্ক নয়, বরং তুরস্ক ও কাতার। এই দুই দেশের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড দানবকে লালন-পালন’ করার এবং শিয়াদের প্রতি ইরানের সমর্থনের মতো একই ধরণের আদর্শিক হুমকি ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সিরিয়া ও গাজায় তাদের প্রভাব বাড়ছে, এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া থেকে সৌদি আরবকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার গুঞ্জনও আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে: তুরস্ক, কাতার ও তাদের পারমাণবিক শক্তিধর মিত্র পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত একটি নতুন শত্রু অক্ষ।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বিশেষজ্ঞ স্টিভেন কুক যেমনটা লিখেছেন, ইসরাইল দীর্ঘকাল ধরে ইরানের সক্ষমতা অনুযায়ী তার প্রতিরক্ষা কৌশল সাজিয়েছে। কিন্তু তুরস্ক যদি সৌদি আরবকে পাশে পেতে সফল হয় বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে, তবে কৌশলগত মানচিত্র রাতারাতি বদলে যাবে। তখন এটি কেবল ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় থাকবে না—এটি হবে পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন একটি সুন্নি বিশ্ব।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ
ইসরাইল ও তুরস্কের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব কেবল আদর্শিক বা সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিকও। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক ইসরাইলের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিসহ সব বাণিজ্য লেনদেন স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও সারসহ ৫৪টি পণ্য গোষ্ঠীর ওপর বাণিজ্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছিলেন যে, এরদোয়ান ‘হামাসকে সমর্থনের জন্য তার দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন।’