আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসীদের’ আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে হওয়া ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলার জন্য আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত যোদ্ধাদের দায়ী করার পর এ পদক্ষেপ নিল ইসলামাবাদ। হামলায় নারী–শিশুসহ অনেকে হতাহত হয়েছে বলে খবর দিয়েছে এএফপি।
গত অক্টোবরের সীমান্ত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৭০ জনের বেশি নিহত হওয়ার পর এটিই ছিল এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত হামলার ঘটনা।
এ হামলা পাকিস্তান ও তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে দুর্গম সীমান্ত এলাকায় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলার পর উত্তেজনা কমাতে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় মাত্র কয়েক দিন আগেই তিন পাকিস্তানি সেনাকে মুক্তি দিয়েছিল কাবুল।
আজ রোববার ভোরে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ রয়েছে, এসব হামলা চালিয়েছে তথাকথিত ‘খারিজি’রা (পাকিস্তানি তালেবান বা তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তানকে এ নামে আখ্যায়িত করে ইসলামাবাদ)। তারা আফগানিস্তানে অবস্থানরত তাদের ‘নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রকদের’ নির্দেশে এসব হামলা চালিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আফগানিস্তান সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি তালেবান ও ইসলামিক স্টেট খোরসান প্রদেশের (আইএস-কেপি) সাতটি সন্ত্রাসী শিবির এবং গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট হামলা’ চালিয়েছে পাকিস্তান।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আফগানিস্তান সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি তালেবান ও ইসলামিক স্টেট খোরসান প্রদেশের (আইএস-কেপি) সাতটি সন্ত্রাসী শিবির এবং গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট হামলা’ চালিয়েছে পাকিস্তান।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার জন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়ার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে কাবুল।
পাকিস্তান সরকার বলেছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে বোমা হামলা এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত জেলা বাজাওর ও বান্নু’র সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০০৮ সালের পর ইসলামাবাদে হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ওই শিয়া মসজিদে হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং ১৬০ জনের বেশি আহত হন। ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানায়, গতকাল শনিবার বান্নুতে একটি নিরাপত্তা বহর লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। সেখানে বন্দুকযুদ্ধে পাঁচ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হন এবং বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি সামরিক যানে ধাক্কা দিলে দুই সেনাও প্রাণ হারান।
এএফপির খবরে বলা হয়, আফগানিস্তান জানিয়েছে, নানগারহার ও পাখতিকা প্রদেশে পাকিস্তান হামলা চালিয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে।
গত অক্টোবর মাসে সীমান্তে দুই পক্ষের সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে পাকিস্তান ক্রমাগত অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তানের তালেবান শাসকেরা ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয়’ দিচ্ছে; যাঁরা পাকিস্তানের ভেতর হামলা চালাচ্ছেন। যদিও কাবুল এ দাবি অস্বীকার করে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘পাকিস্তানি জেনারেলরা তাঁদের দেশের নিরাপত্তা দুর্বলতা ঢাকতে এ ধরনের অপরাধের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইছেন।’
এএফপির একজন সংবাদকর্মী নানগারহারের বিহসুদ জেলায় দেখেছেন, হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে স্থানীয়রা বুলডোজার ব্যবহার করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আফগানিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিহসুদ জেলায় একটি বাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন; যাদের মধ্যে ১২ জনই শিশু ও কিশোর।
দীর্ঘ ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার (১ হাজার ৬০০ মাইল) সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনার কারণে প্রায়ই এ দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে বাণিজ্য ও যাতায়াত বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত অক্টোবর মাসে সীমান্তে দুই পক্ষের সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার পর তারা একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে পাকিস্তান ক্রমাগত অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তানের তালেবান শাসকেরা ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয়’ দিচ্ছে; যাঁরা পাকিস্তানের ভেতর হামলা চালাচ্ছেন। যদিও কাবুল এ দাবি অস্বীকার করে আসছে।