বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে, আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকিও করছে। এ কারণে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম থেকে তাই ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ ছাড়া অন্য কার্যক্রম আলাদা করা দরকার। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকি করতে গঠন করা দরকার আলাদা তদারক সংস্থা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারী (সাকসেসর) নোটে আর্থিক খাত সংস্কারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উত্তরাধিকার নোটে আরও বলা হয়েছে, সরকার নীতিগত সম্মতি দিলে এ জন্য একটি ধারণাপত্র তৈরি করতে পারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
সালেহউদ্দিন আহমেদ একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তিনি অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বাণিজ্যিক ব্যাংক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে অর্থ উপদেষ্টা এমন পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ব্যাংক তদারকের ক্ষেত্রে দেশ ভেদে ভিন্নতা বেশি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ইত্যাদি দেশে ব্যাংক খাত তদারকের জন্য আলাদা দপ্তর রয়েছে। তবে ভারত, ফিলিপাইন ইত্যাদি দেশে উভয় কাজই করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
যোগাযোগ করলে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে এত বেশি ব্যাংক হয়ে গেছে যে আমার মনে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এটাই তো তারা ভালোভাবে করতে পারে না। আমি চাই ব্যাংক খাত তদারকির দায়িত্বটা আলাদা দপ্তর করবে। ভবিষ্যতের জন্য তাই এ ধারণাটা দিয়ে গেলাম। এটা করা গেলে পুরো ব্যাংক খাত তথা অর্থনীতি উপকৃত হবে।’
প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম প্রধান কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সংগতি রেখে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা।
সালেহউদ্দিন আহমেদের রেখে যাওয়া ২৯ পৃষ্ঠার সাকসেসর নোটে অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও বিভিন্ন পরামর্শ রয়েছে। নোটে এ ছাড়া আলাদা ব্যাংক রেজোল্যুশন কর্তৃপক্ষ, আমানত সুরক্ষা করপোরেশন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নসহ নানা পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
উত্তরাধিকারী নোটে বলা হয়েছে, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আদায় জোরদার, ব্যাংক খাত সংস্কার ও উন্নয়ন সহায়তার কার্যকর ব্যবহারে সমন্বিত কৌশল নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বিষয় হওয়া উচিত। সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা, উচ্চ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া এবং বেশি সুদের ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
নোটে আরও বলা হয়েছে, ১০ বছর আগের তুলনায় পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১১১ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষার্থে তাই নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন দরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দরকার সমন্বিত রাজস্ব-মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা। অর্থ বিভাগকে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তথা সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। আর ভর্তুকি ব্যবস্থা যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। উচ্চ সুদ ব্যয় ও সীমিত রাজস্ব প্রবাহের বাস্তবতায় বাজেট বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণের পরামর্শও দেওয়া হয় নোটে। বলা হয়, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দক্ষতা বৃদ্ধি হবে এ বিভাগের তাৎক্ষণিক কর্মসূচি।
নোটে এনবিআর অংশ নিয়ে দেড় বছরে কী করা হয়েছে, তার বিবরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, করব্যবস্থার সংস্কারে বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশে ব্যাপক কর ফাঁকি হচ্ছে। কর অব্যাহতির সংস্কৃতিও ব্যাপক। আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার মধ্যে ডিজিটাইজ অপর্যাপ্ত এবং কর আদায় কার্যক্রমে ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।