Image description

নির্ভুল গতিনিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি অস্ট্রিয়ার একটি ক্ষুদ্র সেন্সর পৃথিবীজুড়ে এক বিস্ময়কর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। হংকংয়ের একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি হওয়ার কিছু সময় পর সেটি ইউক্রেনে পাওয়া যায় একটি ড্রোনের ভেতরে। মূলত রাশিয়া থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি দীর্ঘপাল্লার সামরিক ড্রোনের ভেতরে ছিল এই প্রযুক্তি। এ নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে নিজেদের প্রযুক্তিতেই নিজেরা আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেশ চিন্তায় ফেলেছে ইউরোপকে।

এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেন্সরের যাত্রাপথ দেখায় কীভাবে ইউরোপীয় পণ্য এখনো রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবস্থায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ড্রোনটি ছিল ইরানি শাহেদ-১৩৬-এর রুশ সংস্করণ, যার নাম জেরান-২। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর রাশিয়া ইরানি শাহেদ প্রযুক্তি সংগ্রহ করে এবং জেরান-২–এর ব্যাপক উৎপাদনে বিনিয়োগ শুরু করে। এরপর থেকে এই বিস্ফোরক ড্রোনটি ইউক্রেনের গভীরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ব্যবহৃত সবচেয়ে ব্যাপক দীর্ঘপাল্লার মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা নথি সংগ্রহ করে এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ইউক্রেনে পাওয়া একাধিক রুশ-উৎপাদিত শাহেদ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের বিবরণ রয়েছে।

নথিগুলো অনুযায়ী, রুশ ও চীনা যন্ত্রাংশের পাশাপাশি জেরান-২ ড্রোনে আমেরিকান, ইউরোপীয়, জাপানি ও তাইওয়ানি নির্মাতাদের অসংখ্য উপাদান রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এসব উপাদানের কিছু রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু ও দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তৈরি।

ডি টাইড, ওসিসিআরপি, পেপার ট্রেইল মিডিয়া, স্ট্যান্ডার্ড, দ্য টাইমস, দ্য আইরিশ টাইমস ও ইনফোলিব্রের সঙ্গে যৌথভাবে কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট রুশ কাস্টমস রেকর্ড বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে রাশিয়ায় পাঠানো চালানের তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি তারা যোগাযোগ করেছে পশ্চিমা নির্মাতাদের সঙ্গে এবং ইইউ ও ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিষেধাজ্ঞা বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে সংবাদমাধ্যমটি।

এই অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে কীভাবে সেই অস্ট্রীয় সেন্সরটি একটি রুশ আক্রমণ ড্রোনে পৌঁছেছে এবং কীভাবে অন্যান্য বহু পশ্চিমা উপাদান, এমনকি নিষিদ্ধ উপাদানও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে রুশ ড্রোনে প্রবেশ করছে। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা নথি আরও দেখায় যে কিছু পশ্চিমা উপাদান চীনে তৈরি ও বিক্রি হওয়া যন্ত্রের অংশও রুশ ড্রোনে ব্যবহার হয়েছে।

ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সরবরাহপথ ব্যবহার করে রাশিয়া ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মাসে ৩ হাজার ইউনিট পর্যন্ত নিজস্ব শাহেদ ড্রোন উৎপাদন বাড়িয়েছে। ইউক্রেন সরকারের এক প্রতিনিধি মনে করেন, এই সংখ্যা আরও বাড়বে। ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও রাশিয়ার তুলনামূলকভাবে সস্তা ও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত শাহেদ ড্রোনের মাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এক ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য জেরান-২ ড্রোন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইইউ সরকার ও নির্মাতাদের সামনে প্রশ্ন হলো- তারা কি চীন, হংকং ও উন্নয়নশীল দেশের মাধ্যমে রাশিয়ার ড্রোন উৎপাদনে ইউরোপীয় উপাদানের প্রবাহ থামাতে পারবে?

ইউরোপীয় ইউনিয়নেও দেখা গেছে রুশ ড্রোন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, এই ড্রোন বেশ কয়েকবার রোমানিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করে দেশটির সীমান্ত পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এই প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও পৌঁছেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার বৃহৎ আকারের বিমান হামলার সময় রুশ শাহেদ ড্রোন প্রবেশ করে পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও মলদোভার আকাশসীমায়। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, শাহেদ ড্রোনের প্রধান সুবিধা হলো দীর্ঘ দূরত্বে বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতা। রাশিয়ায় নির্মিত অন্য কোনো কামিকাজে ড্রোন এত দূর উড়তে পারে না।

এছাড়া দেখা গেছে, শাহেদই এমন একটি অস্ত্র, যা এত ব্যাপকভাবে উৎপাদন হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনাবাহিনী নিয়মিতভাবে ৩০০ থেকে ৫০০টি শাহেদ ড্রোনের ঝাঁক, সঙ্গে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে একটি চলমান মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এর ফলে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদন কেন্দ্র। শীতের তীব্র ঠান্ডায় তাপমাত্রা যখন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (মাইনাস ৪ ফারেনহাইট) নেমে যায়, তখন প্রায় ১০ লাখ ইউক্রেনীয় মানুষ তাপ, বিদ্যুৎ ও গরম পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

দেশীয়ভাবে উৎপাদিত শাহেদ ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাও কম নয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ গ্রিডের পাশাপাশি আবাসিক ভবন, কিন্ডারগার্টেন, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, ট্রেন, ডাকঘর ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে এই অত্যাধুনিক আকাশযান। ২০২৬ সালের শুরু থেকে প্রতিরাতেই ইউক্রেনে শাহেদ আঘাতকারী ড্রোন ব্যবহার করছে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর দৈনিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম দেড় মাসেই সাড়ে ৪ হাজারের বেশি এমন ইউএভি মোতায়েন করা করে মস্কো।

২০২৫ সালে মস্কো ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৫৭ রাত ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলা চালায়। এর মানে হলো পুরো বছরে মাত্র আটটি রাত হামলামুক্ত ছিল। ২০২৫ সালে রাশিয়ায় উৎপাদিত ৩২ হাজারটির বেশি শাহেদ দেশটিতে আঘাত হানে। প্রতিটি ড্রোন বিস্ফোরক বহন করে ৫০ থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত। এমন উৎপাদন মাত্রার জন্য আমদানিকৃত উপাদানের ধারাবাহিক সরবরাহ প্রয়োজন, কারণ রাশিয়া জেরান-২ ড্রোনের সব উপাদান নিজে উৎপাদন করে না।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের নিষেধাজ্ঞা নীতি বিষয়ক দূত ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউক বলেন, শাহেদের জন্য আমদানিকৃত অংশগুলোর বেশিরভাগই চীনা নির্মাতাদের তৈরি। তবে আমেরিকান, ইউরোপীয় ও জাপানি কোম্পানির উপাদানও এখনও উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে।

রাশিয়ায় পাঠানো চালান বিশ্লেষণ ও নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট, ওসিসিআরপি ও তাদের অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কয়েকটি ইউরোপীয় উপাদানের উৎস শনাক্ত করেছে এবং সেগুলো কীভাবে রাশিয়ার দুটি কারখানায় তৈরি শাহেদে পৌঁছায় তার সাধারণ রুট চিহ্নিত করেছে।

অবৈধ সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসন্ধান
২০২৫ সালে ইউক্রেনে আঘাত হানা একটি রাশিয়া-নির্মিত শাহেদ বিস্ফোরিত হয়নি। সেটি উদ্ধার করে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দারা খুলে দেখেন এবং শনাক্ত করেন যে ওই জেরান-২ ইউএভি ইঝেভস্কে অবস্থিত রুশ কুপোল কারখানায় তৈরি। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অন্যান্য যন্ত্রপাতির পাশাপাশি অস্ট্রীয় কোম্পানি আমস-ওস্রাম নির্মিত একটি ক্ষুদ্র রোটারি এনকোডার পাওয়া যায়।

ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দারা সেন্সরটির উৎপাদন সাল ২০২৪ হিসেবে নির্ধারণ করেন, যা ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর দুই বছর পর নির্মিত। এছাড়া ইইউ নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও ইউরোপীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর রাশিয়ায় সরবরাহ বন্ধের পর উৎপাদিত হয়েছে ডিভাইসটি। তাহলে নতুন তৈরি একটি ইউরোপীয় সেন্সর কীভাবে একটি ধ্বংসাত্মক রুশ দীর্ঘপাল্লার ইউএভিতে পৌঁছাল?

এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে জার্মানিভিত্তিক পেপার ট্রেইল মিডিয়াকে দেয়া আমস-ওস্রামের জবাব অনুযায়ী, সেন্সরটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে হংকংয়ের একটি কোম্পানির কাছে সরবরাহ করা হয়। এরপর সেটি চীনের একটি কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়, যাকে নির্মাতা “শেষ ব্যবহারকারী” হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী পণ্যটি সামরিক কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে জানায় আমস-ওস্রাম। এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তও সেন্সরটিকে রুশ সামরিক ড্রোনে পৌঁছানো থেকে রক্ষা করতে পারেনি। এটি দুইভাবে ঘটতে পারে—হয় চীনা কোম্পানিটি সরাসরি সেন্সরটি রাশিয়াকে বিক্রি করেছে, অথবা তারা সেন্সরটি ব্যবহার করে কোনো বড় যন্ত্রাংশ তৈরি করে সেটি রাশিয়াকে বিক্রি করেছে।

যেহেতু কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট পর্যালোচিত ফাঁস হওয়া রুশ কাস্টমস রেকর্ডে ২০২৪ সালের শুরুর পর রাশিয়ায় আমস-ওস্রাম পণ্যের সরবরাহের তথ্য নেই, তাই ধারণা করা হয় সেন্সরটি চীনে তৈরি কোনো যন্ত্রের অংশ হিসেবেই সেখানে পৌঁছেছে।

একই ড্রোনে পাওয়া জার্মান কোম্পানি বোশের একটি স্পার্ক প্লাগের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি ঘটে। ২০২৫ সালে ইউক্রেনে অবতরণ করা সেই জেরান-২ ড্রোনে এটি পাওয়া যায়। জার্মান কোম্পানিটির দেয়া জবাব অনুযায়ী, ডিভাইসটি ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে চীনে তাদের কারখানায় তৈরি হয় এবং সেখানেই বিক্রি করা হয়।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা নথি অনুযায়ী, জার্মান ট্রেডমার্কযুক্ত স্পার্ক প্লাগটি চীনে তৈরি একটি ইঞ্জিনের অংশ হিসেবে রুশ সীমান্ত অতিক্রম করে, যা পরে রুশ সামরিক ড্রোনে স্থাপন করা হয়। এই অনুসন্ধানে বিশ্লেষণ করা আরেকটি জেরান-২ তৈরি হয়েছিল আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (আলাবুগা এসইজেড), যা রাশিয়ার প্রধান শাহেদ উৎপাদন কেন্দ্র।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ওই ড্রোনে রাশিয়ায় তৈরি অংশের পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে কুপোল কারখানার জেরান-২ তুলনামূলকভাবে বেশি চীনা ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। তবে রাশিয়ায় তৈরি অংশের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নির্মাতারা পশ্চিমা উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, আলাবুগায় তৈরি একটি শাহেদে বিদেশি যন্ত্রাংশের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক, প্রায় ২৯৪টি। অন্যদিকে কুপোল কারখানার শাহেদে ছিল ১১২টি বিদেশি উপাদান। এটি নির্দেশ করে যে আলাবুগা এসইজেডের বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সর্বোচ্চ মাত্রার সংযুক্তি রয়েছে।

আরও পড়ুন: ভূপৃষ্ঠের নিচে ৪৫টি মহাসাগরের সমান জীবনের অপরিহার্য উপাদানের সন্ধান

আমেরিকান উপাদান আলাবুগা-তৈরি শাহেদের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে থাকলেও ইউরোপীয় দেশগুলো (জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস) তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যায় হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরবরাহ করছে, বিশেষকরছে— করে মাইক্রোসার্কিট, নেভিগেশন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উপাদান। এসব উপাদানের মধ্যে জার্মান নির্মাতা ইনফিনিয়ন টেকনোলজিসের ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইসও পাওয়া গেছে।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা ২০২৫ সালে ইউক্রেনে আঘাত হানা একটি জেরান-২ ড্রোনে ইনফিনিয়ন টেকনোলজিসের দুটি ট্রানজিস্টর শনাক্ত করে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সেগুলো ২০২৪ ও ২০২৩ সালে তৈরি। তবে ইনফিনিয়ন টেকনোলজিস পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে ট্রানজিস্টরগুলোর উৎপাদন সাল নিশ্চিত করতে পারেনি।

একই সময়ে কাস্টমস ডেটা দেখায়, ২০২৪ সালে রাশিয়াভিত্তিক ২০টিরও বেশি ট্রেডিং কোম্পানি নির্মাতার সম্মতি ছাড়াই ইনফিনিয়নের পণ্য আমদানি করে। প্রেরক হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল চীন, হংকং ও তুরস্কের পাইকারি বিক্রেতারা।

কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট আগে জানিয়েছিল, তৃতীয় দেশের এমন মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় ইউরোপীয় ও আমেরিকান ইলেকট্রনিক উপাদানের পাইকারি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নির্বিঘ্নে চলছে রাশিয়ায়।

রুশ ট্রেডিং কোম্পানির ওয়েবসাইটগুলোতে সব শীর্ষ নির্মাতার পশ্চিমা মাইক্রোচিপের অন্তহীন তালিকা পাওয়া যায়। ২০২২ সালের পর থেকে যারা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ইনফিনিয়নের মতো যারা সেখানে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করেছে, তারাও এখনও তাদের পণ্যের অবৈধ সরবরাহের মুখে পড়ছে।

ইনফিনিয়ন টেকনোলজিস জানায়, ‘বিতরণ চুক্তিতে ‘নো রাশিয়া’ ধারা সংযোজনের পাশাপাশি, প্রতিটি ডেলিভারি নোটে রাশিয়া ও বেলারুশে পণ্য পাঠানো নিষিদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ থাকে। তবে এরপরেও সমস্যা থেকেই যাচ্ছে, আর তা হলো- নিষেধাজ্ঞায় যোগ না দেয়া দেশগুলোর বহু অননুমোদিত ট্রেডিং ফার্ম নির্মাতার চুক্তিতে কী লেখা আছে, তা তোয়াক্কা করে না। ইনফিনিয়ন টেকনোলজিস জানায়, বিশ্বব্যাপী মাত্র প্রায় ৬০টি দেশ এই নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে এসব সরবরাহ বন্ধ করা চ্যালেঞ্জিং।

অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, মানবাধিকার, দুর্নীতিবিরোধী ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইনজীবী অ্যালেক্স প্রেজান্তি ওসিসিআরপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তৃতীয় দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইইউ অতিরিক্ত রপ্তানি বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।;

তবে কাস্টমস রেকর্ড অনুযায়ী, রাশিয়ার অস্ত্রে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ পশ্চিমা উপাদানের প্রধান উৎস চীনের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভবত হবে না। এর বাইরে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিরগিজস্তান, থাইল্যান্ড বা ভারত থেকে খুব অল্প অংশই রাশিয়ায় পৌঁছেছে।

প্রেজান্তির ভাষায়, ‘ইইউ কিরগিজস্তানের মতো দেশে রপ্তানি হওয়া কিছু পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে সম্ভবত তা করবে না, কারণ ইইউর সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটি কার্যত বাণিজ্য যুদ্ধের শামিল হবে।’

এই অনুসন্ধানের সময় দেয়া এক বিবৃতিতে ইইউর প্রধান নিষেধাজ্ঞা দূত ডেভিড ও’সালিভান বলেন, তিনি তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করছেন যাতে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাশিয়ায় উচ্চঝুঁকির ইইউ-উৎপত্তি পণ্য বিক্রি, সরবরাহ, হস্তান্তর বা রপ্তানি না করা হয়।

কিয়েভে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের নিষেধাজ্ঞা নীতি বিষয়ক দূত ভ্লাদিস্লাভ ভ্লাসিউকও স্মরণ করিয়ে দেন, ইউক্রেন ও তার আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বেইজিংকে মস্কোর সঙ্গে নিষিদ্ধ পণ্যের বাণিজ্য কমাতে রাজি করানোর জন্য উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত।

চীন যখন রাশিয়ার সামরিক যন্ত্রের জন্য জীবনরেখা হয়ে উঠেছে, তখন ভ্লাসিউক ইউরোপীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাশিয়ায় ইউরোপীয় উপাদানের সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে তদন্ত শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উপাদান নির্মাতাদেরও কিয়েভে প্রতিনিধি পাঠানোর আহ্বান জানান, যাতে রুশ অস্ত্রে পাওয়া উপাদানের শনাক্তকারী তথ্য পর্যালোচনা করে মধ্যস্তরের পরিবেশকদের চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা যায়।

পরিহাসের বিষয় হলো, শাহেদ ড্রোনকে ১৯৮০-এর দশকে শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে নকশা করা জার্মান ‘ডি ড্রোনে অ্যান্টিরাডার’-এর অনুলিপি হিসেবে ধরা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর রাডার ধ্বংস ও আকাশ প্রতিরক্ষা দমন। অস্ত্র বিশেষজ্ঞ কিরিচেভস্কি বলেন, ‘ডানার ডগা ও পেছনে পুশার ইঞ্জিনসহ ত্রিভুজাকার কামিকাজে ড্রোনটি জার্মান নকশা, ইরানি নয়। দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক্সের সেটটিও একই। অর্থাৎ, ১৯৮০-এর দশকের সেই জার্মান প্রকল্পে যা নকশা করা হয়েছিল, তা আধুনিক শাহেদে চলে আসে, পরে রুশ সংস্করণ জেরান-২ নামে স্থানীয় উৎপাদনে যায়।’

ফলে যে নকশাটি পশ্চিম জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার আগে কখনো মোতায়েন করেনি, সেটিই আধুনিক ইরানি শাহেদে পুনরায় আবির্ভূত হয়। এরপর রাশিয়ার জেরান-২ হিসেবে এখন গণউৎপাদিত হয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে এটি এবং তাতে রয়ে গেছে ইউরোপীয় ও আমেরিকান উপাদানগুলো।