পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানে আগামীকাল রোববার জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে। কয়েক দশকের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো আগাম সাধারণ নির্বাচন হওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক চমক দেখা দিয়েছে। এই আকস্মিক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল, এমনকি অনেক ভোটারকেও বিস্মিত করেছে।
দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই নির্বাচনে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর বাজি ধরেছেন। তার লক্ষ্য, গত বছর যেখানে তার দল ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে সফল হয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কিন্তু ‘জনবিচ্ছিন্ন’ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জন্য স্পষ্ট জনসমর্থন আদায় করা।
নিজের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভরসা করছেন তাকাইচি। তিনি আশা করছেন, গত বছর যেখানে তার দল ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে তিনি সফল হতে পারবেন। দীর্ঘদিন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলেও অত্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন তার দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি)। দলের জনসমর্থন আদায় তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে একে ‘বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কারণ তার পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবা একই কৌশল নিয়ে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছিলেন। এবার ভোটাররাই ঠিক করবেন, তাকাইচির জন্য ফল ভিন্ন হবে কি না।
দ্য এশিয়া গ্রুপের জাপানবিষয়ক বিশ্লেষক রিন্টারো নিশিমুরা বলেন, ‘এবারের বড় পার্থক্য হলো বেশিরভাগ গণমাধ্যম জরিপে তাকাইচির জনপ্রিয়তা তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি।’ তার মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণা অনুযায়ী অনুমোদন হার বেশি থাকলে আগাম নির্বাচন ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকাইচি নীতিনির্ধারণের চেয়ে রাজনৈতিক উপস্থিতি ও কর্মচাঞ্চল্যের মাধ্যমে বেশি আলোচনায় এসেছেন। তার অভিষেক ভাষণে উচ্চারিত ‘কাজ, কাজ, কাজ’ স্লোগান একজন উদ্যমী ও নিরলস নেত্রীর ভাবমূর্তি আরও জোরালো করে।
মাত্র তিন মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। ইয়োকোসুকায় মার্কিন রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনে তাদের যৌথ উপস্থিতির সময় ট্রাম্পের প্রশংসায় তাকাইচির মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে ধরা মুহূর্তটি বেশ আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া ফেব্রুয়ারির ভোটের মাত্র দুই দিন আগেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাকাইচিকে সমর্থন জানিয়েছেন। বলেন, তিনি ইতোমধ্যেই নিজেকে ‘একজন শক্তিশালী, দৃঢ় ও প্রজ্ঞাবান নেত্রী’ হিসেবে প্রমাণ করেছেন, যিনি সত্যিই তার দেশকে ভালোবাসেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিংবা ইতালির প্রধামন্ত্রীর সঙ্গে তার উচ্ছ্বসিত মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এসব দৃশ্য তাকে তার পূর্বসূরিদের তুলনায় কম আনুষ্ঠানিক এবং কম বিরক্তিকর নেত্রী হিসেবে আলাদা করে তুলেছে।
কান্দা ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রভাষক জেফ্রি হল বলেন, ‘জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সাফল্য ও কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাকাইচির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। তার অনুমোদনের হার ষাটের ঘরে ছিল, কখনো কখনো তা ৭০ শতাংশেও পৌঁছেছে।’
তিনি বলেন, এই ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পেছনে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় একটি গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক প্রভাবশালী ব্যবহারকারী রয়েছেন, যারা নির্বাচনের সময় প্রায় প্রতিদিনই তাকাইচির জন্য ইতিবাচক পোস্ট করেছেন। ফলে নেটাগরিকদের নিউজফিডে অ্যালগরিদম তাকাইচি–সংক্রান্ত ইতিবাচক ভিডিও দেখাচ্ছে।
একইসঙ্গে তাকাইচি এলডিপির রক্ষণশীল ভিত্তির মধ্যেও নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। সংবিধান সংশোধন ও ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের জোর দেওয়ার মতো দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা লক্ষ্যগুলোকে তিনি নতুন করে সামনে এনেছেন। রিন্টারো নিশিমুরা আরও বলেন, ‘তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি এলডিপিকে তার রক্ষণশীল শিকড়ে ফিরিয়ে আনতে চান। এটি দলের প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যেও সাড়া ফেলেছে।’
রক্ষণশীল সমর্থকদের বাইরেও সামনায়ে তাকাইচি তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নতুনভাবে সংযোগ তৈরি করেছেন। তার হ্যান্ডব্যাগ ও গোলাপি কলম নেট দুনিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষক জেফ্রি হলের মতে, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা অনেক তরুণের কাছে তিনি এক ধরনের সেলিব্রিটি মর্যাদা পেয়েছেন। সানা-কাতসু নামে তার ভক্তদের সক্রিয়তাও নজরে এসেছে।
এই ব্যক্তিগত আকর্ষণের প্রভাবেই সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে তার অনুমোদনের হার ৫০-৬০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই এলডিপি আগাম নির্বাচনে ভালো ফলের আশা করছে। এতে অতীতের তহবিল দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত দলের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হতে পারে।
সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোইচি নাকানো বলেছেন, আগাম নির্বাচন ঘোষণার সময় প্রাথমিক অভিযোগ সত্ত্বেও এলডিপি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক আসাহি শিম্বুন জরিপে দেখা গেছে, ৮ ফেব্রুয়ারির নিম্নকক্ষ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৩৩টি আসনের চেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে দলটি।
অস্বাভাবিক সময়
আগাম নির্বাচনের সময় নির্ধারণ নিয়ে বিরোধী দলগুলো তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার উদ্যোগ বিলম্বিত হয়েছে, ২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনা স্থগিত হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষক জেফ্রি হল বলেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল সংসদীয় হিসাব–নিকাশ। তার মতে, আগাম নির্বাচন ডাকার উদ্দেশ্য ছিল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়া, যাতে বিরোধী দলের বাধা ছাড়াই বাজেট পাস করা যায়।
এমন পরিস্থিতিতেই তীব্র শীতের মধ্যে ভোট হচ্ছে। উত্তর জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ভারী তুষারপাত হওয়ায় ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি শীতে দেশজুড়ে তুষারপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং অনেক সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে।
গত বছরের অভিজ্ঞতাও ক্ষমতাসীন দলের জন্য সতর্কবার্তা। তখন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা ক্ষমতায় এসেই আগাম নির্বাচন ডেকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েন এবং এলডিপি নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোইচি নাকানো বলেন, সে সময় আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। এবার প্রধানমন্ত্রী সেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে কিছুটা আলাদা করতে পেরেছেন। তবে নাকানোর মতে, কৌশলটি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যক্তিত্ব নয়, দলের ওপরই নির্ভর করে।
প্রতিরক্ষা, চীন ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কূটনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয় থাকলেও জাপানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন তাকাইচি। তাইওয়ানে চীন হামলা চালালে জাপান সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে এমন মন্তব্যের পর থেকেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এসব মন্তব্য তিনি প্রত্যাহার করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এরপর দ্রুতই উত্তেজনা বাড়ে। দুই দেশই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। জাপান চীনে থাকা নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলে, আর বেইজিং জাপানে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানায়।
দেশের ভেতরে অবশ্য এই অবস্থান তাকাইচির অবস্থান আরও শক্ত করেছে। ৮৫ বছর বয়সি ভোটার নাওআকি ইউহারা বলেন, ‘তিনি কড়া অবস্থানের মানুষ, একজন রক্ষণশীল। অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার বয়সে বিশেষ করে নাতি–নাতনিদের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে জাতীয় প্রতিরক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন।’
তবে প্রতিরক্ষা বিষয়ে তাকাইচির কড়া অবস্থান তরুণ ভোটারদের একাংশকে উদ্বিগ্ন করেছে। ত্রিশের কোঠায় থাকা ভোটার হারুকা বিবিসিকে বলেন, ‘প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ কোথায় ও কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। ভয় হচ্ছে, গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বা সামরিক শক্তি ব্যবহারে অর্থ ব্যয় হতে পারে।’
তার আশঙ্কা, জনগণের অজান্তেই দেশ এমন এক পথে এগোতে পারে, যেখানে সংঘাতে জড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
বিশ্লেষক রিন্টারো নিশিমুরা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই কড়া অবস্থান হিতে বিপরীত হতে পারে। তার ভাষায়, ‘জনসমর্থন পেলে মানুষ আরও কড়া চীননীতি আশা করবে। কিন্তু দীর্ঘ উত্তেজনা অর্থনীতিতে আঘাত করলে জনপ্রিয়তাও কমে যাবে।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোইচি নাকানো বলেন, চীন-সংক্রান্ত এই উত্তেজনা নিয়ে দেশে গঠনমূলক আলোচনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমে একধরনের নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সহাবস্থানের কথা বললেই সেটিকে তোষণ হিসেবে দেখানো হয়। তার মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতি নিয়ে প্রকৃত আলোচনা হচ্ছে না।
নির্বাচনের পর তাকাইচির শিগগিরই ওয়াশিংটন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এটি এমন এক সময় হচ্ছে, যখন ট্রাম্পের চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে এবং টোকিও-বেইজিং সম্পর্ক তীব্র টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
নাকানোর সতর্কতা, ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন না পেলে জাপান আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, তাকাইচির পক্ষে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা সহজ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।