Image description
 

কুশনারের উপস্থাপনায় এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে দেখা যায়, গাজার দিগন্তজুড়ে কাঁচের বিশাল সব অট্টালিকা, আর দীর্ঘ সাদা জোব্বা ও মাথায় ঘুটরা পরা পুরুষরা তা দেখছেন। এই দৃশ্যের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্থাপত্য, ইতিহাস বা সংস্কৃতির কোনো মিল নেই; বরং এটি দেখতে অনেকটা দুবাই বা কাতারের কোনো শহরের মতো।

 

পিটার ডি উইটের আঁকা একটি ভয়ংকর কার্টুন দিয়ে গল্পের শুরু। সেখানে দেখা যায়, গাজার একটি শান্ত, সুন্দর সৈকতে বাবা–মা রোদ পোহাচ্ছেন, আর তাদের ছোট্ট সন্তান আনন্দের সঙ্গে বালি খুঁড়ছে। কিন্তু সে যে জিনিসগুলো খুঁজে পাচ্ছে, সেগুলো মানুষের খুলি।

ডি উইটের এই 'গাজা বিচ ২০৩০' কার্টুনটি গত বছর নেদারল্যান্ডসের সেরা রাজনৈতিক কার্টুনের পুরস্কার জিতেছিল। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি পরিকল্পনা হয়তো এই ভয়াবহ কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে।

মার্কিন বিশেষ দূত হিসেবে কর্মরত কুশনার একটি 'নিউ গাজা' বা নতুন গাজার পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন। যেখানে থাকবে ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন, উপকূলীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং ব্যবসার জন্য নির্ধারিত বিশাল সব এলাকা। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কুশনার বিশ্বনেতাদের বলেন, গাজা চলবে 'মুক্ত বাজার অর্থনীতি'র নীতিতে, যা হবে ট্রাম্পের আমেরিকার মতোই।

 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিকল্পনা যুদ্ধ এবং গণহত্যার ওপর ভিত্তি করে মুনাফা লোটার এক বড় উদাহরণ। ব্রিটিশ-ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ‘মানুষ এই গণহত্যা থেকে টাকা কামিয়েছে এবং এটি তারই ধারাবাহিকতা।‘ জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গাজা যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

 
gaza beach 2030

পিটার ডি উইটের আঁকা কার্টুন 'গাজা বিচ ২০৩০'। ছবি- এক্স

নাওমি ক্লাইনের 'দ্য শক ডকট্রিন' বইয়ের উদাহরণ দিয়ে জাফাভিত্তিক ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহদাহ বলেন, শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো এভাবেই দুর্যোগকে পুঁজি করে বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মানুষের মৃত্যু ট্র্যাজেডি হতে পারে, কিন্তু তাদের কাছে এটি জমি এবং অধিকার কেড়ে নেয়ার বড় সুযোগ।‘

দাভোসে কুশনারের উপস্থাপনায় এআই দিয়ে তৈরি কিছু ছবি দেখানো হয়। একটি ছবিতে দেখা যায়, গাজার দিগন্তজুড়ে কাঁচের বিশাল সব অট্টালিকা, আর দীর্ঘ সাদা জোব্বা ও মাথায় ঘুটরা পরা পুরুষরা তা দেখছেন। এই দৃশ্যের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্থাপত্য, ইতিহাস বা সংস্কৃতির কোনো মিল নেই; বরং এটি দেখতে অনেকটা দুবাই বা কাতারের কোনো শহরের মতো।

অধ্যাপক আভি শ্লাইম এই প্রকল্পকে 'অশ্লীল' ও 'ঔপনিবেশিক' বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো মতামত বা অধিকারের তোয়াক্কাই করা হয়নি।

বিশ্লেষক লেভি লক্ষ্য করেছেন, কুশনার যখন এই পরিকল্পনা দিচ্ছেন ঠিক তখনই ইসরায়েলি বুলডোজার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ-এর সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। লেভি মনে করেন, এই দুটি ঘটনার উৎস একই—ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজের মাটির শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া।

অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, এই 'মুক্ত বাজার গাজা' বাস্তবে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কুশনার জানিয়েছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে না। কিন্তু সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যানেল শেলিন মনে করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া হামাস কখনোই অস্ত্র ছাড়বে না। তিনি ট্রাম্পকে ইরাক ও আফগানিস্তানের ব্যর্থতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া কোনো দখলদারিত্ব বা যুদ্ধ কখনোই সফল হয় না।