Image description

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছে ইরানের সাম্প্রতিক অভিযোগ। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের’ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকারকে দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদল ঘটানো। তবে ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং তেহরান আগের মতোই রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
এই অভিযোগ এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন গাজা যুদ্ধ, লেবাননে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল উত্তেজনা, ইয়েমেনে সংঘাত এবং সিরিয়ায় চলমান প্রক্সি যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

‘ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের’ ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ!
ইরান সচেতনভাবেই ‘ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের ষড়যন্ত্র’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করছে। কারণ, লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে বহুল আলোচিত।

ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশল গ্রহণ করেছিল, তার মধ্যে ছিল- ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে ‘অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রকাশ্য সমর্থন, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সরকারকে ‘অবৈধ’ হিসেবে তুলে ধরা, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা।

ইরানের অভিযোগ, একই কৌশল ধাপে ধাপে তাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রথমে অর্থনৈতিক চাপ, তারপর সামাজিক অসন্তোষ উসকে দেওয়া, এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকার পতনের পথ তৈরি করা- এই ছিল মূল পরিকল্পনা।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি
২০১৮ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঐতিহাসিক ইরান পারমাণবিক চুক্তি (ঔঈচঙঅ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি ওবামা প্রশাসনের কূটনৈতিক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটেন।

এরপর শুরু হয় তথাকথিত ‘গধীরসঁস চৎবংংঁৎব চড়ষরপু’ বা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি। এই নীতির আওতায়- ইরানের তেল রপ্তানির ওপর প্রায় পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় (ঝডওঋঞ) প্রবেশাধিকার বন্ধ, শত শত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, বিদেশে থাকা ইরানের অর্থ আটকে দেওয়া, প্রযুক্তি আমদানি ও ওষুধ কেনায় প্রতিবন্ধকতা। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে এই নীতিতে কাজ করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল- অর্থনৈতিক চাপে পড়ে ইরান হয় নতুন করে কঠোর চুক্তিতে রাজি হবে, নয়তো অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ইরান দ্রুত বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায়, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই টিকে থাকার কৌশল তৈরি করে।

নেতানিয়াহু: ইরানবিরোধী অভিযানের মুখ্য নায়ক?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরেই ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন।

তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে- ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছড়াচ্ছে, হিজবুল্লাহ ও হামাসকে ইরান অস্ত্র ও অর্থ দিচ্ছে, ইসরায়েল ধ্বংসের পরিকল্পনা করছে তেহরান।
নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানবিরোধী অবস্থান আরও কঠোর করতে বড় ভূমিকা রাখেন। হোয়াইট হাউসে তার সফর, কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য- সবখানেই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একাধিক গোপন অভিযান, সাইবার হামলা এবং ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকার অভিযোগও উঠেছে। ইরানের মতে, এসব ছিল বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ।

অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ: প্রকৃত আন্দোলন না বিদেশি সুযোগ?
গত কয়েক বছরে ইরানে একাধিকবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। কখনো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কখনো মূল্যস্ফীতি, কখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছে।
সরকার স্বীকার করে- বেকারত্ব বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তরুণ সমাজ হতাশ।

তবে ইরানের দাবি, এসব বাস্তব সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিদেশি শক্তি আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও ও গুজব ছড়ানো হয়েছে, বিদেশ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উসকানিদাতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী একাধিকবার দ্বৈত নাগরিক ও বিদেশি এজেন্ট গ্রেপ্তারের দাবি করেছে, যাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।

কেন ব্যর্থ হলো এই ষড়যন্ত্র?
ইরানের বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে ‘ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের’ পরিকল্পনা সফল হয়নি, তার মধ্যে রয়েছেÑ
শক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো: ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় নেতৃত্ব, নির্বাচিত সরকার ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত। সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (ওজএঈ) সরকারের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছে।

জাতীয়তাবাদী আবেগ: বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ সাধারণ ইরানিদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে। সরকারবিরোধী অনেক মানুষও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ায়।
আঞ্চলিক মিত্রতা: রাশিয়া, চীন, সিরিয়া ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো শক্তিগুলো ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে।

বিকল্প অর্থনীতি: নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তেল বিক্রির বিকল্প বাজার খুঁজে পায়। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে গোপন চুক্তি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য: বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক কাঠামো ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের অভিযোগের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ইরানের জনগণের পাশে রয়েছে, তবে কোনো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে যুক্ত নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে, কিন্তু সরাসরি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার নীতি তাদের নেই।

ইসরায়েলও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। দেশটির সরকারের দাবি, তাদের একমাত্র লক্ষ্য ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঠেকানো। ইসরায়েলি নেতারা বলেছেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র অর্জন করে, তবে তা শুধু ইসরায়েলের নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ইরানের বক্তব্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং তারা পরোক্ষভাবে ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করে বলেছে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দুই দেশই সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং সব পক্ষকে উত্তেজনা এড়িয়ে আলোচনার পথে এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী দলগুলো সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চাপ দিচ্ছে।
তারা বলছে- পশ্চিমাদের ওপর বিশ্বাস রাখা যাবে না, কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে শক্ত অবস্থান জরুরি, সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

অন্যদিকে সংস্কারপন্থীরা বলছেন-নিষেধাজ্ঞা কাটাতে কূটনীতি দরকার। জনগণের জীবনমান উন্নত করা জরুরি এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ করা যাবে না।

ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে কথিত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এবং ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং ভবিষ্যতে এই সংঘাত নতুন ও আরও জটিল রূপ নিতে পারে। সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের বদলে সাইবার যুদ্ধ, প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে একে অপরকে দুর্বল করার চেষ্টা বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরোক্ষ লড়াই চলছে, যা সামনে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাইবার হামলার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে একে অপরকে কোণঠাসা করার প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তবে বাস্তবতা হলো- ইরান এখন আগের চেয়ে সামরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও ড্রোন প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।

এছাড়া আঞ্চলিক প্রভাবও অটুট রয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি, ইরাকে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরান নিজেদের অবস্থান শক্ত করে রেখেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও তারা বিকল্প কাঠামো গড়ে তুলেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছে, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সংঘাত শেষ হয়নি-বরং কৌশল বদলেছে। সামনে মধ্যপ্রাচ্যে আরও উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায় অপেক্ষা করছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জনমত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কথিত এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাকে ‘জাতীয় বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। টেলিভিশন ও পত্রিকার শিরোনামে বলা হচ্ছে, বিদেশি চক্রান্ত মোকাবিলা করে দেশ আবারও নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারপন্থী বিশ্লেষকরা এটিকে ইরানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

তবে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া একমুখী নয়। কেউ কেউ সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করছেন এবং মনে করছেন, বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই দেশের স্বার্থে। আবার অনেকেই চলমান অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতিতে ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সরকারের নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত- বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। সরকারের সমালোচক হলেও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ। তেহরানের এক দোকানি বলেন, “আমরা সরকারের অনেক সিদ্ধান্তে খুশি নই। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু বিদেশিরা যদি আমাদের দেশ ধ্বংস করতে চায়, তাহলে আমরা চুপ করে থাকব না।”

ইরানের আগে ভেনেজুয়েলায় তাণ্ডব
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র তাণ্ডব চালিয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি ভোরের অন্ধকারে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত এক বিরল এবং দাবিদাওয়া সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার ফলে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস এবং অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে নেয়। এই বিপজ্জনক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ‘ঙঢ়বৎধঃরড়হ অনংড়ষঁঃব জবংড়ষাব’ নামে এই পরিকল্পনা চালায় এবং প্রায় সকালের প্রথম আলোয় এই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। মাদুরোসহ অনেককে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেররিজম’ ও মাদক পাচার সম্পর্কিত অভিযোগ আনা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় এই সামরিক অভিযানের ফলে বিভিন্ন ধরণের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন অন্তত ১০০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে- যাদের মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বেসামরিক নাগরিক এবং বিভিন্ন সহায়ককর্মী।
কিছু আন্তর্জাতিক উৎসে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হলেও প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ জনের মধ্যে নিহত হয়েছে-যাতে অন্তত ২৩ জন ভেনেজুয়েলা নিরাপত্তা সদস্য, ৩২ জন কিউবান মিলিশিয়া সদস্য এবং কিছু সাধারণ নাগরিক রয়েছেন।

এই ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেসামরিক জনসাধারণও। আহতের সংখ্যা শতাধিক; বহু পরিবার তাদের স্বজনকে হারিয়েছে; এবং দেশটির বিভিন্ন জেলা, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বলছে, এই ধরনের সামরিক আক্রমণ সাধারণ মানুষের জীবনে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা ও বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে ‘ভেনেজুয়েলা-ধাঁচের’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ শুধু একটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনীতির গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি ও নেতানিয়াহুর নিরাপত্তাভিত্তিক কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। যদিও ইরানের দাবি অনুযায়ী এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, তবুও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ও ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা ইরানের আশঙ্কাকে আরও বাস্তবভিত্তিক করেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হস্তক্ষেপ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। ইরান আশঙ্কা করছে, একই কৌশল তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, ইরান আজ সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী। আঞ্চলিক মিত্রতা, বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং জাতীয়তাবাদী ঐক্য তাদের বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সংঘাত হয়তো সরাসরি যুদ্ধে রূপ নেবে না, কিন্তু সাইবার হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়বে। শেষ পর্যন্ত শান্তি নির্ভর করবে সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর- বলছেন বিশ্লেষকরা।
শীর্ষনিউজ