ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, গাজার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করা হয়েছে ও এ ঘোষণা দিতে পারা তার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। তিনি লেখেন, বোর্ডের সদস্যদের নাম শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। তবে তার দাবি, বিশ্বের যেকোনো সময় ও স্থানে গঠিত বোর্ডগুলোর মধ্যে এটি হবে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।
এর আগে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, গাজা যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। একই দিন পৃথক এক পোস্টে ট্রাম্প নিজেও তার পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা জানান।
ট্রাম্প বলেন, বোর্ড অব পিসের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সদ্য গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার- গাজা পরিচালনার জাতীয় কমিটি বা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজাকে সমর্থন দিচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সময়ে গাজা শাসনে এই কমিটিকে বোর্ডের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ সহায়তা করবেন বলেও জানান তিনি। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ফিলিস্তিনি নেতা শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়তে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের সহযোগিতায় হামাসের সঙ্গে একটি বড় ধরনের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। প্রস্তাবিত এ চুক্তির আওতায় হামাসকে তাদের সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে।
হামাসের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, সংগঠনটিকে অবিলম্বে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের কাছে সর্বশেষ জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর এবং কোনো কালক্ষেপণ ছাড়াই পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের পথে এগিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, হামাস চাইলে এটি সহজভাবে করতে পারে, নতুবা কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্পের মন্তব্য, গাজার মানুষ অনেক সহ্য করেছে, এখন শান্তির সময় এসেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ২০ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ওই পরিকল্পনায় গাজায় যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়। এতে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, উপত্যকায় একটি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন গঠন এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়। পাশাপাশি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের দাবিও জানানো হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলায় গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ জন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই সময়ের মধ্যে ৪৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি।
বোর্ড অব পিস কী
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন পরিচালিত হবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক কমিটির অধীনে। ওই বোর্ডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়াও জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক দূত নিকোলাই নিয়াদেনভের অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপীয় একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে এ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। বৈঠকের পর বোর্ড অব পিস নিয়ে আরও বিস্তারিত ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানায়, বোর্ড অব পিসের সদস্য কারা হবেন, সে সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই ট্রাম্প নিজে নিয়েছেন এবং বুধবার সদস্যদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে।
বোর্ড অব পিসের অধীনে গঠিত গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন শুরুতে গাজাবাসীর জন্য জরুরি ত্রাণ ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দেবে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রধান আলী শায়াথ। ওয়েস্ট ব্যাংক রেডিও স্টেশন নামের একটি সম্প্রচারমাধ্যমকে তিনি বলেন, গাজা পুনর্গঠনে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে না।
তবে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে অন্তত ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।