Image description
প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে নিল মার্কিন বাহিনী কয়েক জায়গায় হামলা, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নিন্দা

ভেনেজুয়েলায় বড় পরিসরে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্থানীয় সময় গতকাল ভোরে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স হামলা চালিয়ে তাঁদের আটক করে। তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এ বিষয়ে কেউ বিস্তারিত জানায়নি।

হামলার পরপরই দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এদিকে হামলাকে একটি চমৎকার অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদুরো আটক হওয়ায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অন্যদিকে ঐক্যবদ্ধভাবে মার্কিন হামলা প্রতিরোধ করার ঘোষণা দিয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভøাদিমির পাদ্রিনো। পাশাপাশি মাদুরোর বেঁচে থাকার প্রমাণ চেয়েছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। এদিকে যে অজুহাতে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালানো হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে রাশিয়া। গতকাল ভোরে ভেনেজুয়েলায় বড় পরিসরে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাদুরোকে কীভাবে ধরা হয়েছে বা তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করেছে। তাঁদের নিজ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে। অভিযানের বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

নিরাপদে ক্ষমতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ভেনেজুয়েলা চালাব -ট্রাম্পের ঘোষণা

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে সামরিক অভিযান চালিয়ে আটকের পর ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করার জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন। ‘নিরাপদে ক্ষমতার পরিবর্তন’ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার জন্য ‘অর্থ উপার্জন’ করবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, দক্ষ ও দুর্দান্ত সব মানুষ এ অসাধারণ পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। আসলে এটি ছিল একটি চমৎকার অভিযান।

এর আগে, শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। হামলায় বেশি আক্রান্ত হয় কারাকাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। স্থাপনা দুটি হলো লা কারলোটা সামরিক বিমানঘাঁটি ও ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি। এর মধ্যে ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটিতে প্রেসিডেন্ট মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা বিবিসি জানায়, কারাকাসে গতকাল ভোরে বিকট শব্দ, যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শোনা গেছে। একই সঙ্গে আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। শহরের দক্ষিণ অংশে একটি বড় সামরিক ঘাঁটির কাছে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ সময় বিভিন্ন এলাকার মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। কারমেন হিদালগো নামের ২১ বছর বয়সি এক চাকরিজীবী বলেন, কারাকাসের পুরো মাটি কেঁপে উঠেছিল। এটি ভয়াবহ অবস্থা। আমরা দূরে বিস্ফোরণের শব্দ আর যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।

এদিকে নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন সিনেটর মাইক লি। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অপরাধের মামলায় তাঁর বিচার করা হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে এ সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। মাদুরো মার্কিন হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আশা করেন না বলে জানিয়েছেন রুবিও। যারা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরে কাজ করছিলেন তাদের সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

এদিকে হামলার পরই ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা জারি করে দেশটির সরকার। বিবৃতিতে কারাকাস জানায়, ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের অত্যন্ত গুরুতর ‘সামরিক আগ্রাসন’কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রত্যাখ্যান এবং নিন্দা জানাচ্ছি। পাশাপাশি দেশজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভøাদিমির পাদ্রিনো। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ হামলাকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বাজে আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কোনোভাবেই ভেনেজুয়েলায় বিদেশি সেনা সহ্য করা হবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে এ হামলা প্রতিরোধ করা হবে। পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, শনিবারের মার্কিন হামলায় ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকা আক্রান্ত হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট ছোড়া হয়েছে। হামলায় কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, সরকার সে তথ্য সংগ্রহ করছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, রাজধানী কারাকাসের প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট তিউনাতে হামলা করা হয়েছে।

মাদুরোর প্রধান সহযোগী ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। তিনি বলেন, কেউ হতাশ হবেন না। কোনোভাবেই যেন আক্রমণকারী শত্রুদের কাজ সহজ হয়ে না যায়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে নিকোলাস মাদুরোর বেঁচে থাকার প্রমাণ চেয়েছেন ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, একটি টেলিভিশন চ্যানেলে কথা বলার সময় রদ্রিগেজ বলেন, নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বর্তমান অবস্থান অজানা। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে তাদের বেঁচে থাকার প্রমাণ চেয়েছেন।

রাশিয়ার নিন্দা : ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গতকাল সকালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়েছে। এটা উদ্বেগজনক এবং নিন্দনীয়। এ হামলাকে ন্যায্যতা দিতে যে অজুহাত দেখানো হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে আমাদের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করছি।

অভিযানে যুক্তরাজ্য জড়িত নয় : যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে যুক্তরাজ্য জড়িত নয়। তবে এ হামলার বিষয়ে মন্তব্য করার আগে তিনি এ বিষয়ে আরও তথ্য জানতে চান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার বিষয়ে তিনি এখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেননি। পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই সব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।

উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতি, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয়। এসব মামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা দিয়েছিল মাদুরোকে গ্রেপ্তার বা দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়ক তথ্য দিলে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।