
গত ৬ আগস্ট মস্কোতে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি বড় খবর জানান। রুশ প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনে তার যুদ্ধ শেষ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ছাড় দিতে প্রস্তুত।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজনের বর্ণনা অনুযায়ী, উইটকফের ব্রিফিং শোনার পর ট্রাম্প তার দূতকে ‘দারুণ অগ্রগতি’র জন্য প্রশংসা করেন এবং পুতিনের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকে সম্মত হন। বৈঠকে ভূমি-বিনিময় আলোচনা থাকারও ইঙ্গিত দেন তিনি। কিন্তু শিগগিরই এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বিভ্রান্তিতে পরিণত হয়।
৭ আগস্ট ইউরোপের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ফোনালাপে উইটকফ ইঙ্গিত দেন, পুতিন ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া এবং খেরসন অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি। এর বিনিময়ে দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক ছেড়ে দেবে কিয়েভ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ তথ্যটি ফোনালাপ করা অনেককে বিস্মিত করে, কারণ এটি তাদের ধারণারও বাইরে ছিল। আলোচনায় অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চারজন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। যদিও তারা স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ করেননি।
পরদিন উইটকফ আবার তার অবস্থান পরিবর্তন করেন বলে জানা যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইউরোপীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে ফোনালাপে জানান, পুতিন আসলে ওই দুটি অঞ্চল থেকে সরে আসার কোনো প্রস্তাব দেননি।
বরং মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষায়, জাপোরিঝঝিয়া এবং খেরসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পুতিন পশ্চিমা বিশ্বকে আর চাপ দেবেন না এমন সংকেতই দিয়েছিলেন।
অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী উইটকফের কোনো কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, অথচ তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের নোটটেকার ছাড়াই বৈঠকে অংশ নেন, ফলে পুতিনের প্রস্তাবের কোনো সঠিক নথিও এখানে নেই।
ডজনখানেক মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ ইউক্রেন যুদ্ধ-সমাপ্তির প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়। এই প্রচেষ্টা শেষ হয় ১৫ আগস্ট আলাস্কায় অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ বৈঠকে, যেখানে উভয় নেতা সৌহার্দ্যপূর্ণ বক্তব্য বিনিময় করলেও কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি।
এই সাক্ষাৎকারগুলো থেকে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে তা হলো—একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে খুব দ্রুত অগ্রসর হতে চান এবং প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেল বা দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে নিজের ঘনিষ্ঠদের ও ব্যক্তিগত প্রবৃত্তির ওপর বেশি নির্ভর করেন।
ট্রাম্পের সমর্থকরা বলেন, তার এই কৌশলে এমন সাফল্য এসেছে যা আগের প্রশাসনে অকল্পনীয় ছিল। তারা উদাহরণ দেন—নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা এবং পুতিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, যা এক যুদ্ধের ইতি টানতে পারে যেখানে লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছে।
কিন্তু সমালোচকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই ধারা প্রশাসনের ভেতরে এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। শীর্ষ বৈঠক সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো বন্ধ হওয়ার কাছাকাছিও যায়নি বলে মনে করেন সাবেক ন্যাটো রাষ্ট্রদূত ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ইউক্রেন-বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি কার্ট ভলকার।
তিনি বলেন করেন, আমরা ঠিক সেই জায়গাতেই আছি যেখানে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার আগে ছিলাম। রাশিয়ার অবস্থান এক বিন্দুও বদলায়নি। যুদ্ধ চলছে... আমাদের কাছে কোনো পরিষ্কার কৌশল নেই যে কীভাবে পুতিনকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করব।
বৃহস্পতিবার সকালে ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এই অগ্রগতির অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, কিয়েভে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজধানীতে অন্যতম বড় আক্রমণ।
হোয়াইট হাউস এই প্রতিবেদনে বর্ণিত নির্দিষ্ট ঘটনাগুলোতে কোনো মন্তব্য না করলেও ট্রাম্পের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিধ্বনি করার পাশাপাশি তার রেকর্ডকে পূর্বসূরির তুলনায় ভালো হিসেবে তুলে ধরে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, জো বাইডেনের দুর্বল প্রশাসন পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে পারেনি, আর তার তথাকথিত ‘প্রচলিত প্রক্রিয়া’ রাশিয়াকে ইউক্রেনে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। এর বিপরীতে, বিশ্বনেতারা স্বীকার করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাত্র দুই সপ্তাহে শান্তির দিকে যতটা অগ্রগতি করেছেন, জো বাইডেন সাড়ে তিন বছরে ততটা করতে পারেননি।
প্রশাসনিক এক কর্মকর্তা জানান, উইটকফ বিভ্রান্তিকর নতুন তথ্য যোগ করায় মার্কিন দূত কিথ কেলগসহ কিছু কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছিল।
মস্কো বৈঠকের আগে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছিল, ৮ আগস্টের মধ্যে যদি পুতিন যুদ্ধ থামাতে রাজি না হন, তবে নতুন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপ করা হবে। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, এই তিন কর্মকর্তা ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ সমন্বয়ে কাজ করছেন। ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, অন্য কোনো দাবি মিথ্যা ও অপ্রয়োজনীয়।
কেলগের আরেক মুখপাত্রও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, বলেন তিনি ও উইটকফ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং নিয়মিত যোগাযোগে আছেন। তবে ওয়াশিংটনে ইউক্রেন ও রাশিয়ার দূতাবাসগুলো মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।